করোনায় ক্রেডিট কার্ডের বিলম্ব ফি মাফ হলেও দিতে হবে চড়া সুদ

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ১০:০০, এপ্রিল ১০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৩৯, এপ্রিল ১০, ২০২০

ক্রেডিট কার্ড

করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে আগামী ৩১ মে পর্যন্ত ক্রেডিট কার্ডের বিলম্ব ফিসহ অন্য কোনও ফি বা চার্জ ( যে নামেই অভিহিত হোক না কেন) আদায় না করার নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে গুটিকয়েক ব্যাংক এ নির্দেশনা মেনে গ্রাহকদের মোবাইলে মেসেজ (এসএমএস) পাঠালেও বেশিরভাগ ব্যাংক এক্ষেত্রে চাতুরির আশ্রয় নিয়েছে। এসএমএসে বিলম্ব ফি মওকুফ করা হবে এমন ঘোষণা সব ব্যাংক দিলেও বিলম্ব সংক্রান্ত অন্যান্য ফি বা চার্জগুলোর ব্যাপারে কোনও কিছুই বলেনি ব্যাংকগুলো। এর ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করে বিভিন্ন ধরনের চার্জ আরোপ হতে পারে, এমন আশঙ্কা করছেন গ্রাহকরা। শুধু তাই নয়, গ্রাহকদের আশঙ্কা, যারা নির্ধারিত সময়ে বিল পেমেন্ট করবেন না তাদের ওপর সুদ আরোপ করা হবে।
গত ৪ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংক এ সংক্রান্ত যে সার্কুলার জারি করে তাতে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের ভয়াবহ বিস্তারের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহকদের পক্ষে প্রদেয় বিল নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। এমতাবস্থায়, ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের আর্থিক সামর্থ্য ও চলমান অন্যান্য সীমাবদ্ধতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে যেসব ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকের বকেয়া বিল পরিশোধের শেষ তারিখ ১৫ মার্চ বা তার পরে, সেসব ক্ষেত্রে গ্রাহক প্রদেয় বিল নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ না করার ক্ষেত্রে কোনও বিলম্ব ফি, চার্জ, দণ্ড সুদ, অতিরিক্ত মুনাফা, বা অন্য কোনও ফি বা চার্জ ( যে নামেই অভিহিত হোক না কেন) আদায় না করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হলো। এছাড়া ১৫ মার্চ হতে ইতোমধ্যে কোনও ক্রেডিট কার্ড বিল বিলম্বে পরিশোধজনিত কারণে বিলম্ব ফি, চার্জ, দণ্ড সুদ, অতিরিক্ত মুনাফা, বা অন্য কোনও ফি বা চার্জ ( যে নামেই অভিহিত হোক না কেন) আদায় করা হয়ে থাকলে তা সংশ্লিষ্ট ক্রেডিট কার্ড গ্রাহককে ফেরত প্রদান অথবা পরবর্তী সময়ে প্রদেয় বিলের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। এই নির্দেশনা ১৫ মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। ইতোমধ্যেই দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহী বরাবর পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের যে ভাষায় মেসেজ পাঠিয়েছে তাতে ৩১ মে পর্যন্ত ক্রেডিট কার্ডের বিলম্ব ফি মওকুফের কথা স্পষ্ট হয়েছে। শুধুমাত্র ‘ফি’ লেখায় এর সঙ্গে ১৫ মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত চার্জ, দণ্ড সুদ, অতিরিক্ত মুনাফা, বা অন্য কোনও ফি বা চার্জ ( যে নামেই অভিহিত হোক না কেন) মওকুফ হবে কিনা তা পরিষ্কার করেনি বেশিরভাগ ব্যাংক। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড (এসআইবিএল) স্পষ্ট করে লিখেছে, তারা শুধু বিলম্ব ফি মওকুফ করবে। 


নিরাপদে থাকার আহ্বানের মোড়কে একই রকম বার্তা গ্রাহকদের কাছে পাঠিয়েছে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডও। এই ব্যাংকটিও তার ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের শুধুমাত্র বিলম্ব ফি মওকুফের কথাই লিখেছে। ব্যাংকটির মেসেজে স্পষ্টভাবে শুধুমাত্র ‘লেট ফি’-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক যে অন্য ফি বা সুদগুলোও মওকুফ করতে বলেছে তার কিছুই উল্লেখ নেই এই মেসেজে। 

2
এমন আরও কয়েকটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহকদের শুধু লেট ফি বা বিলম্ব ফি মওকুফের কথাই বলা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ব্র্যাক ব্যাংক। ব্যাংকটি এ সংক্রান্ত যে মেসেজটি তার ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের পাঠিয়েছে সেখানে স্পষ্টভাবেই বিলম্ব সংক্রান্ত ‘সব ফি’ মওকুফ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী। এজন্য তারা ‘ফিস’ শব্দটি ব্যবহার করেছে। 

3
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংক তার গ্রাহককে কী এসএমএস দিয়েছে, সেটা বড় বিষয় নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ব্যাংকগুলো মানছে কিনা সেটাই বড় বিষয়। আগামী জুন মাসে আমরা বিষয়টি দেখবো। তিনি বলেন, কোনও ব্যাংক যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করে, তাহলে অবশ্যই আমরা ওই ব্যাংককে শাস্তি দেবো। নির্ধারিত সময়ে গ্রাহক টাকা জমা না দিলে ব্যাংক সুদ নেবে। কিন্তু, অন্য কোনও চার্জ নিলেই আমরা ব্যাংকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবো। তিনি বলেন, আমরা দেখবো, তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মানছে কিনা। তারা গ্রাহককে এসএমএসে কী পাঠালো সেটা আমরা দেখবো না।

তিনি উল্লেখ করেন, নির্দেশনায় লেট ফি ও লেট ফি সংক্রান্ত সব ধরনের চার্জ নিতে ব্যাংকগুলোকে নিষেধ করা হয়েছে। কোথাও সুদ আরোপ করতে মানা করা হয়নি। কাজেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণের টাকা জমা না দিলে গ্রাহককে সুদ গুনতেই হবে। আর বাংলাদেশ ব্যাংক কোনও ব্যাংককে সুদ নিতে নিষেধ করতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে নিয়ম হলো- নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পেমেন্ট করলে কোনও ইন্টারেস্ট লাগে না। ওই সময়ের মধ্যে পেমেন্ট না করলে গ্রাহককে ইন্টারেস্ট দিতে হয়। এ কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা জমা দেওয়াই ভালো।
এদিকে, আগামী ৩১ মে পর্যন্ত ক্রেডিট কার্ডের কোনও লেট ফি নেবে না বলা হলেও ব্যাংকগুলো যে এর সুদের অঙ্কে কোনও ছাড় দেবে না সে ইঙ্গিত দিয়েছেন বেশ কিছু ব্যাংকের কর্মকর্তারা। এছাড়া ওই গ্রাহকের ওপর ব্যাংক পরবর্তীতে অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করবে কিনা তাও পরিষ্কার নয়। ফলে ৫০০ টাকা বাঁচাতে গিয়ে কারও কারও দেড় থেকে দুই হাজার টাকা বা তারও বেশি পরিমাণ অর্থদণ্ড হতে পারে।
তবে ব্যাংকগুলোর পাঠানো এসএমএসে ‘ফি, অথবা ফিস’ যাই লেখা হোক না কেন, কোনও ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করবে না বলে অভয় দিয়েছেন ব্যাংকের নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ইবিএলের এমডি আলী রেজা ইফতেখার।

তিনি বলেন, বিলম্ব ফি যখন নেওয়া হতো, তখন এই লেট ফির ওপর কোনও কোনও ব্যাংক অতিরিক্ত ভ্যাট চার্জ করতো, অনেকে এর ওপর দণ্ড সুদ চার্জ করতো। কিন্তু, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আমরা ৩১ মে পর্যন্ত গ্রাহকদের ওপর ইন্টারেস্ট ছাড়া আর কোনও ধরনের চার্জ করবো না। অর্থাৎ বিলম্ব ফি আমরা নেবো না। ফলে বিলম্ব ফি না নিলে এর ওপর আর কোনও ভ্যাট চার্জ হবে না, একইভাবে কোনও দণ্ড সুদও আরোপ হবে না। কাজেই ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের পাঠানো এসএমএসে লেট ফি, আর লেট ফিস, যেটাই লেখা থাক না কেন, ব্যাংক ইন্টারেস্ট ছাড়া কোনও চার্জ আরোপ করবে না। তবে গ্রাহকদেরকে বলবো, কষ্ট হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা জমা দিতে বলবো। কারণ, নির্ধারিত সময়ে টাকা জমা না দিলে তাকে ইন্টারেস্ট ঠিকই দিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী, গ্রাহকের কাছ থেকে লেট ফি নেওয়া যাবে না। কিন্তু, সুদ নিতে তো নিষেধ করেনি। ফলে ৩১ মে পর্যন্ত গ্রাহকের কাছ থেকে আমরা লেট ফি ৫০০ টাকা নেবো না। কিন্তু, তার কাছ থেকে নির্ধারিত সময়ের (ইন্টারেস্ট) সুদ নেবো। তিনি উল্লেখ করেন, ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের বর্তমানে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ হারে বার্ষিক সুদ গুনতে হয়।

খরচ বাড়বে যেভাবে:

ধরা যাক, কোনও গ্রাহক ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে এক লাখ টাকার পণ্য কিনেছেন। তার টাকা জমা দেওয়ার নির্ধারিত সময় আগামী ১৬ এপ্রিল। তিনি যদি নির্ধারিত তারিখে টাকা জমা না দেন, তাহলে নিয়ম অনুযায়ী তার লেট ফি ৫০০ টাকা জরিমানা হওয়ার কথা। কিন্তু, করোনা ইস্যুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী, ব্যাংক তার কাছ লেট ফি হিসেবে ৫০০ টাকা নেবে না। তিনি যেহেতু নির্ধারিত সময়ে টাকা জমা দিলেন না, সেহেতু তাকে ইন্টারেস্টের আওতায় আনা হবে। অর্থাৎ তাকে ১৪ বা ১৬ শতাংশ হারে সুদ গুনতে হবে। এতে এক লাখ টাকার বিপরীতে প্রতি মাসে প্রায় ১২শ’ টাকা পর্যন্ত সুদ গুনতে হতে পারে। আর তিনি যদি আগামী ৩১ মে পর্যন্ত টাকা জমা না দেন, তাহলে জুন মাসে গিয়ে তাকে শুধু সুদ বাবদ টাকা জমা দিতে হবে সাড়ে তিন হাজার টাকা। এর সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করে বিভিন্ন ধরনের চার্জ আরোপ করলে খরচ আরও বেশি হতে পারে।
জানা গেছে, অধিকাংশ ব্যাংকেরই ক্রেডিট কার্ডের লেট ফি মাত্র ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। দু-একটি ব্যাংকের লেট ফি এক হাজার টাকাও আছে।
এ প্রসঙ্গে ব্যাংকের নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক সভাপতি ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, আগামী ৩১ মে পর্যন্ত সময়ে গ্রাহক টাকা জমা না দিলে তাকে লেট ফি দিতে হবে না। তবে ইন্টারেস্ট দিতে হবে। কোনও ব্যাংকের লেট ফি ৫০০ টাকা, কোনও ব্যাংকের লেট ফি ১০০০ টাকা বলেও জানান তিনি।

 

/টিএন/

লাইভ

টপ