বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানিতে নতুন অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে মিশ্র চিত্র দেখা দিয়েছে। প্রধান রফতানি বাজারগুলোর কয়েকটিতে পোশাক রফতানি কমলেও ইতালিসহ ইউরোপের কয়েকটি বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিশেষ করে ইতালির বাজারে একবছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি বেড়েছে প্রায় ৩২ শতাংশ।
তবে বড় বাজারগুলোর সামগ্রিক দুর্বলতার কারণে জুলাইয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি গত বছরের একইমাসের তুলনায় ১ দশমিক ৯২ শতাংশ কমেছে। এ সময়ে মোট রফতানি হয়েছে ৩৮৮ কোটি ৬৭ লাখ ২০ হাজার ডলারের পোশাক। গত বছরের জুলাইয়ে রফতানি হয়েছিল ৩৯৬ কোটি ২৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ‘বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের’ সংকলিত পরিসংখ্যানে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে মাসভিত্তিক হিসাবে পোশাক রফতানিতে বেশ ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জুনে রফতানি হয়েছিল ৩৩৮ কোটি ৭৭ লাখ ১০ হাজার ডলার। ফলে একমাসের ব্যবধানে জুলাইয়ে রফতানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ নতুন অর্থবছরের শুরুতে রফতানি জুনের তুলনায় শক্তিশালী অবস্থানে ফিরলেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এখনও কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে।
ইতালিতে ৩২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি
বাংলাদেশের পোশাকের বড় বাজারগুলোর মধ্যে জুলাইয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে ইতালিতে। দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি বেড়েছে ৩১ দশমিক ৯১ শতাংশ। জুলাইয়ে ইতালিতে রফতানি হয়েছে ১৪ কোটি ২১ লাখ ৮০ হাজার ডলারের পোশাক।
একই ইউরোপীয় বাজারের অন্য কয়েকটি দেশেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। স্পেনে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি বেড়েছে ৩ দশমিক ২৬ শতাংশ, রফতানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০ কোটি ৪৫ লাখ ২০ হাজার ডলারে। নেদারল্যান্ডসেও রফতানি বেড়েছে ১ দশমিক ২ শতাংশ, হয়েছে ২৩ কোটি ৪৮ লাখ ৯০ হাজার ডলার।
অর্থাৎ ইউরোপের বাজারে সামগ্রিকভাবে রফতানি কমলেও সব দেশে একই প্রবণতা দেখা যায়নি। কিছু বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা বাড়ছে, যা নতুন করে সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জার্মানি-ফ্রান্সে কমেছে রফতানি
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন। জুলাইয়ে মোট পোশাক রফতানির ৪৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ এসেছে এই অঞ্চল থেকে। তবে এই বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
জুলাইয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে মোট ১৯২ কোটি ৯২ লাখ ২০ হাজার ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছে। ইইউর সবচেয়ে বড় বাজার জার্মানিতে রফতানি কমেছে ২ দশমিক ৮৪ শতাংশ। জুলাইয়ে দেশটিতে রফতানি হয়েছে ৪৫ কোটি ৮৩ লাখ ৯০ হাজার ডলারের পোশাক।
ফ্রান্সেও রফতানি কমেছে ৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ। দেশটিতে রফতানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটি ৯ লাখ ডলারে। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বড় দুই বাজার জার্মানি ও ফ্রান্সে রফতানি কমে যাওয়ায় পুরো অঞ্চলের প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে ইতালি, স্পেন ও নেদারল্যান্ডসের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি সেই চাপ কিছুটা সামলে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় অপরিবর্তিত
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একক বৃহত্তম গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজার জুলাইয়ে মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। দেশটিতে পোশাক রফতানি হয়েছে ৭৯ কোটি ৫৭ লাখ ৯০ হাজার ডলারের। গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় এটি মাত্র দশমিক ১৮ শতাংশ কম। অন্যদিকে মোট রফতানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ সামান্য বেড়েছে। গত বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশের মোট পোশাক রফতানির ২০ দশমিক ১২ শতাংশ গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। এবার তা বেড়ে হয়েছে ২০ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
অর্থাৎ ইউরোপের বাজারে রফতানি কমলেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের অবস্থান প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। সামগ্রিক রফতানি কমার মধ্যেও এটি পোশাক খাতের জন্য তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক দিক।
যুক্তরাজ্য ও কানাডাতেও পতন
বাংলাদেশের পোশাকের আরেক গুরুত্বপূর্ণ বাজার যুক্তরাজ্য। জুলাইয়ে দেশটিতে রফতানি কমেছে ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ। রফতানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৫ কোটি ৮ লাখ ২০ হাজার ডলারে।
তবে কানাডার বাজারে পতন আরও বেশি। জুলাইয়ে দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি কমেছে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ, নেমে এসেছে ১৩ কোটি ৬ লাখ ২০ হাজার ডলারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে স্থিতিশীলতা থাকলেও যুক্তরাজ্য ও কানাডার বাজারের পতন মোট রফতানি প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি করেছে।
নিটের চেয়ে ওভেনে বেশি পতন
জুলাইয়ে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির দুই প্রধান খাত নিট ও ওভেন— দুটিতেই গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রফতানি কমেছে। ওভেন পোশাক রফতানি হয়েছে ১৭২ কোটি ৭৬ লাখ ৬০ হাজার ডলারের— যা গত বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ কম। অন্যদিকে নিট পোশাক রফতানি হয়েছে ২১৫ কোটি ৯ লাখ ৬০ হাজার ডলারের, যা কমেছে দশমিক ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ রফতানি কমার ক্ষেত্রে ওভেন পোশাক তুলনামূলকভাবে বেশি চাপের মধ্যে রয়েছে। বিপরীতে নিট পোশাকে পতনের হার কম হওয়ায় এই খাত মোট রফতানিকে কিছুটা স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রেখেছে।
তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, পোশাক রফতানি বাড়াতে হলে প্রথমে শিল্পের অভ্যন্তরীণ সংকটগুলো দূর করতে হবে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, সময়মতো পণ্য তৈরি ও জাহাজীকরণ কঠিন হয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে বাড়তি উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি ও অন্যান্য খরচের চাপ রয়েছে। এ অবস্থায় শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যবসার খরচ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তা না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা এবং রফতানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে।
অপ্রচলিত বাজারে বড় পতন নেই
প্রচলিত বড় বাজারের বাইরে বাংলাদেশের পোশাকের যেসব বাজারকে অপ্রচলিত বাজার বলা হয়, সেখানেও জুলাইয়ে বড় ধরনের পতন দেখা যায়নি। এসব বাজারে সম্মিলিত রফতানি হয়েছে ৫৮ কোটি ২ লাখ ৬০ হাজার ডলারের, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দশমিক ৪৮ শতাংশ কম। মোট পোশাক রফতানিতে এসব বাজারের অংশ প্রায় ১৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
অপ্রচলিত বাজারগুলোর মধ্যে জাপানে রফতানি সামান্য বেড়েছে। জুলাইয়ে দেশটিতে রফতানি হয়েছে ১০ কোটি ৮৫ লাখ ১০ হাজার ডলারের পোশাক, যা আগের বছরের তুলনায় দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া ও ভারতে রফতানি কমেছে যথাক্রমে দশমিক ৩৩ শতাংশ ও ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
মাসের ব্যবধানে বড় প্রবৃদ্ধি, তবে স্বস্তি পুরোপুরি নয়
জুলাইয়ের পোশাক রফতানির পরিসংখ্যানে একটি বিষয় বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। জুনের তুলনায় জুলাইয়ে রপ্তানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। মাত্র এক মাসে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের রফতানি বেড়েছে।
তবে এটিকে এখনই পোশাক খাতের ঘুরে দাঁড়ানোর স্থায়ী লক্ষণ হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। কারণ এক বছরের তুলনায় রফতানি এখনও কম। পোশাক রফতানিতে মাসভিত্তিক ওঠানামা স্বাভাবিক। ক্রয়াদেশ, উৎপাদন ও পণ্য জাহাজীকরণের সময়সূচির ওপর ভিত্তি করে কোনো কোনও মাসে রফতানি হঠাৎ বেড়ে বা কমে যেতে পারে। তাই জুলাইয়ের ভালো মাসভিত্তিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে আগামী কয়েক মাসে ধারাবাহিকভাবে রফতানি বাড়ানোই হবে পোশাক খাতের জন্য বড় পরীক্ষা।
নতুন বাজারে নজর দেওয়ার সময়
জুলাইয়ের পরিসংখ্যান বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে— প্রধান বাজারগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রফতানি প্রবৃদ্ধির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন একাই বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক পোশাক রফতানি গ্রহণ করে। যুক্তরাষ্ট্র নেয় আরও এক-পঞ্চমাংশের বেশি। ফলে এই দুটি বাজারে সামান্য চাহিদা কমলেও মোট রপ্তানিতে তার প্রভাব পড়ে।
অন্যদিকে ইতালি, স্পেন ও নেদারল্যান্ডসের মতো বাজারে প্রবৃদ্ধি দেখাচ্ছে, নতুন সুযোগ এখনও রয়েছে। বিশেষ করে ইতালিতে প্রায় ৩২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রমাণ করে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা পুরোপুরি কমে যায়নি; বরং দেশভেদে বাজারের পরিস্থিতি ভিন্ন। এ অবস্থায় পোশাক রফতানিকারকদের জন্য নতুন বাজার খোঁজার পাশাপাশি বিদ্যমান বাজারে উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পোশাকের বাজার সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সব মিলিয়ে জুলাইয়ের রফতানি বাংলাদেশের পোশাক খাতকে একই সঙ্গে সতর্কতা ও সম্ভাবনার বার্তা দিয়েছে। বড় বাজারে চাপ থাকলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাজারে প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। এখন সেই প্রবৃদ্ধিকে আরও বিস্তৃত বাজারে ছড়িয়ে দিতে পারাই হবে পোশাক খাতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, জুলাইয়ের পোশাক রফতানিতে একদিকে যেমন মাসভিত্তিক ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে, অন্যদিকে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রফতানি কমেছে। ইউরোপের বড় বাজারগুলোতে চাপ থাকলেও ইতালি, স্পেন ও নেদারল্যান্ডসের মতো বাজারে প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক। এ অবস্থায় প্রচলিত বাজার ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন বাজার সম্প্রসারণ এবং পণ্যে বৈচিত্র্য আনা জরুরি। আগামী মাসগুলোতে রফতানির ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।









