টানা ভারী বর্ষণ আর জলাবদ্ধতা বাংলাদেশে নতুন কোনও ঘটনা নয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-নালা ভরাট, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং অপর্যাপ্ত নগর পরিকল্পনার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সমস্যা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। একসময় জলাবদ্ধতাকে শুধু নগরবাসীর দুর্ভোগ হিসেবে দেখা হলেও এখন অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি দেশের অর্থনীতির জন্য অন্যতম বড় কাঠামোগত ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
কারণ জলাবদ্ধতা শুধু মানুষের চলাচল ব্যাহত করে না; এটি একসঙ্গে বন্দর, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, সরবরাহ ব্যবস্থা, কৃষি, শ্রমবাজার, স্বাস্থ্য খাত এবং সরকারি ব্যয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির ক্ষতি কয়েক মাস পর্যন্ত অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরী কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, বৃহত্তম পাইকারি বাজার, শিল্পাঞ্চল এবং ব্যবসাকেন্দ্রগুলো পানির নিচে চলে যাওয়ায় আমদানি-রফতানি, উৎপাদন এবং পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। একই সময়ে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলেও জলাবদ্ধতায় কোটি টাকার আমদানি পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—জলাবদ্ধতা কেবল একটি স্থানীয় সমস্যা নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি।
বন্দর থামলে থমকে যায় অর্থনীতির চাকা
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিচালিত হয়। তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল, শিল্পকারখানার যন্ত্রাংশ, খাদ্যপণ্য, জ্বালানি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের বড় অংশ এই বন্দর দিয়েই দেশে আসে। আবার দেশের রফতানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাকসহ অধিকাংশ রফতানি পণ্যও এখান থেকেই বিদেশে যায়।
এ কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সংযোগকারী সড়কগুলো জলাবদ্ধতায় অচল হয়ে পড়লে তার প্রভাব শুধু চট্টগ্রামেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ঢাকার শিল্পাঞ্চল, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়াসহ দেশের বিভিন্ন উৎপাদন কেন্দ্রেও এর প্রভাব পড়ে।
পণ্যবাহী ট্রাক আটকে যায়, কনটেইনার পরিবহন ব্যাহত হয়, বন্দরে পণ্যের জট তৈরি হয় এবং সময়মতো শিপমেন্ট দেওয়া সম্ভব হয় না। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে নির্ধারিত সময়সীমা রক্ষা করতে না পারলে রফতানিকারকদের জরিমানা গুনতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের অর্ডারও ঝুঁকিতে পড়ে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণ, জলাবদ্ধতা ও বন্যা বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে কৃষি, মৎস্য, শিল্প, বাণিজ্য এবং পরিবহন খাত ক্ষতির মুখে পড়েছে। চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার কারণে ইতোমধ্যে প্রায় শত কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব পাওয়া যাচ্ছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও বন্যার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম ধীরগতির হয়ে পড়েছে এবং পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হওয়ায় এর প্রভাব শুধু ওই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রতিফলন ঘটে।’’
তাসকিন আহমেদ আরও বলেন, ‘‘চট্টগ্রামের বাইরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার আগেই বন্যার পানিতে ফসল তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকের আয় কমেছে এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে যান চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘ঢাকা চেম্বারের মতে, জলাবদ্ধতা এখন আর শুধু মৌসুমি দুর্ভোগ নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এ সমস্যা মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর নগর পরিকল্পনা, আধুনিক ও সক্ষম ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় আগামী বছরগুলোতে জলাবদ্ধতার অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে এবং দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।’’
তৈরি পোশাক খাতে বাড়ছে উদ্বেগ
দেশের মোট রফতানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস তৈরি পোশাক শিল্প। এই শিল্প পুরোপুরি সময়নির্ভর। কারখানায় কাঁচামাল সময়মতো না পৌঁছালে উৎপাদন ব্যাহত হয়। আবার তৈরি পোশাক বন্দরে পৌঁছাতে দেরি হলে নির্ধারিত জাহাজ মিস হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এতে বাড়তি পরিবহন ব্যয়, গুদাম খরচ, ডেমারেজ এবং জরিমানার চাপ বাড়ে।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘জলাবদ্ধতা একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তবে এর কারণে দেশের আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে কিছুটা হলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে আমদানি ও রফতানিযোগ্য পণ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘বিশেষ করে বন্দর এলাকায় পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে অনেক পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষতি এড়াতে বন্দরে নিরাপদ সংরক্ষণাগার (সেফ শেড) ও আধুনিক পণ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। একইসঙ্গে জলাবদ্ধতার সময় যাতে পণ্য নিরাপদে রাখা যায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।’’
খাতুনগঞ্জের অভিজ্ঞতা বলছে ক্ষতির পরিমাণ কত বড়
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই, আসাদগঞ্জ ও কোরবানীগঞ্জ দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাণিজ্য কেন্দ্র। ২০২১ সালে চট্টগ্রাম চেম্বারের সহযোগিতায় পরিকল্পনা কমিশনের ন্যাশনাল রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, এক দশকে শুধু জলাবদ্ধতার কারণে এসব এলাকায় প্রায় ২ হাজার ৫১৭ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
প্রায় পাঁচ হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়ে। পানি ঢুকে নষ্ট হয়েছে খাদ্যপণ্য, ভোগ্যপণ্য, কাঁচামাল ও অন্যান্য আমদানি পণ্য। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গবেষণায় উল্লেখিত ক্ষতির বাইরে বিক্রি বন্ধ থাকা, গ্রাহক হারানো এবং ব্যবসার গতি কমে যাওয়ার মতো পরোক্ষ ক্ষতির হিসাব আরও অনেক বড়।
বেনাপোলেও পুনরাবৃত্তি একই সংকট
শুধু সমুদ্রবন্দর নয়, দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলেও টানা বর্ষণে একই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বন্দরের বিভিন্ন শেডে হাঁটুসমান পানি জমে কোটি টাকার আমদানি পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় প্রায় প্রতি বর্ষাতেই একই সমস্যা দেখা দেয়। পণ্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি গুদামে দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় অতিরিক্ত সংরক্ষণ ফি বা ডেমারেজ দিতে হচ্ছে। এতে ব্যবসার ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।
শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত
জলাবদ্ধতার কারণে বহু শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে নিরাপত্তার স্বার্থে। অনেক কারখানার নিচতলায় পানি ঢুকে মিটার বোর্ড, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি এবং উৎপাদন সরঞ্জাম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ফলে অনেক কারখানা উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। উৎপাদন বন্ধ মানেই উদ্যোক্তার আর্থিক ক্ষতি, শ্রমিকের আয় কমে যাওয়া এবং জাতীয় উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব।
সবচেয়ে বড় অদৃশ্য ক্ষতি—শ্রমঘণ্টার অপচয়
জলাবদ্ধতার অর্থনৈতিক ক্ষতির বড় একটি অংশ কখনোই দৃশ্যমান হয় না। শহরের প্রধান সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটের কারণে লাখো মানুষ সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন না। সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিতি কমে যায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রতিদিন লাখ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া মানে জাতীয় উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া। এই ক্ষতির নির্দিষ্ট হিসাব না থাকলেও এর অর্থনৈতিক মূল্য কয়েকশ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি বিপদে
বড় প্রতিষ্ঠান কিছু দিন ক্ষতি সহ্য করতে পারলেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সেই সক্ষমতা নেই। চট্টগ্রামের মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, আগ্রাবাদ, হালিশহরসহ বিভিন্ন এলাকায় দোকান, রেস্তোরাঁ, ওয়ার্কশপ ও ছোট কারখানায় পানি ঢুকে ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকের পুঁজি নষ্ট হয়েছে। আবার অনেক ব্যবসায়ী কয়েক দিন দোকান খুলতেই পারেননি। ফলে দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল হাজারো পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছে।
কৃষিও রক্ষা পায় না
শহরের বাইরে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা কৃষিতেও বড় ক্ষতির কারণ। ধান, শাকসবজি, পাটসহ বিভিন্ন ফসল পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে যায়। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, ঋণের চাপ বৃদ্ধি পায় এবং খাদ্য সরবরাহেও প্রভাব পড়ে। ফলে শহর ও গ্রামের অর্থনীতি একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্বাস্থ্য খাতেও বাড়তি চাপ
জলাবদ্ধতার ফলে দূষিত পানি ছড়িয়ে পড়ে। ডায়রিয়া, চর্মরোগ, টাইফয়েড, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ে। অসুস্থতার কারণে কর্মক্ষমতা কমে যায়। চিকিৎসা ব্যয় বাড়ে। পরিবারের সঞ্চয় কমে যায়। অর্থাৎ স্বাস্থ্যগত ক্ষতিও শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
অবকাঠামো মেরামতে বাড়ছে সরকারি ব্যয়
দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট, ড্রেন এবং ফুটপাত দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতি বছর এসব অবকাঠামো সংস্কারে সরকার ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। একই অবকাঠামো বারবার মেরামতে অর্থ ব্যয় হওয়ায় নতুন উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগের সুযোগ কমে যায়।
বিনিয়োগকারীদের আস্থায়ও নেতিবাচক প্রভাব
বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনও দেশে বিনিয়োগের আগে অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ঝুঁকি বিবেচনা করেন। যখন একটি শহরে প্রতিবছর কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই শিল্পাঞ্চল ও বন্দর অচল হয়ে যায়, তখন নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ কমে যায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, জলাবদ্ধতা এখন বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতারও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, তবু প্রশ্ন
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। সংস্থাগুলোর দাবি, অধিকাংশ কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই নগরের প্রধান সড়ক, ব্যবসা কেন্দ্র, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক এলাকা পানির নিচে চলে যাচ্ছে। এতে প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা, সমন্বয় এবং রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বন্যা, জলাবদ্ধতা কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু জনজীবন বা সামাজিক জীবনকেই বিপর্যস্ত করে না, এর বড় প্রভাব পড়ে অর্থনীতির ওপরও। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে আমরা সেটিই দেখছি। অতিবৃষ্টির কারণে বন্দরে অনেক আমদানিকৃত কাপড় (ফ্যাব্রিক) ভিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক কারখানায় পানি ঢুকেছে, সড়ক ডুবে যাওয়ায় শ্রমিকরা কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারছেন না, এমনকি অনেক শ্রমিকের বাসাবাড়িতেও পানি উঠেছে। ফলে উৎপাদন ও সরবরাহ—উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘এ ধরনের দুর্যোগকে পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়, কারণ এটি প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, কার্যকর পানি নিষ্কাশন, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুললে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেকটাই কমানো সম্ভব। একইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় এখন থেকেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’’
মহিউদ্দিন রুবেল আরও বলেন, ‘‘তৈরি পোশাক শিল্পে পরিবেশগত মান (কমপ্লায়েন্স) নিশ্চিত করার ওপর এত গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। কারখানায় পানি ও রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তার মূল উদ্দেশ্য ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমানো। আজকের জলাবদ্ধতা, অতিবৃষ্টি কিংবা তাপপ্রবাহ—সবই জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাবের অংশ।’’
তিনি বলেন, ‘‘শুধু জলাবদ্ধতাই নয়, অতিরিক্ত গরমও শিল্প উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রচণ্ড তাপমাত্রায় শ্রমিকদের স্বাভাবিকভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে, এতে উৎপাদনশীলতা কমে যায়। অর্থাৎ পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাব এখন সরাসরি শিল্প ও অর্থনীতিতে পড়ছে। এ কারণেই আন্তর্জাতিক ক্রেতা, ব্র্যান্ড এবং পরিবেশবিদরা টেকসই উৎপাদনের বিষয়ে এত গুরুত্ব দিচ্ছেন।’’
তার মতে, ‘‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা কোনও একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। সরকার, শিল্প খাত, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড এবং বৈশ্বিক সম্প্রদায়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না হলেও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।’’
অর্থনীতির নীরব সংকট
জলাবদ্ধতার ক্ষতি শুধু পানিতে ভেসে যাওয়া কয়েকটি রাস্তা বা ডুবে যাওয়া কিছু দোকানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি রফতানি কমায়, উৎপাদন ব্যাহত করে, ব্যবসার ব্যয় বাড়ায়, শ্রমঘণ্টা নষ্ট করে, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে এবং সরকারের উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
এই সংকটের স্থায়ী সমাধান না হলে প্রতি বর্ষায় একই চিত্র ফিরে আসবে—রাস্তা ডুববে, বন্দর থামবে, শিল্পে উৎপাদন কমবে, ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আর শেষ পর্যন্ত তার মূল্য দিতে হবে পুরো দেশের অর্থনীতিকে।
স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, বিশিষ্ট পরিবেশবিজ্ঞানী ও জলবায়ু গবেষক এবং ক্যাপস-এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘জলাবদ্ধতা এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি অর্থনীতির জন্যও বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। এর কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, শিল্পকারখানার উৎপাদন কমে যাচ্ছে, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, ছোট-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতির মুখে পড়ছে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘সাধারণত জুলাই-আগস্টে দেশে তুলনামূলক বেশি বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু এবারের বৃষ্টিপাত অতীতের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি—এমনটি বলা যাবে না। মূল সমস্যা বৃষ্টির পরিমাণ নয়, বরং আমাদের অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা। পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় স্বাভাবিক বৃষ্টিতেই নগরজুড়ে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।’’
ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, ‘‘জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো খাল, বিল ও প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট করে ফেলা। বছরের পর বছর ধরে শহরের খালগুলো দখল ও ভরাট হওয়ায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে সামান্য সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই পানি আটকে যাচ্ছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।’’
তার মতে, ‘‘এই সংকটের স্থায়ী সমাধান করতে হলে শহরের খালগুলো পুনরুদ্ধার করতে হবে, নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ ফিরিয়ে আনতে হবে। পানি যদি বাধাহীনভাবে নদীতে প্রবাহিত হতে পারে, তাহলে জলাবদ্ধতা অনেকটাই কমে যাবে। একই সঙ্গে নগরীর পরিবেশও স্বাভাবিক হবে এবং শহর আরও বাসযোগ্য হয়ে উঠবে।’’









