চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলো কেমন চলছে? 

গোলাম মওলা
১৯ জুন ২০২৬, ০৮:০০আপডেট : ১৯ জুন ২০২৬, ০৮:০০

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন ইতিহাসের অন্যতম বড় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর একটি বড় অংশ এখন আস্থা, সুশাসন, মূলধন ও তারল্য সংকটে ভুগছে। একদিকে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি বলছে, তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের অনেক ব্যাংক ‘ক্লিনিক্যালি ডেড’ বা কার্যত মৃত। অন্যদিকে কয়েকটি ব্যাংক দাবি করছে, তারা এখনও ভালো আর্থিক সূচক ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

দুই বছর আগে অর্থাৎ ২০২৪ সালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে ‘ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে করণীয়’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেছিলেন, তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের বেশ কিছু ব্যাংক কার্যত মৃত হয়ে গেছে। এসব ব্যাংক বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। যেসব ব্যাংক এখনও পুরোপুরি ধসে পড়েনি, সেগুলোর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

তার এই বক্তব্যের দুই বছর পরেও দেশের ব্যাংক খাতের বাস্তব অবস্থার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ— সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর চিত্র একরকম নয়। কিছু ব্যাংক গভীর সংকটে, কিছু ব্যাংক বিতর্কে জর্জরিত, আবার কয়েকটি ব্যাংক এখনও তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে।

রাজনৈতিক বিবেচনায় জন্ম, বিতর্কের মধ্যেই বেড়ে ওঠা

২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে একসঙ্গে নয়টি নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেওয়া হয়। তখনই অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের একটি বড় অংশ নতুন ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এমনকি তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও প্রকাশ্যে বলেছিলেন— এসব ব্যাংকের লাইসেন্স রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া হয়েছে।

অনুমোদনের সময় নতুন ব্যাংকগুলোর সামনে কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি, রেমিট্যান্স, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংয়ের মতো উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু এক যুগ পরে এসে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ ব্যাংকই সেই লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এনআরবিসি ব্যাংক

সম্প্রতি এনআরবিসি ব্যাংকের ফরেনসিক অডিট রিপোর্ট ব্যাংক খাতে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অডিটে উঠে এসেছে, ব্যাংকটির কোর ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে প্রায় ১১ লাখ তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে। খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল, প্রভিশন ঘাটতি গোপন এবং শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগের তথ্য লুকানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ব্যাংকটি ২০২৫ সালের জুনে খেলাপি ঋণ ২৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ দেখালেও ফরেনসিক অডিটে প্রকৃত হার পাওয়া গেছে ৩৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ। পাশাপাশি ২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি, ১২ হাজারের বেশি কেওয়াইসিবিহীন হিসাব এবং পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে শত শত কোটি টাকার ঋণের তথ্যও উঠে এসেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই ঘটনা শুধু একটি ব্যাংকের নয়; বরং পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতা ও নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতার প্রতিফলন।

পদ্মা, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে পদ্মা ব্যাংক (সাবেক ফারমার্স ব্যাংক)। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ৮৫ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে ৮৫ টাকাই আদায় অনিশ্চিত।

একসময় সরকারি সহায়তা, নাম পরিবর্তন এবং বিশেষ সুবিধা দিয়েও ব্যাংকটিকে ঘুরে দাঁড় করানো সম্ভব হয়নি। এখনও ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণের হার কম দেখানো হলেও তারল্য সংকট, পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং তদন্ত কার্যক্রম ইঙ্গিত দিচ্ছে যে প্রকৃত পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

এখনও তুলনামূলক ভালো অবস্থানে যেসব ব্যাংক

সব চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংক একই অবস্থায় নেই। কিছু ব্যাংক এখনও মূলধন, খেলাপি ঋণ ও তারল্য সূচকে তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থান ধরে রেখেছে।

মধুমতি ব্যাংক

মধুমতি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সফিউল আজমের দাবি, ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। মূলধন পর্যাপ্ততা হার ১৫ শতাংশের বেশি। ব্যাংকটি শুরু থেকেই আগ্রাসী ঋণ বিতরণের পরিবর্তে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিয়েছে।

এসবিএসি ব্যাংক

এসবিএসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম মঈনুল কবীরের মতে, ব্যাংকটির মোট সম্পদ ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি এবং মূলধন পর্যাপ্ততা হার প্রায় ১৪ দশমিক ২২ শতাংশ। গত এক বছরে আমানত ও ঋণ—উভয় ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ব্যাংকটির দাবি, সাম্প্রতিক আস্থার সংকটের মধ্যেও তাদের আমানতকারীরা ব্যাংকের ওপর আস্থা রেখেছেন।

মেঘনা ব্যাংক

মেঘনা ব্যাংকও নিজেদের তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে দাবি করছে। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মিজানুর রহমানের মতে, খেলাপি ঋণ ৬ শতাংশের নিচে রয়েছে এবং ব্যাংকটি করপোরেট ঋণের পাশাপাশি এসএমই ও রিটেইল ব্যাংকিংয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে।

সিটিজেনস ব্যাংক

সবচেয়ে নতুন ব্যাংকগুলোর একটি সিটিজেনস ব্যাংক এখনও তুলনামূলক ছোট পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ব্যাংকটির দাবি, তাদের কোনও শ্রেণিকৃত ঋণ নেই এবং আমানত ও ঋণ উভয় ক্ষেত্রেই স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি রয়েছে। তবে মাত্র কয়েক বছরের কার্যক্রম দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়ন করা কঠিন।

উচ্চ সুদের প্রতিযোগিতায় তৈরি করছে নতুন ঝুঁকি

আমানত সংগ্রহের জন্য চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলো বর্তমানে ১০ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একদিকে আমানতকারীদের জন্য আকর্ষণীয় হলেও অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

যদি সেই অর্থ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ঋণে বিনিয়োগ করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকট আরও বাড়তে পারে। ফলে উচ্চ সুদের প্রতিযোগিতা দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকগুলোর জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

সংকটের মূল কারণ সুশাসনের ঘাটতি

ব্যাংকিং খাত বিশ্লেষকরা বলছেন, চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল করপোরেট সুশাসন এবং নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতা।

অনেক ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদ সরাসরি ঋণ বিতরণে প্রভাব বিস্তার করেছে। স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ঋণ দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত খেলাপি ঋণ গোপন করা হয়েছে। পুনঃতফসিল ও বিশেষ ছাড়ের মাধ্যমে সমস্যাগুলো বছরের পর বছর আড়াল করা হয়েছে। ফলে কিছু ব্যাংক কার্যত ‘জম্বি ব্যাংক’-এ পরিণত হয়েছে,  যেগুলো কাগজে-কলমে চালু থাকলেও স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা হারিয়েছে।

সামনে কী হতে পারে?

সিপিডি বলছে, দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য একটি কার্যকর ‘এক্সিট পলিসি’ প্রয়োজন। অর্থাৎ যেসব ব্যাংক আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না, সেগুলোকে একীভূতকরণ, অধিগ্রহণ অথবা নিয়ন্ত্রিতভাবে বন্ধ করার পথ তৈরি করতে হবে।

একইসঙ্গে ফরেনসিক অডিট, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন অর্থনীতিবিদরা।

অনেক ব্যাংক অস্তিত্ব সংকটে

এক যুগ আগে বড় স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলো। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল সুশাসন এবং অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণের কারণে অনেক ব্যাংক আজ অস্তিত্ব সংকটে। তবে সব ব্যাংকের চিত্র এক নয়। পদ্মা, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী ও এনআরবিসির মতো ব্যাংক নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ থাকলেও মধুমতি, এসবিএসি, মেঘনা কিংবা সিটিজেনস ব্যাংক এখনও নিজেদের আর্থিক ভিত্তি শক্ত রাখার দাবি করছে।

তবে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে সেই ব্যাংকগুলোই, যারা রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখতে পারবে।

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাজীব গান্ধী ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ নিষিদ্ধ করেছিলেন ফতোয়ারও আগে: সালমান রুশদি
রাজীব গান্ধী ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ নিষিদ্ধ করেছিলেন ফতোয়ারও আগে: সালমান রুশদি
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে দূরত্ব কমবে ৮০ কিলোমিটার
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে দূরত্ব কমবে ৮০ কিলোমিটার
ডায়াসপোরা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে রুশদি
ডায়াসপোরা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে রুশদি
২৬১ পণ্যের শুল্ক কাঠামোয় পরিবর্তন, লাভবান হবে কোন খাত
২৬১ পণ্যের শুল্ক কাঠামোয় পরিবর্তন, লাভবান হবে কোন খাত
সর্বাধিক পঠিত
কক্সবাজারে সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রীসহ আহত অভিনেতা জোভান
কক্সবাজারে সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রীসহ আহত অভিনেতা জোভান
বিএমএতে দ্বিতীয় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা সেনাপ্রধানের  
বিএমএতে দ্বিতীয় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা সেনাপ্রধানের  
দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত
দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত
মাওলানা মামুনুল, পরকীয়া ও মুতা বিয়ে নিয়ে আলোচনা সংসদে
মাওলানা মামুনুল, পরকীয়া ও মুতা বিয়ে নিয়ে আলোচনা সংসদে
‘মাইক্রোওভেন উনার কাছে কে চেয়েছে’, পার্থকে উদ্দেশ করে বিরোধী দলীয় নেতা
‘মাইক্রোওভেন উনার কাছে কে চেয়েছে’, পার্থকে উদ্দেশ করে বিরোধী দলীয় নেতা