শুল্ক গোয়েন্দাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্ট পরিদর্শন নিয়ে প্রশ্ন

গোলাম মওলা
২৫ জুলাই ২০১৮, ০২:৪২আপডেট : ২৫ জুলাই ২০১৮, ০২:৪৫

শুল্ক গোয়েন্দাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্ট পরিদর্শন নিয়ে প্রশ্ন বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টের সোনার বিষয়ে শুল্ক গোয়েন্দাদের গোপনীয় প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ায় পর এবার প্রশ্ন উঠেছে, শুল্ক গোয়েন্দারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্ট পরিদর্শন করতে পারে কিনা। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এ ব্যাপারে ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছে। সর্বশেষ সোমবার প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের কাছে বিষয়টি জানতে চেয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৬ সালে রিজার্ভ চুরির সময় শুল্ক গোয়েন্দারা ভল্ট পরিদর্শনের অনুমতি চায়। ওই সময় প্রথমে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের অনুমতি দেয়নি। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও শুল্ক গোয়েন্দাদের মধ্যে টানা এক বছর ধরে চিঠি চালাচালি হয়। উভয়পক্ষের কর্মকর্তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডাও হয়। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘আইনে কাভার করে না’বলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরকে ভল্ট পরিদর্শন থেকে বিরত রাখলেও অদৃশ্য কারণে ২০১৭ সালে সংস্থাটি অনুমতি পায়। জানা গেছে, শুল্ক গোয়েন্দারা ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্ট পরিদর্শন করেছেন । অথচ তারা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছেন ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন মহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ২০১৭ সালে শুল্ক গোয়েন্দারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্ট পরিদর্শন করলেও যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সংস্থাটি অনুমতি নেয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাসুরক্ষিত ভল্ট পরিদর্শনের জন্য অর্থমন্ত্রণালয়ের কোনও অনুমতি ছিল না তাদের।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা বলেন, পরিদর্শনকালেই শুল্ক গোয়েন্দাদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এক ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। তখনই শুল্ক গোয়েন্দারা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখা সোনা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র দাবি করছে, ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে স্মারকমুদ্রা না পাওয়ার ঘটনায় শুল্ক গোয়েন্দাদের সঙ্গে সর্ম্পকের আরও অবনতি ঘটে। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের হস্তক্ষেপে পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরির কাজ থেমে থাকে। এরই মধ্যে হঠাৎ চলতি বছরের শুরুর দিকে এনবিআর থেকে শুল্ক গোয়েন্দাদের তৈরি করা প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বিষয়টিকে আমলে নেয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা দ্বিধায় ছিলেন, শুল্ক গোয়েন্দাদের কাছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাখ্যা দেবে কিনা। পরে অবশ্য গত ১১ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক শুল্ক গোয়েন্দাদের প্রতিবেদনের ব্যাখা দেয়।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি অফিসার (মহাব্যবস্থাপক) আওলাদ হোসেন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুল্ক গোয়েন্দারা যেভাবে ব্যাখ্যা চেয়েছে, ঠিক সেইভাবে দফা ধরে ধরে জবাব দেওয়া হয়েছে। আমরা বলেছি, বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রুটি বলতে যা আছে, নথিভুক্ত করার সময় ইংরেজি-বাংলার ভুল। এর বাইরে অন্য ত্রুটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নেই। তিনি আরও বলেন, ২২ ক্যারেটের জায়গায় ১৮ ক্যারেট হওয়ার বিষয়টি দুটি ভিন্ন যন্ত্রে পরিমাপের কারণে হয়েছে।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ম মাহফুজুর রহমান বলেন, বিষয়টি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতাকে হেয় করে সরকারকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যেই রিপোর্টটি তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রাখা ৯৬৩ কেজির ভেতর মাত্র ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। এটি আসলে দশমিক ৩৪ ভাগ। আর ভল্টের সবটুকু সোনা বিবেচনায় নিলে হয়তো লাখ ভাগের এক ভাগও হবে না।
এদিকে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়ার পর সরকারও বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পরদিন অর্থ প্রতিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাশেষে প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের কাছে প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরেছেন। শুধু তাই নয়, গত ১৯ জুলাই দুই পক্ষকে (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক) গণভবনে ডেকে পাঠান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই দিন দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য (আন্তর্জাতিক চুক্তি) কালিপদ হালদারের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে উভয়পক্ষের বক্তব্য শোনেন প্রধানমন্ত্রী। শুল্ক গোয়েন্দাদের গোপনীয় প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ায় উষ্মা প্রকাশ করেন তিনি।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রাখা সোনার ওজনে ও পরিমাণে গরমিলের অভিযোগ এনে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরের দেওয়া একটি গোপন প্রতিবেদন সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এ ঘটনার পরদিন বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরসহ সোনার মান যাচাইকারী এক স্বর্ণকারের ওপর বিষয়টির দায় চাপানোর চেষ্টা করা হয় এবং এই ভুলকে ‘ক্লারিক্যাল মিসটেক’বলা হয়। শুল্ক গোয়েন্দারা সরাসরি এ বিষয়ে প্রত্যুত্তর না করলেও ওই স্বর্ণকার দাবি করেন, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনও ভুল করেননি। এ নিয়ে অর্থ প্রতিমন্ত্রী ১৮ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেন, ভল্টে রক্ষিত সোনা সব ঠিকই আছে।

/ওআর/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
পুষ্টিগুণে ভরপুর পাঁচমিশালি সবজি ঘণ্ট
পুষ্টিগুণে ভরপুর পাঁচমিশালি সবজি ঘণ্ট
একদিনে হামে আরও ৪ মৃত্যু
একদিনে হামে আরও ৪ মৃত্যু
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নে মার্কিন চাপ মানছে না ওমান
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নে মার্কিন চাপ মানছে না ওমান
বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ইউজিসি-ইউএন উইমেন উদ্যোগ
বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ইউজিসি-ইউএন উইমেন উদ্যোগ
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী