‘বেলা বাড়লে দাম কমে, সেই অপেক্ষায় বাজারে ঘুরি’

আতিক হাসান শুভ
০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৩ আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৩

সকাল সাতটায় বাজারে এসে প্রায় ২ ঘণ্টা ঘোরাঘুরি করেও বাসার জন্য কোনও সদাই করেননি মোক্তার আলী (৪৮)। পেশায় তিনি একজন বেসরকারি চাকরিজীবী। গ্রাম থেকে আজ মেহমান আসবে বিধায় মাছ মাংস ও সবজি কেনার জন্য সাতসকালে বাজারে এসেছেন। কিন্তু সবকিছু নাগালের বাইরে হওয়ায় শুধু এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করছেন। তবে পণ করেছেন, ‘মাছ মাংস না কিনে বাসায় ফিরবেন না।’ তাই অপেক্ষা করেছেন বেলা গড়ানোর। তিনি বলেন, ‘বেলা বাড়লে দাম কমে, সেই অপেক্ষায় বাজারে ঘুরি।’

বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আজ শ্বশুরবাড়ি থেকে লোকজন ঢাকায় আসবে। গত মাসে ডাক্তার দেখাতে এসেছিল আমার বৃদ্ধ বাবা। তখন তেলাপিয়া মাছ আর ফার্মের মুরগী দিয়ে ভাত খাওয়াইছি। কিন্তু বউয়ের কড়া কথা, তার বাপ-মায়ের জন্য কক বা সোনালি মুরগি এবং রুই, ইলিশ বা চিংড়ি কিনতে হবে। সঙ্গে একডজন ডিম। এছাড়াও ভালো দেখে দু-তিন পদের সবজি। কিন্তু বাজারে এসে কোনও কিছুরই হিসেবে মিলছে না। পকেটে টাকা আছে ১৩৪০। এ দিকে মেয়ের স্কুল ড্রেস সেলাই করতে দিয়েছি, ওখানে লাগবে মোট সাতশ’ টাকা।’

মোক্তার আলী বলেন, ‘ইলিশ মাছ কেনার সাধ্য আমার নেই। ছোট ইলিশ মাছের কেজি বলতেছে ১২০০- ১৫০০ টাকা। ছোট ছোট রুই কাতলার কেজি ৫০০ টাকার ওপরে। কক মুরগির কেজি ৩৫০ টাকা। ডিমের ডজন ১৫০ টাকা। ৮০ টাকার নিচে কোনও সবজি নেই। তাই মাথায় কাজ করছে না, কী রেখে কী কিনবো। এ জন্য বাজারে ঘোরাঘুরি করছি, আর সব দোকানে জিজ্ঞেস করছি দাম কত। কারণ শেষ মুহূর্তে মাছ,‌ সবজি এ সবকিছুর দাম কিছুটা কমে।’ 

মোক্তার আলীর মতো এমন অনেকেই বাজারে এসে মাছ মাংস বা শাকসবজির দাম শুনে কমার অপেক্ষায় বাজারের এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করেন। কারণ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের পাশাপাশি কাঁচাবাজারের অনেক জিনিসপত্র নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যদের সামর্থ্যের বাইরে। কবে নাগাদ এই দাম কমবে তা কেউই জানেন না। তবুও পরিবার বা আত্মীয়-স্বজন এলে হাসিমুখে সবকিছু ম্যানেজ করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন তারা।

সরেজমিনে রবিবার (৪ অক্টোবর) পুরান ঢাকার রায় সাহেব বাজার ঘুরে দেখা যায়, বেগুন, করলা, বরবটি, ঢ্যাঁড়স, পটল ও কাঁকরোলসহ বেশির ভাগ সাধারণ সবজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে। 

তন্মধ্যে করলা ১২০ টাকা, পটল ৮০ টাকা, ফুলকপি প্রতি পিস ১২০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া চিচিঙ্গা ৮০, ঝিঙ্গা ১২০, সিম ২২০ টাকা, কচু ৮০ টাকা, ঢেঁড়স ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে কাঁচা পেঁপে তুলনামূলক কম, কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে ৩৫-৪০ টাকায়। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের পরিবারের নিত্যদিনের খাবারের তালিকায় থাকা ডিমও এখন বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ডজন প্রতি দেড়শ টাকার বেশি বিক্রি হচ্ছে ডিম।

অন্যদিকে, কক মুরগি বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকা এবং ব্রয়লার মুরগি ২৮০ থেকে ২৯০ টাকায়। ছোট সাইজের রুই প্রতি কেজি ৩৬০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি, বড় রুই ৫০০ টাকা, তেলাপেয়া ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা, পাঙ্গাস ২৫০-২৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া পাবদা মাছ ৪৫০ টাকা, ছোট চিংড়ি ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংস ৮২০ টাকা এবং খাসির মাংস ১২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। 

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিষয়ে বাজারে আসা শামসুল হক নামের একজন ক্রেতা বলেন, ‘সব সরকারের আমলেই নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য নাগালের বাইরে থাকে। কোনও সরকারই জনগণের সরকার হতে পারলো না। আমাদের তো বিশ্ব রাজনীতি বোঝানোর দরকার নেই। আমাদের দরকার দৈনন্দিন কেনাকাটা সামর্থ্যের মধ্যে থাকা। কিন্তু সরকার সেটি করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘সরকারি চাকরিজীবীদের আগেও বেতন ভালো ছিল। এখন আবার পে স্কেল দিয়েছে। আর আমরা যারা বেসরকারি চাকরিজীবী আছি, তারা যে কত কষ্ট করে সংসার চালানো লাগছে সরকারের তা বোঝার সাধ্য নেই। বাজারে সদাই করতে আসলে বুকে পাথর চেপে আসা লাগে। সবকিছুর দাম এত বেশি যে চাইলেই মন মতো বাজার করতে পারি না।’

সানজিদা খানম নামের আরেকজন ক্রেতা বলেন, ‘ক্ষমতায় কে থাকলো কে গেলো আমাদের তা দেখার বিষয় না। আমরা চাই চাল ডাল থেকে শুরু করে মাছ মাংস তেল সবকিছু যেন নাগালের মধ্যে থাকে। কোনও সরকারই জনগণের এইটুকু প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। বাজারে এলে ১০০ বার ভাবা লাগে কী কিনবো। কারণ সবকিছুর দাম বাড়তি। শুধু তেলাপিয়া আর পাঙ্গাস মাছ খেতে খেতে বাচ্চারা বিরক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু আমার তো কিছু করার নেই। আমার তো ইলিশ মাছ কেনার বাজেট নেই। খাসির মাংস কিংবা গরুর মাংস কেনারও সাধ্য নেই।’ 

শাকসবজির বাড়তি দামের বিষয়ে সবজি বিক্রেতা সোলাইমান আহমেদ বলেন, ‘সবজির দাম প্রতিদিন দুই চার টাকা করে বাড়ছে। তবে কমার কোনও লক্ষণ দেখছি না। আমরা পাইকারি দরে কিনে আনি, খুবই সামান্য লাভে তা বিক্রি করি। দাম না কমলে তো আমাদের কিছু করার থাকে না। অনেকে আমাদের বকাঝকা করে। তাতে তো কোনো লাভ নেই। আমরা কম দামে কিনতে না পারলে কম দামে বিক্রি করবো কীভাবে! অনেক সময় দেখা যায়, কিছু সবজি নষ্ট হয়ে যায় বা পচে যায়। সেগুলো আমরা একেবারে ফেলে দেই না, সেগুলো কেনারও লোক আছে।’ 

অন্যদিকে মাছের বাড়তি দামের বিষয়ে মাছ বিক্রেতা রাসেল বলেন, ‘আড়তদাররা মাছের দাম বেশি বিক্রি করলে আমাদের তো কিছু করার থাকে না। আমরা হলাম খুচরা বিক্রেতা। যে দামে কিনে আনি তার চেয়ে সামান্য বেশি লাভে বিক্রি করার চেষ্টা করি।’ 

বেলা বাড়ার সঙ্গে মাছের দাম কমার কী সম্পর্ক এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একেবারে ভোরে তো একদাম তাজা মাছ থাকে। এ জন্য তখন দাম একটু বেশি থাকে। তবে যত সময় যায় মাছ তো তত নরম হতে থাকে। এ জন্য বেলা বাড়লে মাছের দাম কিছুটা কমে। তবে আ হা মরি বেশি কমার সুযোগ নেই।’

/আইএএম/
সম্পর্কিত
‘বাজারের যা অবস্থা আগে যেখানে বেশি কিনতাম, এখন কম কিনতে হয়’  
জ্বালানি তেলের বাড়তি দামে উত্তপ্ত কাঁচাবাজার
তেলের ধাক্কায় ট্রাক ভাড়া বেড়েছে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত, চাল-পেঁয়াজে কত
সর্বশেষ খবর
নদী নষ্ট, দেশ ধ্বংস 
নদী নষ্ট, দেশ ধ্বংস 
নাগরিকদের ‘সামরিক প্রশিক্ষণ’ দেবে ইরানি সেনাবাহিনী
নাগরিকদের ‘সামরিক প্রশিক্ষণ’ দেবে ইরানি সেনাবাহিনী
মেনুর ছবিতে খাবার এত সুন্দর, প্লেটে এলেই কেন বদলে যায়?
মেনুর ছবিতে খাবার এত সুন্দর, প্লেটে এলেই কেন বদলে যায়?
মোহাম্মদপুরে গির্জার ঘণ্টা চুরির ঘটনায় গ্রেফতার ২
মোহাম্মদপুরে গির্জার ঘণ্টা চুরির ঘটনায় গ্রেফতার ২
সর্বাধিক পঠিত
মিজু, মৌসুমী-ডিপজল নেননি কোনও পারিশ্রমিক, জানালেন নির্মাতা
মিজু, মৌসুমী-ডিপজল নেননি কোনও পারিশ্রমিক, জানালেন নির্মাতা
সাড়ে ৬ লাখ পরিবারকে ২৫ কেজি করে চাল দেবে সরকার, পাবে যেসব জেলা
সাড়ে ৬ লাখ পরিবারকে ২৫ কেজি করে চাল দেবে সরকার, পাবে যেসব জেলা
রূপপুরের বিদ্যুৎ এলে কতটা কমবে লোডশেডিং?
রূপপুরের বিদ্যুৎ এলে কতটা কমবে লোডশেডিং?
আখতারুজ্জামান জামায়াতের নেতা নন, সহযোগী সদস্য: এটিএম আজহার
আখতারুজ্জামান জামায়াতের নেতা নন, সহযোগী সদস্য: এটিএম আজহার
‘চেয়ারম্যান-মেম্বার পদে মনোনয়ন দেওয়া হবে, আর কেউ নির্বাচনে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবেন না’
‘চেয়ারম্যান-মেম্বার পদে মনোনয়ন দেওয়া হবে, আর কেউ নির্বাচনে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবেন না’