খেলাপি ঋণ, রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণনির্ভর বাজেট: সংস্কারে আইএমএফের চাপ 

গোলাম মওলা
৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:৩০ আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৪৭

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক উত্থান, রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি এবং বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের ক্রমবর্ধমান ঋণনির্ভরতা—এই তিনটি ইস্যু এখন অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এসব বিষয়ে কঠোর নজরদারি বাড়িয়েছে এবং বিশেষ করে খেলাপি ঋণ কমাতে একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনা চেয়েছে।

খেলাপি ঋণ: বাস্তব চিত্র সামনে

আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি শুরুর সময় ২০২৬ সালের মধ্যে খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি উল্টো হয়েছে। দীর্ঘদিন নীতিগত শিথিলতা ও পুনঃতফসিলের সুযোগে আড়ালে থাকা ঋণগুলো সামনে আসায় খেলাপি ঋণের হার ২০২৫ সালে ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ সর্বোচ্চ ৩৫.৭৩ শতাংশে পৌঁছায়। পরে কিছুটা কমে ৩০.৬০ শতাংশে নেমে এলেও এটি এখনও অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশাবাদী, চলতি বছরের মার্চ শেষে তা ২৫ শতাংশের নিচে নামতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে আইএমএফ এখন আর শুধু লক্ষ্যমাত্রা নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক ও সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা দেখতে চায়। এর মধ্যে থাকতে পারে—ঋণখেলাপিদের দেশি-বিদেশি সম্পদ জব্দ। আইনি প্রক্রিয়া জোরদার। সমঝোতার মাধ্যমে ঋণ আদায় এবং বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করা।

ব্যাংক খাতে সংস্কার: কাঠামোগত পরিবর্তনের চাপ

খেলাপি ঋণ সংকট মোকাবিলায় শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, কাঠামোগত সংস্কারও জরুরি হয়ে পড়েছে। ব্যাংক রেজুলেশন আইন শক্তিশালী করা, দুর্বল ব্যাংক একীভূত করা এবং তদারকি বাড়ানো—এসব বিষয়েও আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। এসব ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় ৮৪ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, যা গোটা ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

রাজস্ব ঘাটতি: বাজেটে বাড়তি চাপ

খেলাপি ঋণের পাশাপাশি আরেকটি বড় সমস্যা হলো রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থতা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে।

এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে শেষ তিন মাসে  গড়ে ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করতে হবে— যা বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন। এই প্রেক্ষাপটে আইএমএফ সরকারকে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ জানতে চেয়েছে। করের আওতা বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ এবং ডিজিটাল নজরদারি বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।

সরকারের ঋণনির্ভরতা: অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব

রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাপক হারে ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের ঋণনির্ভরতা কয়েকটি বড় ঝুঁকি তৈরি করে—কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে টাকা ছাপাতে হয়, যা মূল্যস্ফীতি বাড়ায়। বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাত ঋণ বঞ্চিত হয়। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমে যায়। সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় বেড়ে বাজেটে চাপ সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলেছেন, দেশের বর্তমান ব্যবসা-বাণিজ্য পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। এ অবস্থায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে ঋণের বিকল্প সীমিত হয়ে পড়েছে। তবে ঋণ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য না থাকলে তা নতুন সংকটও তৈরি করতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। তার মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি টাকা ছাপিয়ে ঋণ জোগান দেয়, তাহলে তা মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ায়। অপরদিকে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ করলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হন, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে গতিশীল করতে ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। একইসঙ্গে কর আদায় বৃদ্ধির জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন। কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারকে আরও সক্রিয় ও লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান এই অর্থনীতিবিদ।

আইএমএফের কর্মসূচি: কেন গুরুত্বপূর্ণ

সরকারের জন্য আইএমএফের চলমান ঋণ কর্মসূচি চালু রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই কর্মসূচি বন্ধ হলে—আন্তর্জাতিক ঋণমান কমে যেতে পারে। বিদেশি ঋণ ও বিনিয়োগ কমে যেতে পারে। বৈদেশিক অর্থায়ন ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে সরকার শুধু বর্তমান ৫৫০ কোটি ডলারের কর্মসূচি বজায় রাখতেই নয়, বরং অতিরিক্ত অর্থায়নের চেষ্টাও করছে।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট—খেলাপি ঋণ কার্যকরভাবে কমানো। রাজস্ব আদায় বাড়িয়ে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণনির্ভরতা কমিয়ে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা।

উল্লেখ্য, বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে যে সমস্যাগুলো কেবল সাময়িক নয়, বরং কাঠামোগত। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতে সুশাসন এবং রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা কঠিন হবে।

আইএমএফের চাপ তাই শুধু শর্ত নয়—এটি অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। এখন দেখার বিষয়, সরকার কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে।

 

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
মোদির বাসভবন এলাকার সংস্কারে হুমকিতে শতবর্ষী মসজিদ-মন্দির
বিশ্বে সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়
৯ মাসেও হয়নি, প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে পাঁচ দিনেই ৯ কোটি টাকার সড়ক সংস্কার
সর্বশেষ খবর
মিষ্টির শূন্য আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেলেন এলিজা জামান
মিষ্টির শূন্য আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেলেন এলিজা জামান
সেন্টমার্টিনে রাত্রিযাপন নিয়ে সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত
সেন্টমার্টিনে রাত্রিযাপন নিয়ে সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত
বিগ ব্যাশে বাংলাদেশের মোস্তাফিজ
বিগ ব্যাশে বাংলাদেশের মোস্তাফিজ
বাংলাদেশ ও জাপানের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ
বাংলাদেশ ও জাপানের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ
সর্বাধিক পঠিত
জাপানে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হচ্ছেন কারা
জাপানে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হচ্ছেন কারা
একসঙ্গে ২৫ জেলে আটক, ৮০ কেজি ইলিশ গেলো এতিমখানায়
একসঙ্গে ২৫ জেলে আটক, ৮০ কেজি ইলিশ গেলো এতিমখানায়
ভোট দেওয়া নিয়ে অনুশোচনা ও বিএনপি সরকারের সমালোচনা করা নারী আটক
ভোট দেওয়া নিয়ে অনুশোচনা ও বিএনপি সরকারের সমালোচনা করা নারী আটক
‘আমার মৃত্যুর জন্য ইউএনও দায়ী থাকবে’ বলা এসিল্যান্ডকে প্রত্যাহার
‘আমার মৃত্যুর জন্য ইউএনও দায়ী থাকবে’ বলা এসিল্যান্ডকে প্রত্যাহার
‘শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল’-কমেন্ট কেন করেছিলেন, আদালতকে জানালেন সেই যুবক
‘শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল’-কমেন্ট কেন করেছিলেন, আদালতকে জানালেন সেই যুবক