ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মিজানুর রহমান মনির ওরফে মনির খান (৪৮)। টানা প্রায় দুই মাস ঢামেক হাসপাতালের পুরাতন বার্ন ইউনিটের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় বুধবার (৫ আগস্ট) বিকাল ৩টা ২৫ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। তবে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তার হাতকড়ার একটা ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়।
মিজানুর রহমান পটুয়াখালী সদর উপজেলার বহালগাছিয়া গ্রামের মৃত আব্দুল খালেক খানের ছেলে। তিনি সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ সদর উপজেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জেলা যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় ফেডারেশনের সহসভাপতিও ছিলেন।
গত বছরের জুনে গ্রেফতার হওয়া মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে মোট আটটি মামলা করা হয়েছিল। মৃত্যুর সাত দিন আগে গত ৩০ জুলাই সবশেষ মামলাটিতে তার জামিন মঞ্জুর হয় বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে।
মিজানুর রহমানের ভাগনে সিরাজ মুন্সী বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে মিজানুর রহমান আত্মগোপনে ছিল। গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর মিন্টু রোড থেকে তাকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। তার বিরুদ্ধে ঢাকায় ছয়টি এবং পটুয়াখালী সদর উপজেলায় দুটিসহ আটটি মামলা করা হয়। এর মধ্যে জামিন পেলেও পরে বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। প্রায় ১১ মাস কারাগারে ছিল। বিভিন্ন মামলায় জামিন পেলেও অন্য মামলায় কারাগারে থাকতে হয়েছে।’
সিরাজ মুন্সী জানান, এরপর থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিল। গত ৯ জুন কারাগারে থাকা অবস্থায় মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত রোগে (স্ট্রোক) আক্রান্ত হয়। পরে কারা কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে কারারক্ষীরা তাকে ঢামেক হাসপাতালের পুরাতন বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে ভর্তি করেন। গত ৩০ জুলাই আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পায়। তবে শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক থাকায় তাকে হাসপাতালেই ভর্তি রাখা হয়েছিল।
স্বজনরা জানান, আইসিইউতে থাকা অবস্থায় মিজানুর রহমানের হাতে হাতকড়া থাকার একটা ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। শরীরের প্রতিটি স্পন্দন যখন যন্ত্রগুলো মাপছিল, তখন শুধু একটি হাতকড়া যেন চিকিৎসার ভাষাকেও অতিক্রম করেছিল। যেটি তার ডান হাতে ঝুলছিল। ছবি ভাইরাল হওয়ার পরে তার সব মামলায় জামিন হয়। কিন্তু অবস্থা বেশি খারাপ হওয়া মুক্তি মেলেনি। মৃত্যুর পর লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হচ্ছে।
মিজানুর রহমানের স্ত্রী সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সালমা জাহান স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় গ্রেফতার হয়ে অনেকদিন কারাবন্দি ছিলেন। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও প্রায় এক মাস স্বামীর হাতে হাতকড়া ছিল। হাসপাতালে ভর্তির দুদিন পর আর কিছুই মনে করতে পারছিল না। আমাকেও চেনে না। পুরো শরীরই প্যারালাইজড হয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকরা যখন জানান, রোগীকে আর ফিরিয়ে আনা কঠিন, তখন দায়িত্বে থাকা পুলিশ হাতকড়া খুলে দেয়। কিন্তু ততদিনে সে প্রায় মৃত। শেষ পর্যন্ত হাতের শিকল খুললেও তাকে ফিরিয়ে আনতে পারি নাই।’
ছেলের সবশেষ অবস্থা দেখে গত সপ্তাহে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সামনে মা মাতোয়ারা বেগম কাঁদছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, আমার ছেলে আমাকে চেনে না।
মিজানুর রহমানের চাচা আবদুল কালাম আজাদ বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে নিজ বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।’

কারাগার থেকে অসুস্থ হয়ে ঢামেকে আসা সেই আ.লীগ নেতা মারা গেছেন







