সংযোগ ও বিতরণে পরিকল্পনার অভাবে পুড়ছে বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার। বিতরণ সংস্থার বছরব্যাপী ট্রান্সফরমার পোড়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শীতের চেয়ে গ্রীষ্মে ট্রান্সফরমার পোড়ার হার বেশি। এই হার শহরের চেয়েছে গ্রামে বেশি। এ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতন হলেই একটি ট্রান্সফরমারও পোড়ার কথা নয়।
দেশে সব থেকে বেশি ট্রান্সফরমার পোড়ে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) এলাকায়। গত নভেম্বরে আরইবির অধীন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর (পবিস) ট্রান্সফরমার পুড়েছে ৪ হাজার ৯৬৬টি, ডিসেম্বরে পুড়েছে ৩ হাজার ৩৮টি। আবার গত বছরের মার্চে অর্থাৎ গ্রীষ্মের সময় আরইবি এলাকায় ৪ হাজার ৩৫৪টি ও এপ্রিলে ৬ হাজার ৬৪৪টি ট্রান্সফরমার পুড়েছে।
আরইবি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মঈন উদ্দিন বলেন, ‘নিয়মিত ওভারলোডেড ট্রান্সফরমার পরিবর্তন করা হচ্ছে। এতে ট্রান্সফরমার পুড়ে যাওয়া কমছে।’
গত বছরের এই ট্রান্সফরমার পুড়ে যাওয়ার তথ্য নিয়ে আইবিতে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, ‘যখন বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়, তখন একজন ব্যবহারকারী সম্পর্কে সঠিক তথ্যের মূল্যায়ন না করায় এমন বিপত্তি ঘটে।’ তিনি বলেন, ‘যখন নতুন কোনও এলাকায় বিদ্যুৎ-সংযোগ দেওয়া হয়, তখন একজন ব্যবহারকারীর ফ্যান, লাইট ও একটি টেলিভিশনের জন্য লোড বিবেচনা করা হয়। তবে সংযোগ পাওয়ার পর ওই ব্যবহারকারী বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ বাড়ালে সিস্টেমের ওপর চাপ পড়ে। এভাবে ট্রান্সফরমারটি ওভারলোডে চলতে থাকে। ওভারলোডে চলতে চলতে একসময় সেটি পরিবর্তন না করলে পুড়ে যায়।’ দেশের অধিকাংশ ট্রান্সফরমার পুড়ে যাওয়ার প্রধান কারণই ওভারলোড সমস্যা বলে জানান তিনি।
বিভিন্ন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতের কর্মকর্তাদেরও এক্ষেত্রে গাফিলতি রয়েছে বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে। বিদ্যুৎ বিতরণে এখনও দেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় নেওয়া হয় না। দেশের মানুষ সংযোগ পাওয়ার পর কী ধরনের বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ ব্যবহার করতে পারে, এর আগাম বিশ্লেষণ করে ট্রান্সফরমার স্থাপন করা হয় না।
সম্প্রতি বিবিএসের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ১২ ভাগ মানুষ রান্নার কাজে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। সাধারণত বাজারের নিম্নমানের ইন্ডাকশন কুকার, কারি কুকার ও রাইস কুকার ব্যবহার করে মানুষ রান্না করে। এসব যন্ত্রাংশ অপেক্ষাকৃত বেশি মাত্রায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় গ্রামের মানুষও জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনতে ওয়াটার হিটার, আয়রন, ফ্রিজ, কম্পিউটার ব্যবহার করছে। কিন্তু এসব যন্ত্রাংশে বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় না নেওয়ায় সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।
সাধারণত পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ৫ কেভি থেকে থেকে ২০০০ কেভিএ পর্যন্ত ট্রান্সফরমার ব্যবহার করে। তবে সব চেয়ে বেশি ব্যবহার হয় ৫, ১০, ১৫, ২৫ ও ৩৭ দশমিক ৫ কেভিএ ক্ষমতার ট্রান্সফরমার। আর এসব ট্রান্সফরমার পোড়েও বেশি। কোনও এলাকায় প্রথম বিদ্যুৎ-সংযোগ দিতে ৫ কেভিএ-এর ট্রান্সফরমার ব্যবহার করে আরইবি। এভাবে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে আস্তে আস্তে ট্রান্সফরমারের ক্ষমতাও বাড়ানো হয়। তবে এখানে দেখভালের অভাবেই ট্রান্সফরমার পোড়ার ঘটনা ঘটে।
আগামী গ্রীষ্মে বিদ্যুতের উৎপাদন বেশি হলেও সরবরাহে সমস্যার কারণে ভোগান্তির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এজন্য ট্রান্সফরমার পুড়ে যাওযার কারণ নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
শুধু আরইবিই নয় অন্য বিতরণ সংস্থার ট্রান্সফরমারও পুড়ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) অধীনে আছে মোট ট্রান্সফরমারের সংখ্যা ১৫ হাজার ৮০০টি। এরমধ্যে ডিসেম্বর মাসে ১৬টি ট্রান্সফরমার পুড়ে গেছে। এরপর ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির (ডিপিডিসি) ট্রান্সফরমার আছে ১১ হাজার ৭৩৭টি, পুড়ে গেছে ২৬টি, পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির (ওজোপাডিকো) মোট ৬ হাজার ৯৯৭টি ট্রান্সফরমার আছে।এরমধ্যে পুড়ে গেছে ৩টি, ঢাকা বিদ্যুৎ সরবরাহ কোম্পানির (ডেসকো) আছে ৬ হাজার ৬০৮টি, এরমধ্যে পুড়ে গেছে ৫টি ও নর্দান পাওয়ার সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) ট্রান্সফরমারের সংখ্যা ৬ হাজার ৯৭৩টি। এরমধ্যে গত ডিসেম্বর মাসে পুড়েছে মাত্র ১টি। গত নভেম্বর মাসে দেশে মোট ৩ হাজার ৯৪টি ট্রান্সফরমার পুড়ে যায়। আর ডিসেম্বর মাসে এই পুড়ে যাওয়ার পরিমাণ আরও বেড়ে ৩ হাজার ৩১৫টি গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ খাতের নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, ‘ওভারলোডেড ট্রান্সফরমার কমিয়ে আনতে নিয়মিত সব সংস্থার কার্যক্রম মনিটরিং করা হচ্ছে। এছাড়া ট্রান্সফরমার পুড়ে যাওয়ার দায়দায়িত্ব নিরূপণে সব সংস্থাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।এ-সংক্রান্ত অগ্রগতি প্রতি মাসে মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে বলা হয়েছে। এতে দুই বছরে সমস্যা অনেকখানি কমিয়ে আনা গেছে। আগামীতে ওভারলোডেড ট্রান্সফরমার আরও কমে আসবে।’
তবে ওভারলোডের পাশাপাশি নিম্নমানের ট্রান্সফরমার ব্যবহারকেও দায়ী করছেন পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমতউল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আগে কোরিয়া-জাপান থেকে ট্রান্সফরমার কেনা হতো। এখন ভারত ও চীন থেকে সস্তায় কেনা হচ্ছে। এছাড়া নির্বিচারে সংযোগ দিতে গিয়ে ওভারলোড সমস্যা বাড়ানো হয়েছে। এসবের খেসারত হিসেবে এখন বছরে শত শত কোটি টাকার ট্রান্সফরমার পুড়ে যাচ্ছে।’ তিনি জানান, ‘সচেতন হলে একটিও ট্রান্সফরমার পুড়ে যাওয়ার কথা নয়।’ উন্নত বিশ্বের কোথাও এভাবে ট্রান্সফরমার পোড়ার ঘটনা ঘটে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।








