শিক্ষক নিয়োগ গভর্নিং বডির কাছে যাচ্ছে না

এস এম আব্বাস
১১ আগস্ট ২০২৬, ২২:৩০আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৬, ২২:৩৬

দেশের এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) কাছেই থাকছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারবে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনও জানিয়েছেন, ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে ৩ আগস্টের সভার কার্যবিবরণীতে এনটিআরসিএর নিয়োগ সুপারিশের ক্ষমতা প্রত্যাহারের যে সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল, সেটি কার্যকর হচ্ছে না।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। মন্ত্রী মহোদয় জানিয়ে দিয়েছেন, গভর্নিং বডি নয়, এনটিআরসিএ শিক্ষক নিয়োগ দেবে।’

এনটিআরসিএর দায়িত্ব কী?

বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) প্রতিষ্ঠিত হয় বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৫-এর মাধ্যমে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার জন্য প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই, নিবন্ধন পরীক্ষা নেওয়া এবং উত্তীর্ণদের প্রত্যয়ন দেওয়ার পাশাপাশি বর্তমানে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের জন্য যোগ্য প্রার্থীদের সুপারিশ করাও প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

বর্তমান ব্যবস্থায় এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শূন্য পদে সরাসরি ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারে না। প্রতিষ্ঠান থেকে শূন্য পদের তথ্য নেওয়া, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদন গ্রহণের পর এনটিআরসিএ নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় প্রার্থী নির্বাচন করে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে।

শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা নেওয়া ও সনদ দেওয়ার পাশাপাশি বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এনটিআরসিএই কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে।

কেন এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগ?

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের বর্তমান কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং নিয়োগ-বাণিজ্য বন্ধ করা।

আগে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেন, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠত। একই সঙ্গে যোগ্যতার পরিবর্তে অন্য বিষয় বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগও ছিল।

এই পরিস্থিতিতে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্রীয় কাঠামোর আওতায় এনে যোগ্য প্রার্থীদের মধ্য থেকে নিয়োগের সুপারিশ করার ব্যবস্থা চালু করা হয়। এর ফলে কোনও নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে সরাসরি শিক্ষক বাছাই ও নিয়োগের ক্ষমতা থাকে না।

৩ আগস্টের সভায় কেন ভিন্ন সিদ্ধান্ত এসেছিল?

এনটিআরসিএর নিয়োগের ক্ষমতা নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয় ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত একটি সভাকে কেন্দ্র করে। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন শিক্ষামন্ত্রী। উপস্থিত ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক, এনটিআরসিএর চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আলিফ রুদাবাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সভাটির কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়, ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৫’ অনুযায়ী এনটিআরসিএ শুধু নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের কাজ করবে। ২০১৫ সালের পরিপত্র অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি আর শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করবে না বলেও কার্যবিবরণীতে সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়া ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৯ হাজার ৮৪২ জনকে তাঁদের পছন্দ অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়েও সিদ্ধান্তের কথা কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়। এ জন্য প্রয়োজনীয় পরিপত্র বা প্রজ্ঞাপন সংশোধন বা জারির কথাও বলা হয়েছিল।

এই কার্যবিবরণীর তথ্য প্রকাশ্যে আসার পরই এনটিআরসিএর নিয়োগের ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

ফেসবুকে সমালোচনা, প্রশ্ন ওঠে নিয়োগ-বাণিজ্য নিয়েও

৩ আগস্টের সভার কার্যবিবরণীর তথ্য প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। শিক্ষক নিবন্ধনধারী চাকরিপ্রার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল-সংগঠনের পক্ষ থেকেও উদ্যোগটির বিরোধিতা করা হয়।

ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্ট ও মন্তব্যে মূলত অভিযোগ করা হয়, এনটিআরসিএর পরিবর্তে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হলে আবারও রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সমালোচনাকারীদের একটি অংশের অভিযোগ ছিল, সরকারদলীয় লোকজনকে শিক্ষক নিয়োগে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেওয়া এবং নিয়োগ-বাণিজ্যের পথ তৈরি করতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট কোনও প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

এমন সমালোচনার মধ্যেই ১০ আগস্ট রাতে শিক্ষামন্ত্রীর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে অ্যাডমিনের পক্ষ থেকে মন্ত্রীর বরাত দিয়ে জানানো হয়, ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার কোনও সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি।

ফেসবুক পোস্টে বলা হয়, এনটিআরসিএর কার্যক্রম ও শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, দক্ষ ও সুন্দরভাবে কীভাবে পরিচালনা করা যায়, সে বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনা অব্যাহত রয়েছে। ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার কোনও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত এনটিআরসিএর পক্ষেই

মন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পর মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিষয়টি আরও স্পষ্ট হলো। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক মঙ্গলবার রাতে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। মন্ত্রী মহোদয় জানিয়ে দিয়েছেন, গভর্নিং বডি নয়, এনটিআরসিএ শিক্ষক নিয়োগ দেবে।’

ফলে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমান কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাই বহাল থাকছে। অর্থাৎ শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ যোগ্য প্রার্থীদের মধ্য থেকে এনটিআরসিএ শূন্য পদের বিপরীতে নিয়োগের জন্য প্রার্থী সুপারিশ করবে। এতে করে ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৯ হাজার ৮৪২ জনের নিয়োগ নিয়েও আপাতত ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগের যে আলোচনা তৈরি হয়েছিল, সেটিও আর থাকছে না।

এনটিআরসিএর সামনে এখন কী চ্যালেঞ্জ

এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা বহাল থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ, দ্রুত ও কার্যকর করার প্রশ্নটি সামনে রয়েছে। শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর দীর্ঘদিন নিয়োগের অপেক্ষায় থাকা প্রার্থীদের অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে।

অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শূন্য পদ দ্রুত পূরণ, যোগ্য শিক্ষক নির্বাচন এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনও ধরনের অনিয়মের সুযোগ না রাখাও এনটিআরসিএর জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও এনটিআরসিএর কার্যক্রম ও শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, দক্ষ ও সুন্দর করার বিষয়ে পর্যালোচনা অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে। ফলে এনটিআরসিএর হাতে শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব থাকছে, এটি এখন নিশ্চিত। তবে কীভাবে এই প্রতিষ্ঠানকে আরও দক্ষ ও স্বচ্ছ করে তোলা যায়, সেটিই সামনে বড় প্রশ্ন।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
শিক্ষক নিয়োগ গভর্নিং বডির হাতে যাওয়ার গুঞ্জন: ক্ষুব্ধ ছাত্রনেতারা
এনটিআরসিএ নিয়ে কী হচ্ছে?
এনটিআরসিএর পরিবর্তে ম্যানেজিং কমিটি কোনোভাবেই মানা হবে না: জামায়াত আমির
সর্বশেষ খবর
দিনদুপুরে সাদাপোশাকে মাইক্রোবাসে সাংবাদিক নেতাকে তুলে নিয়ে গেলো কারা?
দিনদুপুরে সাদাপোশাকে মাইক্রোবাসে সাংবাদিক নেতাকে তুলে নিয়ে গেলো কারা?
সংসদ সদস্যদের বৈঠক ডেকেছে নির্বাচন কমিশন
সংসদ সদস্যদের বৈঠক ডেকেছে নির্বাচন কমিশন
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির মহাসচিব হবেন কে
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির মহাসচিব হবেন কে
তুর্কি হামামে আসলে কী ঘটে
তুর্কি হামামে আসলে কী ঘটে
সর্বাধিক পঠিত
এমপির গলায় রামদা ধরে বাড়িসহ সব সম্পত্তি লিখে নিলো কারা?
এমপির গলায় রামদা ধরে বাড়িসহ সব সম্পত্তি লিখে নিলো কারা?
শাবনূরের বার্তা, ডন গ্রেফতার: সালমান শাহ হত্যা মামলায় নতুন মোড়
শাবনূরের বার্তা, ডন গ্রেফতার: সালমান শাহ হত্যা মামলায় নতুন মোড়
আগামীকাল স্কুল-কলেজে ছুটি
আগামীকাল স্কুল-কলেজে ছুটি
একসঙ্গে পরীক্ষা দিলেন মা-ছেলে, দুই জনই পেলেন জিপিএ-৫
একসঙ্গে পরীক্ষা দিলেন মা-ছেলে, দুই জনই পেলেন জিপিএ-৫
দোকানে ঢুকে মোবাইল চুরি করা এসআইকে প্রত্যাহার
দোকানে ঢুকে মোবাইল চুরি করা এসআইকে প্রত্যাহার