১৬ বছর পর বেসরকারি কোম্পানির জন্য খুলছে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
২০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১০ আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১০

দীর্ঘ ১৬ বছর পর দেশের শেয়ারবাজারে বেসরকারি কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ আবারও চালু করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নতুন বিধিমালার আওতায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে বড় দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলো প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও ছাড়াই সরাসরি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারবে। এতে কোম্পানির উদ্যোক্তা ও প্রাথমিক শেয়ারহোল্ডাররা নিজেদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রির সুযোগ পাবেন। 

দুই বছরের বেশি সময় ধরে আইপিওশূন্য শেয়ারবাজারে নতুন কোম্পানি আনা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তবে অতীতে সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে শেয়ার বিক্রিতে অনিয়ম ও বিতর্কের অভিজ্ঞতা থাকায় এবার যোগ্যতা, আর্থিক সক্ষমতা, শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ এবং উদ্যোক্তাদের শেয়ার ধারণের বিষয়ে বেশ কিছু কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে।

রবিবার (১৮ অক্টোবর) এ-সংক্রান্ত বিধিমালার গেজেট প্রকাশিত হয়েছে।

যেসব কোম্পানি সরাসরি তালিকাভুক্ত হতে পারবে

নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, সব বেসরকারি কোম্পানি সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ পাবে না। এ সুবিধা পেতে হলে কোম্পানিতে সরকারের অন্তত ১০ শতাংশ মালিকানা থাকতে হবে অথবা কোম্পানির অন্তত ৫১ শতাংশ মালিকানা বিদেশিদের হাতে থাকতে হবে।

এ ছাড়া অন্তত ৫০০ কোটি টাকার নিট সম্পদ রয়েছে— এমন তপশিলি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানি এ প্রক্রিয়ায় তালিকাভুক্ত হতে পারবে। বার্ষিক অন্তত এক হাজার কোটি টাকা টার্নওভার রয়েছে, এমন কোম্পানিও এ সুযোগ পাবে। পাশাপাশি স্টক এক্সচেঞ্জ ও ডিপোজিটরি প্রতিষ্ঠান সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য বিবেচিত হবে।

বিএসইসির প্রত্যাশা, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে বড় ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে আনা সম্ভব হবে। যেসব কোম্পানির নতুন মূলধনের প্রয়োজন নেই, কিন্তু উদ্যোক্তারা বিদ্যমান শেয়ার বিক্রি করতে চান, তাদের জন্যও এ প্রক্রিয়া বিকল্প সুযোগ তৈরি করবে।

তালিকাভুক্তির আগে পূরণ করতে হবে যেসব শর্ত

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কোম্পানির ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও আর্থিক অবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে বিএসইসি।

বিধিমালা অনুযায়ী, আগ্রহী কোম্পানিকে টানা অন্তত পাঁচ বছর বাণিজ্যিক উৎপাদনে থাকতে হবে। সর্বশেষ দুই আর্থিক বছরে মূল ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে মুনাফা অর্জন করতে হবে। ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে নগদ অর্থের প্রবাহও ইতিবাচক থাকতে হবে। একই সঙ্গে কোম্পানির কোনও পুঞ্জীভূত লোকসান থাকা চলবে না।

শুধু কোম্পানির আর্থিক অবস্থাই নয়, উদ্যোক্তা ও শেয়ার বিক্রেতাদের অবস্থাও বিবেচনায় নেওয়া হবে। উদ্যোক্তা কিংবা যারা শেয়ার বিক্রি করবেন, তারা ঋণখেলাপি হতে পারবেন না।

এ ছাড়া তালিকাভুক্তির পর উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে কোম্পানির অন্তত ৩০ শতাংশ শেয়ার ধরে রাখতে হবে। এর ফলে তালিকাভুক্তির পরপরই উদ্যোক্তাদের বড় অংশের শেয়ার বিক্রি করে সরে যাওয়ার সুযোগ সীমিত থাকবে।

কীভাবে বিক্রি হবে শেয়ার, নির্ধারণ হবে দাম

সরাসরি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে কোম্পানির উদ্যোক্তা, পরিচালক ও প্রাথমিক শেয়ারহোল্ডাররা নিজেদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করতে পারবেন। তবে পুরো প্রক্রিয়ায় তাদের মূল পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশের সমপরিমাণ শেয়ার বিক্রি করতে হবে।

শেয়ারের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। মার্চেন্ট ব্যাংকারের পরামর্শ নিয়ে কোম্পানির সম্পদ, দায় ও আয় বিবেচনায় শেয়ারের যৌক্তিক মূল্য বা রেফারেন্স মূল্য নির্ধারণ করা হবে। এরপর শেয়ার বিক্রির জন্য ঘোষিত সর্বনিম্ন মূল্য ওই রেফারেন্স মূল্যের চেয়ে অন্তত ২৫ শতাংশ কম রাখতে হবে।

বিনিয়োগকারীরা প্রথম দুই দিন ঘোষিত সর্বনিম্ন বিক্রয়মূল্যের চেয়ে কম দামে শেয়ার কেনার আদেশ দিতে পারবেন না। অর্থাৎ, প্রাথমিক পর্যায়ে শেয়ারের দাম নিয়ে দর-কষাকষির একটি সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

বিএসইসির এ ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো, শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে অতিরিক্ত উচ্চ মূল্যায়ন ও বিনিয়োগকারীদের সম্ভাব্য ক্ষতির ঝুঁকি কমানো। তবে এ ব্যবস্থায় প্রকৃত বাজারমূল্য কতটা প্রতিফলিত হবে, তা নির্ভর করবে কোম্পানির আর্থিক তথ্য, মূল্যায়নের মান এবং বিনিয়োগকারীদের চাহিদার ওপর।

অতীতের অভিজ্ঞতায় সতর্ক নিয়ন্ত্রক সংস্থা

দেশের শেয়ারবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্তির ইতিহাসে ভালো ও খারাপ— দুই ধরনের অভিজ্ঞতাই রয়েছে। ২০১০ সালে খুলনা পাওয়ার কোম্পানি ও ওশান কনটেইনারের তালিকাভুক্তিকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে বেসরকারি কোম্পানির জন্য এ সুযোগ বন্ধ করে শুধু সরকারি কোম্পানির ক্ষেত্রে তা সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে এরপর এ পদ্ধতিতে কোনও সরকারি কোম্পানিও তালিকাভুক্ত হয়নি।

২০১৪ সালে আমান সিমেন্ট এবং ২০২২ সালে বেস্ট হোল্ডিংস সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে শেয়ার বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে বিএসইসি উভয় উদ্যোগ আটকে দেয়। আমান সিমেন্টের ক্ষেত্রে পুরোনো ও তুলনামূলক কম উৎপাদনক্ষম কোম্পানির শেয়ার বিক্রির উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অন্যদিকে বেস্ট হোল্ডিংসের শেয়ার উচ্চমূল্যে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।

এ পর্যন্ত সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে পাঁচটি বেসরকারি কোম্পানি শেয়ারবাজারে এসেছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে নাভানা সিএনজি এবং ২০১০ সালে খুলনা পাওয়ার তালিকাভুক্ত হয়। বর্তমানে কোম্পানি দুটি ‘জেড’ ক্যাটেগরিতে রয়েছে। ২০০৮ সালে তালিকাভুক্ত শাইনপুকুর সিরামিক এখন ‘বি’ ক্যাটেগরিতে রয়েছে। ওশান কনটেইনার পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়িক পুনর্গঠনের মাধ্যমে একই গ্রুপের সামিট অ্যালায়েন্স পোর্টের সঙ্গে একীভূত হয়। অন্যদিকে সরাসরি তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে এসিআই ফর্মুলেশন এখন পর্যন্ত তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে।

আইপিওশূন্য বাজারে নতুন আশার সুযোগ

দুই বছরের বেশি সময় ধরে নতুন আইপিও না আসায় দেশের শেয়ারবাজারে নতুন কোম্পানির সরবরাহ ও বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিএসইসির নতুন বিধিমালাকে বাজারে বড় কোম্পানি আনার একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিবেচনায়, অনেক ভালো কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহী হয় না। এর কারণ হিসেবে শেয়ারের কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়া, ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য নতুন মূলধনের প্রয়োজন না থাকা এবং দীর্ঘ আইপিও প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ এসব কোম্পানিকে বাজারে আসতে উৎসাহিত করতে পারে।

তবে নতুন বিধিমালার কার্যকারিতা নির্ভর করবে এর বাস্তব প্রয়োগের ওপর। যোগ্য কোম্পানি নির্বাচন, আর্থিক তথ্য যাচাই, শেয়ারের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ এবং তালিকাভুক্তির পর উদ্যোক্তাদের শেয়ার ধারণের শর্ত কার্যকরভাবে তদারক করা জরুরি।

অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, শুধু নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত করলেই শেয়ারবাজারের গভীরতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ে না। কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি, সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং শেয়ারের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা না গেলে নতুন ব্যবস্থাও বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। তাই নতুন বিধিমালার সাফল্য নির্ভর করবে কতগুলো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলো, তার পাশাপাশি এসব কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের কতটা সুরক্ষা দিতে পারছে, তার ওপরও।

/জিএম/এসটি/ 
সম্পর্কিত
এআই খাতের শেয়ারে ধস
পুঁজিবাজারের বিশেষ তহবিল ৩০০ কোটি করার দাবি
বেক্সিমকোর আরও দুই কোম্পানির পর্ষদ থেকে বাদ সালমান এফ রহমান
সর্বশেষ খবর
পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে সৈয়দপুর পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী
পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে সৈয়দপুর পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী
বিক্ষোভ-সহিংসতায় উত্তাল ফ্রান্স, ম্যাক্রোঁ কোথায়?
বিক্ষোভ-সহিংসতায় উত্তাল ফ্রান্স, ম্যাক্রোঁ কোথায়?
বক্স অফিসে ‘জেলার ২’-এর ঝড়: ৫০০ কোটির ক্লাবে প্রবেশের অপেক্ষা
বক্স অফিসে ‘জেলার ২’-এর ঝড়: ৫০০ কোটির ক্লাবে প্রবেশের অপেক্ষা
আজ থেকে টানা ৫ দিন বন্ধ ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠান, চাপ বাড়ছে এটিএম বুথে
আজ থেকে টানা ৫ দিন বন্ধ ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠান, চাপ বাড়ছে এটিএম বুথে
সর্বাধিক পঠিত
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন