মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি পুরোপুরি না কমায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ত্রৈমাসিকের জন্য নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সংকটের সময় ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সুবিধা স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ)-এর হার ১১ শতাংশ এবং ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে রাখার সুবিধা স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ)-এর হার ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান। এ সময় ডেপুটি গভর্নর সারোয়ার হোসেন ও আনিছুর রহমানসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি এখনো কাটেনি
মুদ্রানীতি ঘোষণাকালে ড. হাবিবুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি কমে এলেও এর অন্তর্নিহিত ঝুঁকি এখনো রয়েছে। এ কারণে আপাতত নীতি সুদহার কমানোর পথে যাচ্ছে না বাংলাদেশ ব্যাংক।
তিনি বলেন, গত জুনে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। আগস্টে তা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ দশমিক ৩২ শতাংশের মতো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সারের দাম বাড়া এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংকটের কারণে ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রবৃদ্ধির চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সতর্ক অবস্থান
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর বলেন, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসও দুর্বল। বিশ্বব্যাংক ৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে আইএমএফ তাদের পূর্বাভাস সংশোধন করে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রক্রিয়াকে ব্যাহত না করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ড. হাবিবুর রহমান বলেন, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর বাংলাদেশ ব্যাংক নিবিড় নজর রাখবে। অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সুনির্দিষ্ট খাতে ঋণ সহায়তা, কাঠামোগত সংস্কার, আর্থিক খাত শক্তিশালী করা এবং বিনিময় হারকে সুশৃঙ্খলভাবে নমনীয় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সামগ্রিক লক্ষ্য হলো মূল্য স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য এবং আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বজায় রেখে অর্থনীতির টেকসই পুনরুদ্ধারে সহায়তা করা।
খেলাপি ঋণ ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ
মুদ্রানীতি ঘোষণায় দেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বল অবস্থার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। ড. হাবিবুর রহমান বলেন, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে উঠেছে।
অপরদিকে, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধিও খুবই কম। বর্তমানে এ খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এ চিত্র বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাবের বিষয়টি স্পষ্ট করছে।
তবে এর মধ্যেও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। ডেপুটি গভর্নর বলেন, প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের প্রবাহ ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়েছে। ফলে বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।
৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ
ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা পুনরায় চালু করতে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং কৃষি, কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে আরও ৪০ হাজার কোটি টাকা রাখার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এই অর্থ যাতে যথাযথ খাতে এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছায়, সে জন্য শিগগিরই বিস্তারিত কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন ড. হাবিবুর রহমান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে উচ্চ সুদহার ধরে রাখা হচ্ছে, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে নির্দিষ্ট খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ফলে নতুন মুদ্রানীতিতে সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।
তিন মাস পরপর মুদ্রানীতি
বাংলাদেশ ব্যাংক এবারই প্রথম ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। এর ফলে অর্থনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তুলনামূলক কম সময়ের ব্যবধানে নীতিগত অবস্থান পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, আগামী দিনগুলোতে মূল্যস্ফীতি, ঋণের প্রবাহ, বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার, রেমিট্যান্স এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হবে। এসব সূচকের পরিবর্তনের ভিত্তিতেই পরবর্তী ত্রৈমাসিকের মুদ্রানীতিতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
খেলাপি ঋণ কমাতে ১৮ মাসের পরিকল্পনা