এবারের যুদ্ধ কমিয়ে দিচ্ছে স্বর্ণের দাম 

গোলাম মওলা
২৭ মার্চ ২০২৬, ০৮:০০আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২৬, ০৮:০০

মধ্যপ্রাচ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ার যে প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবে তা দেখা যায়নি। বরং যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বমুখী ধারা কার্যত থেমে গেছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে উল্টো দামে সংশোধন বা পতনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

সাধারণত বৈশ্বিক সংঘাত বা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এর ফলে সোনার চাহিদা ও দাম দ্রুত বাড়ে। কিন্তু চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও এবার সেই প্রচলিত প্রবণতা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতি সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের উচ্চ সুদহার নীতি স্বর্ণের বাজারে চাপ তৈরি করেছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ সোনা থেকে অর্থ সরিয়ে সুদভিত্তিক আর্থিক সম্পদে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন।

এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ায় বৈশ্বিক বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতার আভাসও তৈরি হয়েছে। এতে স্বর্ণের মতো নিরাপদ সম্পদের প্রতি তাৎক্ষণিক চাহিদা কমে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে স্বর্ণের দাম আর নতুন করে বাড়েনি। বরং আন্তর্জাতিক বাজারের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও আর্থিক বাস্তবতার কারণে স্বর্ণের বাজারে বর্তমানে এক ধরনের সংশোধনধর্মী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, সামরিক অবকাঠামো ও নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা শুরু করে। এই হামলা শুরুর পরপরই ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রতিবেশী দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে আক্রমণ চালায়।

এই যুদ্ধ শুরুর আগে বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারে টানা ঊর্ধ্বগতি ছিল। পরিসংখ্যান বলছে হঠাৎই বড় ধরনের সংশোধন দেখা দিয়েছে স্বর্ণের বাজারে। গত তিন সপ্তাহে দেশের বাজারে ভরিপ্রতি স্বর্ণের দাম প্রায় ৩৬ হাজার টাকা কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের উল্লেখযোগ্য পতনের প্রভাবেই দেশীয় বাজারে এই নিম্নমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (২৫ মার্চ) দেশের বাজারে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ভরিপ্রতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪১ হাজার টাকা। অথচ চলতি মাসের ৩ মার্চ একই স্বর্ণের দাম ছিল প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যেই ভরিপ্রতি দাম কমেছে প্রায় ৩৬ হাজার টাকা।

একমাসে ১২ বার দামের সমন্বয়

মার্চ মাসের ১ থেকে ২৫ তারিখ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বাজুস মোট ১২ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করেছে। এর মধ্যে ১০ বারই দাম কমানো হয়েছে, যা বাজারে সাম্প্রতিক সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে স্বর্ণের বাজারে টানা মূল্যবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ছিল ভরিপ্রতি প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। পরবর্তী একবছরে তা দ্রুত বাড়তে বাড়তে ২০২৬ সালের শুরুতে ২ লাখ ২২ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়।

পরে গত ২৯ জানুয়ারি দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম সর্বোচ্চ ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা স্পর্শ করে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড উচ্চতা হিসেবে বিবেচিত হয়।

আন্তর্জাতিক বাজারে বড় পতন

দেশীয় বাজারে দামের এই পতনের মূল কারণ আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা। গত একমাসে বিশ্ববাজারে সোনার দামে উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে।

বাজার তথ্য অনুযায়ী, গত একমাসে আন্তর্জাতিক বাজারে আউন্সপ্রতি সোনার দাম কমেছে প্রায় ৮০১ ডলার ৪৭ সেন্ট, যা শতাংশের হিসাবে প্রায় ১৫ দশমিক ৪০ শতাংশ।

ভরির হিসাবে এই পতন দাঁড়ায় প্রায় ৩০০ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৬ হাজার ৮০০ টাকা। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের বড় সংশোধনের প্রভাব দ্রুত দেশীয় বাজারেও পড়তে শুরু করেছে।

মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) নিউইয়র্কের বাজারেও সোনার দাম আরও কমে। এদিন আউন্সপ্রতি দাম কমেছে ৫২ ডলার ৪৯ সেন্ট বা ১ দশমিক ১৯ শতাংশ। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম নেমে আসে ৪ হাজার ৩৪৭ ডলারে।

আন্তর্জাতিক হিসাবে এক ট্রয় আউন্স সমান প্রায় ৩১ দশমিক ১০৩৫ গ্রাম, যা প্রায় ২ দশমিক ৬৬ ভরি স্বর্ণের সমান।

দামের প্রতিফলনে সময় লাগে

বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ বিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহিন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ছাড়াও স্বর্ণের স্থানীয় মূল্য নির্ধারণে আমদানি ব্যয়, কর এবং বাজারের চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তিনি জানান, বিদেশ থেকে স্বর্ণ আমদানি করে তা প্রক্রিয়াজাত হয়ে খুচরা বাজারে পৌঁছাতে সাধারণত ১২ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশীয় বাজারে তার প্রভাব কিছুটা দেরিতে প্রতিফলিত হয়।

কেন কমছে সোনার দাম

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণ একসঙ্গে কাজ করায় সোনার বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।

প্রথমত, বিশ্বের প্রধান মুদ্রাগুলোর বিপরীতে মার্কিন ডলার শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ডলার শক্তিশালী হলে সাধারণত সোনার দাম কমে যায়, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে সোনা ডলারেই লেনদেন হয়।

দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার দ্রুত কমার সম্ভাবনা কমে গেছে। যেহেতু সোনা থেকে সরাসরি সুদ পাওয়া যায় না, তাই সুদের হার বেশি থাকলে বিনিয়োগকারীরা অনেক সময় সোনা থেকে অর্থ সরিয়ে সুদভিত্তিক সম্পদে বিনিয়োগ বাড়ান।

ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব

সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়েও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা থাকলেও সাম্প্রতিক কিছু কূটনৈতিক সংকেত বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে সম্ভাব্য হামলার সিদ্ধান্ত পাঁচদিন পিছিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর বাজারে উত্তেজনা কিছুটা কমে।

এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও প্রায় ১৩ শতাংশ কমে যায়। ফলে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার প্রতি বিনিয়োগকারীদের চাপ সাময়িকভাবে কমেছে।

তবুও ঐতিহাসিকভাবে দাম এখনও বেশি

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক পতনের পরও ঐতিহাসিক গড়ের তুলনায় সোনার দাম এখনও অনেক বেশি অবস্থানে রয়েছে। গত বছর বিশ্ববাজারে সোনার দামে বড় উত্থান হয়েছিল। বছরজুড়ে দাম ৭০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়। এর ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো আউন্সপ্রতি সোনার দাম ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়। এরপর বেশ কিছুদিন ধরে দাম পাঁচ হাজার ডলারের আশপাশে ওঠানামা করলেও সাম্প্রতিক সময়ে বড় সংশোধন দেখা যাচ্ছে।

সামনে কী হতে পারে

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বর্ণের বাজার এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েছে।

যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আবার তীব্র হয় বা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়, তাহলে বিনিয়োগকারীরা আবারও নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকতে পারেন। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই সোনার চাহিদা ও দাম আবার বাড়তে পারে।

দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহিন মনে করেন, বর্তমান দামের পর্যায়ে স্বর্ণে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তার ভাষায়, বিশ্বের বিভিন্ন মুদ্রার ওপর আস্থা কমে গেলে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত সোনার মতো নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকেন। তাই যুদ্ধ পরিস্থিতি বা বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা আবার বাড়লে সোনার দাম নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।

বিনিয়োগকারীদের নজর বাজারে

সব মিলিয়ে বলা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণের বাজারে বড় ধরনের সংশোধন হলেও বৈশ্বিক অর্থনীতি, ডলারের শক্তি, সুদহার এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর এই বাজারের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে।

এ কারণে বিনিয়োগকারী ও বাজার বিশ্লেষকদের নজর এখন আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকেই। কারণ এসব পরিবর্তনই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে আগামী দিনে সোনার বাজার আবার ঊর্ধ্বমুখী হবে, নাকি নিম্নমুখী প্রবণতা আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকবে।

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নে মার্কিন চাপ মানছে না ওমান
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু কি এখন দুই পথের পথিক?
ইরানে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল: খামেনি
সর্বশেষ খবর
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নে মার্কিন চাপ মানছে না ওমান
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নে মার্কিন চাপ মানছে না ওমান
বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ইউজিসি-ইউএন উইমেন উদ্যোগ
বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ইউজিসি-ইউএন উইমেন উদ্যোগ
শুরু হচ্ছে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের ড্রেস ও জুতা বিতরণ
শুরু হচ্ছে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের ড্রেস ও জুতা বিতরণ
সেই কুমির ফেরত চান মাজারের খাদেম যুবদল নেতা
সেই কুমির ফেরত চান মাজারের খাদেম যুবদল নেতা
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী