বিশ্বের সবচেয়ে বড় তৈরি পোশাকের বাজার যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) দেশটিতে পোশাক আমদানিতে বড় ধরনের ধীরগতি দেখা দিয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচন, খুচরা বিক্রেতাদের অতিরিক্ত মজুত কমানোর কৌশল এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশটির পোশাক আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে এই বৈশ্বিক মন্দার মধ্যেও বাংলাদেশের জন্য রয়েছে স্বস্তির বার্তা। কারণ, প্রধান প্রতিযোগী চীন ও ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের রফতানি অনেক কম হারে কমেছে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্যনীতির আওতায় ভবিষ্যতে সম্ভাব্য ট্যারিফ রেট কোটা (টিআরকিউ) সুবিধা চালু হলে বাংলাদেশের জন্য নতুন প্রতিযোগিতামূলক সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দফতরের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ০৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি ৮ দশমিক ০৪ শতাংশ কম। একই সময়ে পরিমাণের দিক থেকেও (স্কয়ার মিটার ইকুইভ্যালেন্ট-এসএমই) আমদানি কমেছে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। যদিও গড় ইউনিট মূল্য সামান্য ০ দশমিক ৫০ শতাংশ বেড়েছে, তবু বাজারে সামগ্রিক চাহিদা দুর্বল থাকায় বিশ্বের অধিকাংশ রফতানিকারক দেশ চাপের মুখে পড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বছরের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ৪ দশমিক ০১ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ কম। প্রথম দৃষ্টিতে এটি নেতিবাচক মনে হলেও প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়।
বিশেষ করে চীনের রফতানি একই সময়ে ৩৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং ভারতের রফতানি ২৫ দশমিক ২৭ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের পতনের হার তাদের তুলনায় অনেক কম। পাকিস্তানের রফতানি কমেছে ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ। অন্যদিকে কম্বোডিয়া ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়া ৩ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং ভিয়েতনাম ১ দশমিক ০৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
শুধু মূল্য নয়, রফতানির পরিমাণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। জানুয়ারি-জুন সময়ে বাংলাদেশের রফতানির পরিমাণ কমেছে মাত্র ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। অথচ একই সময়ে চীনের রফতানির পরিমাণ কমেছে ২৬ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং ভারতের ২২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। বিপরীতে কম্বোডিয়ার রফতানির পরিমাণ বেড়েছে ১৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ, ভিয়েতনামের ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো ইউনিট মূল্য। বাংলাদেশের গড় ইউনিট মূল্য কমেছে ২ দশমিক ১৫ শতাংশ, যা ভিয়েতনামের সমান। অথচ চীনের ইউনিট মূল্য কমেছে ১৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়ার ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ, পাকিস্তানের ৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং ভারতের ৩ দশমিক ২৮ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ বাজার ধরে রাখতে চীনসহ অনেক দেশকে উল্লেখযোগ্য মূল্যছাড় দিতে হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই চাপ তুলনামূলকভাবে কম ছিল—যা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা এবং পণ্যের গ্রহণযোগ্যতার ইঙ্গিত বহন করে।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো—জুন মাসে বাংলাদেশের রফতানি আবারও ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। ওই মাসে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ৭৬৩ দশমিক ৫৭ মিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে, যা ২০২৫ সালের জুনের তুলনায় ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, বছরের দ্বিতীয়ার্ধে আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ বাড়লে বাংলাদেশের রফতানি আরও গতি পেতে পারে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সামগ্রিক আমদানি কমলেও বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। চীন ও ভারতের তুলনায় কম হারে রফতানির কমা প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখনও বাংলাদেশের ওপর আস্থা রাখছেন।
তার ভাষায়, বর্তমান বাস্তবতায় শুধু প্রবৃদ্ধি অর্জন নয়, বাজার ধরে রাখাও একটি বড় সাফল্য। বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ার সময়ে বাংলাদেশের ক্ষতির পরিমাণ সীমিত থাকা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এখন প্রতিযোগিতা শুধু কম দামে পণ্য সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সরবরাহের ধারাবাহিকতা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, সামাজিক ও শ্রমমান অনুসরণ, সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং উৎপাদন সক্ষমতাই ক্রেতাদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে।
নতুন শুল্কনীতিতে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সেকশন ৩০১ বাধ্যতামূলক শ্রমসংক্রান্ত বাণিজ্য ব্যবস্থা বৈশ্বিক পোশাক বাণিজ্যের প্রতিযোগিতার চিত্র বদলে দিতে পারে। এই ব্যবস্থার আওতায় বিশ্বের ৮৬টি দেশকে দুই স্তরের শুল্ক কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫টি দেশ ১০ শতাংশ এবং ৪১টি দেশ ১২ দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কের আওতায় রয়েছে।
বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, কানাডা ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ ১০ শতাংশ শুল্কস্তরে রয়েছে। অন্যদিকে চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ব্রাজিল, রাশিয়া ও অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক প্রতিযোগী দেশ ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্কের আওতায় পড়েছে।
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইজারল্যান্ডের জন্য ‘নেট-অব-এমএফএন’ পদ্ধতি প্রযোজ্য। অর্থাৎ বিদ্যমান আমদানি শুল্ক বিবেচনায় নিয়ে নির্ধারিত সীমা পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হবে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ শুল্ক সরাসরি বিদ্যমান শুল্কের ওপর যোগ হবে। ফলে বাংলাদেশের রফতানিকারকদের জন্য এটি একটি অতিরিক্ত ব্যয় সৃষ্টি করবে।
টিআরকিউ হতে পারে বড় সুযোগ
তবে এই নতুন নীতির মধ্যেই বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে বস্ত্র ও তুলা আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত ট্যারিফ রেট কোটা (টিআরকিউ) চালুর পরিকল্পনা করেছে। প্রাথমিকভাবে এই সুবিধার জন্য বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াকে যোগ্য দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনাম, চীন ও ভারত এই তালিকায় নেই।
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, টিআরকিউ কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে। কারণ, নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ পেলে বাংলাদেশ মূল্য প্রতিযোগিতায় বাড়তি সুবিধা পাবে। তবে এখন পর্যন্ত এই সুবিধা কার্যকরের কোনও নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি। তাই আপাতত ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক বহাল থাকবে।
দেশের ভেতরের চ্যালেঞ্জও কম নয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে সুযোগ সৃষ্টি হলেও দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধান না হলে সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে। বিশেষ করে গ্যাস সংকট, বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, ডলারের অস্থিরতা, পরিবহন ব্যয় এবং বন্দর ব্যবস্থাপনার জটিলতা এখনও পোশাক শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বৈশ্বিক বাজারে নতুন সুযোগ কাজে লাগাতে হলে উৎপাদন ব্যয় কমাতে হবে, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, বন্দর ও কাস্টমস কার্যক্রম আরও দ্রুত করতে হবে এবং ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখতে হবে। পাশাপাশি সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগও জোরদার করতে হবে, যাতে সম্ভাব্য টিআরকিউ সুবিধা দ্রুত কার্যকর করা যায়।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বর্তমানে এক ধরনের পুনর্বিন্যাস চলছে। ঐতিহ্যগত সরবরাহকারী দেশগুলোর পাশাপাশি নতুন উৎপাদন কেন্দ্রগুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে যেমন চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমনি বড় সুযোগও তৈরি হয়েছে।
চীন ও ভারতের তুলনায় কম হারে রফতানি কমা, জুন মাসে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা বজায় থাকা এবং সম্ভাব্য টিআরকিউ সুবিধা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, নীতিগত সংস্কার, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কূটনীতিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। তাহলেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পরিবর্তিত বৈশ্বিক সমীকরণের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ নতুন করে প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারবে।









