ওরা পথশিশু, নগরীর ফুটপাতে থাকে। রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট ওদের ঠিকানা। কখনও ওরা খেতে পায়, কখনও পায় না। তবুও ওরা জমিয়েছে টাকা। সেটাও আবার ব্যাংকে। এক টাকা- দুই টাকা করে এখন ২১ লাখ টাকারও বেশি পরিমাণ অর্থ জমিয়েছে ওরা। মাত্র দুই বছরে এই পথশিশুদের জমা করা সঞ্চয় দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ১২ হাজার টাকায়। শুধু তাই নয়, চার হাজার পথশিশু এখন ব্যাংকে লেনদেনও করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ১৫টি বাণিজ্যিক ব্যাংকে ৩ হাজার ১৯২ জন সুবিধাবঞ্চিত পথশিশু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলেছে। উদ্যোক্তা হতে সহায়তা করতে এবং পথভ্রষ্ট যাতে না হয় সেই ভাবনা থেকেই পথশিশুদের ব্যাংকিং সেবায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। এরই অংশ হিসাবে ২০১৪ সালের ৯ মার্চ মাত্র ১০ টাকার বিনিময়ে পথশিশুদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ করে দিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এই নির্দেশনার পর মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে প্রায় ৪ হাজার পথশিশুর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ২১ লাখ টাকারও বেশি পরিমাণ অর্থ জমা হয়।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখন তাদের পুঞ্জীভূত সঞ্চয় দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ টাকায়। হয়ত অচিরেই তাদের সঞ্চয় দাড়াবে ২১ কোটিতে। তিনি বলেন, সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে পথশিশুদের ব্যাংকিং সেবায় আনা হয়েছে। যারা জীবনেও ব্যাংকিং সেবা পেত না, কখনও ব্যাংকের দোড়গোড়ায় যেতে পারতো না, তাদের ব্যাংকিং সেবা দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকগুলোকে সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে সমাজের বিচ্ছিন্ন এই পথশিশুদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে আতিউর রহমান বলেন, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন এই পথশিশুরা মানবেতর জীবনযাপন করে। ব্যাংক এদের পাশে দাঁড়ালে তারাও উদ্যোক্তা হয়ে দেশের উপকার লাগতে পারে।
রাজধানীর কমলাপুর রেল স্টেশনে থাকা কয়েকজন পথশিশুর সঙ্গে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিষয়ে কথা হয়। রাজিব নামে এক পথশিশু বলে, আগে ব্যাংকের কাছে গেলে দাড়োয়ান ভয় দেখাইতো। এখন ব্যাংকে গেলে জিজ্ঞাসা করে। অ্যাকাউন্ট খুলতে আইসি কি না।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বস্তি, রাস্তাঘাট, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট ও ফুটপাতে বসবাসরত পথশিশু এবং কর্মজীবী শিশু-কিশোরদের ব্যাংকিং সেবায় আনার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। এরই অংশ হিসাবে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ১০ টাকার বিনিময়ে ব্যাংক হিসাব খোলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এই পথশিশুদের মধ্যে সঞ্চয় প্রবণতা তৈরি, কষ্টে উপার্জিত অর্থের সুরক্ষা, পথভ্রষ্ট হওয়ার প্রবণতা হ্রাস করাসহ তাদের বৃহত্তর কল্যাণে বাংলাদেশ ব্যাংক যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার ফলে এখন চার হাজার পথশিশুর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ২১ লাখ টাকারও বেশি পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে।
জানা গেছে, অধিকাংশ পথশিশুর কোনও অভিভাবক না থাকায় এনজিও প্রতিনিধিদের এ কাজে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দেশের ১১টি এনজিওর সহায়তায় পথশিশুদের অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।
২০১৪ সালে প্রাথমিকভাবে ১০টি ব্যাংক পথশিশু ও কর্মজীবী-কিশোরদের ব্যাংক হিসাব খোলার দায়িত্ব নেয়। পরে আরও পাঁচটি ব্যাংক এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়। এগুলো হল-সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, দ্য সিটি ব্যাংক, আল আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক ও উত্তরা ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে পথশিশুদের জন্য সবচেয়ে বেশি ৯৮৫টি হিসাব খুলেছে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক। ব্যাংকটিতে এসব হিসাবধারী পথশিশুর জমা করা সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫৯ হাজার টাকায়। ৫২২টি ব্যাংক হিসাব খুলে দ্বিতীয় অবস্থানে পূবালী ব্যাংক। এই ব্যাংকে পথশিশুদের সঞ্চয় রয়েছে ৬ লাখ ৭ হাজার টাকা। তৃতীয় সর্বোচ্চ ৩৫৩টি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে অগ্রণী ব্যাংকে।
আরও পড়ুন-
যে কারণে অলস পড়ে আছে ৬শ’ কোটি টাকা
সাবেক জঙ্গি বললো, বাংলাদেশে এজেন্ট পাঠিয়েছে আইএস
/এফএস/








