ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের ত্রুটির কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে হ্যাকাররা প্রায় ৮শ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়টি পর্যালোচনা করে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করা হতে পারে। বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ ধরনের তথ্য দেওয়া হয় সাংবাদিকদের। হ্যাক হওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থের বাকি অংশ শিগগিরই উদ্ধার হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে কবে নাগাদ সে অর্থ ফেরত আসবে সে বিষয়ে নিশ্চিত নন তারা। আর রিজার্ভ থেকে এত বিশাল পরিমাণ অর্থ অন্য অ্যাকাউন্টে চলে যাওয়ার পরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমাণ একই আছে বলে দাবি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। তবে কীভাবে সেটার সমন্বয় হয়েছে সে বিষয়ে কোনও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
রিজার্ভের টাকা হ্যাক এবং উদ্ধার বিষয়ে হালনাগাদ অবস্থা সম্পর্কে সাংবাদিকদের জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান, মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি কন্সালটেন্ট ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক আইটি প্রধান রাকেশ আস্তানা।
রাজী হাসান বলেন, অর্থ স্থানান্তর (পেমেন্ট) করতে হলে কিছু ডিউ-ডিলিজেন্স (নিয়মনীতি) আছে। তাদেরও (ফেডারেল রিজার্ভ) কিছু এন্টি মানিলন্ডারিং ফ্লাগ আছে। সেটার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ কিছু বিষয় জানতে চেয়েছে। বিষয়গুলো তারা ঠিকমতো দেখেছে কিনা সে বিষয়গুলো দেখা হচ্ছে। এজন্য আইনগত দিকগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ফেডারেল রিজার্ভের বিরুদ্ধে মামলা হবে কিনা সে বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন- ‘উই আর ইন স্ট্রং পজিশন’ (আমরা শক্ত অবস্থানে আছি)। রাজী হাসান বলেন, আইনগত দিকগুলো ক্ষতিয়ে দেখা হবে। সেগুলো পর্যালোচনা করে আইনগত পদক্ষেপ আমরা নেব।
এর আগে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহী এবং প্রধান তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেছে বাংলাদশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কন্ফারেন্স হলে আয়োজিত বৈঠকে গভর্নর ড. আতিউর রহমান উপস্থিত ছিলেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ খোয়া যাওয়ার পর এ ধরনের বৈঠক কেন জানতে চাইলে শুভঙ্কর সাহা বলেন, ব্যাংকগুলোকে নিয়ে বসলাম এ কারণে যে, প্রত্যেকটা ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের জন্য বিদেশের নষ্ট অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা রাখে। অন্যকোনও ব্যাংক যাতে এ ধরনের দুর্ঘটনার শিকার না হয় সেজন্য সতর্ক করা। বৈঠকে প্রত্যেকটা ব্যাপারে অর্থাৎ সাইবার সিকিউরিটি অক্ষুণ্ন রাখতে করণীয় সম্পর্কে তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়েছে। আর বিষয়টি নিয়ে একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনও দেওয়া হয়েছে। রাকেশ আস্তানা সাইবার সিকিউরিটি সম্পর্কে বিভিন্ন বিষয় ব্যাখ্যা করেন।
হ্যাকের জন্য দায়ী কে এবং এ বিষয়ে সর্বশেষ অবস্থা কি জানতে চাইলে আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, তদন্ত এখনো চলছে। শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাবে না।
হ্যাক না যোগশাজস হয়ে সে বিষয়ে রাকেশ আস্তানা বলেন, আমরা বিষয়টির অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক দিক ভালোভাবে দেখছি। তবে এখন পর্যন্ত যেটুকু জানতে পেরেছি তা হলো- আন অথরাইজড ট্রানজেকশন হয়েছে। কিন্তু তাদের (ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক) সিস্টেম হ্যাকড হয়নি।
শুভঙ্কর সাহা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের একটি অংশ হ্যাকড হয়ে ফিলিপাইনে গেছে। যার পরিমাণ ৮১ মিলিয়ন ডলার। আরও কিছু অর্থ হ্যাকড হয়ে শ্রীলঙ্কাতে গেছে। যার পরিমাণ ২০ মিলিয়ন ডলার। যা ইতোমধ্যে উদ্ধার করা গেছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে যোগ হয়েছে। তিনি বলেন, ফিলিপাইনের এন্টি মানিলন্ডারিং কর্তৃপক্ষ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সেখানকার কোর্ট সবাই এ বিষয়ে বাংলাদেশকে সহায়তা করছে। ফিলিপাইনের এন্টি মানিলন্ডারিং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমাদের সমঝোতা চুক্তি আছে। আমাদের বর্তমান অবস্থাটা আরও সুদৃঢ় হয়েছে এবং আমরা অচিরেই পুরো টাকা ফেরত পাবো এ আশা রাখছি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ নিয়ে ব্যাক অফিসে (সিলিং) অ্যাকাউন্ট অ্যান্ড বাজেট বিভাগের কাজ করেন ৮ কর্মকর্তা। এসব কর্মকর্তাকে বিশেষ নজরদারিতে রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই বিভাগের কর্মকর্তাদের পাসপোর্টও জব্দ করা হয়েছে বলে অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে। তবে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে রাজী হাসান বলেন, পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে কিনা সে বিষয়ে কিছু জানা নেই।
কারা হ্যাক করেছে সে বিষয়ে কোনও কিছুই জানায়নি। ফিলিপাইনের যেসব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে গেছে সেগুলো ফ্রিজ করা হয়েছে কিনা সে বিষয়ে জানাতে চাইলে বলা হয়, সেদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের এন্টি মানিলন্ডারিং বিভাগকে (এফআইইউ) এ দায়িত্ব দিয়েছে। তবে আমাদের দেশের মতো তাদের এফআইইউ কারো অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করতে পারে না। কোর্টে মামলা করে সেটা করতে হয়। তারা এ বিষয়ে ইনভেস্টিগেশন চালাচ্ছেন। কমপ্লিট হলে আমরা জানতে পারব।
এদিকে এ বিপুল পরিমাণ অর্থ ফেডারেল রিজার্ভ থেকে অন্য দেশের অ্যাকউন্টে চলে যাওয়ার পরও বাংলাদেশের রিজার্ভ এখনো ২৮ বিলিয়ন ডলার রয়েছে বলে দাবি করেছেন শুভঙ্কর সাহা। তিনি বলছেন, রিজার্ভের ফিগার ঠিক আছে। তবে কীভাবে ঠিক রয়েছে তার কোনও ব্যাখ্যা তিনি সাংবাদিকদের কাছে প্রকাশ করেননি।
/জিএম/এএইচ/








