বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির ‘কলার বিলে’ গ্রাহকের আপত্তি

সঞ্চিতা সীতু
২৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৫:৪৮আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৭:৩৬


বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির ‘কলার বিলে’ গ্রাহকের আপত্তি ঘটনা-১

৮০ ছুঁই-ছুঁই বজলুর রহমান রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা। তার বাসার বিদ্যুতের লাইন কাটা পড়েছে। খবর দেওয়া হলো ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) লাইন সার্ভিসম্যানদের। এসে সব দেখে জানালো, ২০ হাজার টাকা লাগবে। হুট করে এত টাকা কীভাবে ম্যানেজ করবেন। বেশ কয়েকদিন এখানে-সেখানে ঘুরেও বাসায় বিদ্যুতের লাইন নিতে পারেননি তিনি।

ঘটনা-২
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল গিয়েছিলেন বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির গণশুনানিতে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) শুনানিতে তিনি জানান, তার বাসার সামনেই একটি লাইন বিকল হয়ে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তিনি ফোন করে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিতে অভিযোগ করেন। লাইন ঠিক করতে এসেই তারা টাকা চেয়ে বসে তার কাছে। কিন্তু সেই লাইন তো তার একার নয়। তাহলে তিনি কেন টাকা দেবেন। শুধু বজলুর রহমান ও সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল নন- এমন অভিযোগ অনেক গ্রাহকের।
গ্রাহকরা বলছেন, বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গেই তারা একটি সার্ভিস চার্জ দেন। সেই চার্জ দেওয়ার পর আবার লাইন ঠিক করতে এসে টাকা চাইছে কেন বিতরণ কোম্পানিগুলো। আগে যখন বিদ্যুতের অনেক ঘাটতি ছিল, প্রায়ই লোডশেডিং হতো সেই সময়ও সমস্যা ছিল বেশি। লাইনম্যানদের প্রায়ই আসতে হতো লাইন ঠিক করতে। তখন টাকা চাইতো না। হুট করে গত কিছু দিন ধরে এই টাকা চাওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারছেন না অনেক গ্রাহক। বিতরণ কোম্পানিগুলো আগে সার্ভিস বাবদ কোনও টাকা নিতো না। এখন কেন নিচ্ছে?
বলা হচ্ছে, আগে বিলের সঙ্গে যে সার্ভিস চার্জ ছিল এখন সেটা তুলে দিয়েছে বিইআরসি। ফলে তারা আলাদা অর্থ নিচ্ছেন। নিয়ম অনুযায়ী, বিতরণ কোম্পানি বিইআরসির বেঁধে দেওয়া নির্ধারিত অর্থের বাইরে আর কোন টাকা আদায় করতে পারে না। কিন্তু বিইআরসি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সময় কলার চার্জ বলে কোনও কিছু নির্ধারণ করে না দেওয়ায় গ্রাহক বিভ্রান্তিতে রয়েছেন। যদিও বিইআরসি বলছে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে মিনিমাম একটি বিল নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। তবে বজলুর রহমানের কাছে চাওয়া ২০ হাজার টাকা তো মিনিমাম অর্থ হতে পারে না।
অভিযোগ উঠেছে, বিতরণ কোম্পানি এই সুযোগে বেশি অর্থ আদায় করছে। খোদ বিইআরসির একজন সদস্যও এমন অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘বিতরণ কোম্পানির এই টাকা নেওয়ার কথা না, ভোক্তারও টাকা দেওয়ার কথা না। কিন্তু অনেক সময় টাকা না দিলে হয়রানি হতে হয় বলেই গ্রাহক বাধ্য হচ্ছেন টাকা দিতে।’
জানতে চাইলে ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহিদ সারোয়ার বলেন, ‘যেসব গ্রাহক ৫০ কিলোওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে তাদের বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হয়। তাদের নিজস্ব বাসায় সাবস্টেশন থাকে। ১১ কিলো ভোল্ট (কেভি) ক্ষমতার বিদ্যুতের লাইন থেকে বাসার সাবস্টেশন পর্যন্ত বিদ্যুতের যে তার টানা হয় সেটিকে সার্ভিস ড্রপ বলা হয়, সেখান থেকে আবার বাসার ভেতরে বিদ্যুৎ নেওয়া হয় আরেক তার দিয়ে। দুই ধরনের গ্রাহক রয়েছে। এক ধরনের ক্ষেত্রে নিজস্ব সাবস্টেশন থাকে। সেক্ষেত্রে বিদ্যুতের খুঁটি থেকে সাবস্টেশন পর্যন্ত যে তার থাকে সেখানে ড্রপ আউট ফিউজ, কানেক্টরসহ যেসব যন্ত্রপাতি রয়েছে- সেগুলো মালিকের। খুঁটি থেকে সাবস্টেশন পর্যন্ত কোনও তার যদি নষ্ট হয় সেটি মালিক দেবে। এছাড়া হঠাৎ করে ড্রপ আউট ফিউজ, কানেক্টরসহ নানা যন্ত্রপাতি নষ্ট হলে সাধারণত আমরা নিজেরাই স্থাপন করি। কিন্তু পরে বিলের সঙ্গে সেই যন্ত্রপাতিগুলোর দাম সমন্বয় করে দেওয়া হয়।’
এদিকে সাধারণ গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) এটিএম হারুন অর রশীদ বলেন, ‘২০১৮ সাল থেকে এই নিয়ম চালু করা হয়েছে। এখন আমরা বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে কোনও সার্ভিস চার্জ নিই না। কিন্তু কোনও লাইন নষ্ট হলে কিংবা কেউ জানালে সেই লাইন ঠিক করতে গেলে যিনি কল দেন তাকে কলার হিসেবে একটি মিনিমাম সার্ভিস চার্জ ধরা হয়। এর সঙ্গে বিলের কোনও সম্পর্ক নেই।’
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) জানায়, সাধারণত ২৩০ থেকে ৪০০ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ যারা ব্যবহার করে তাদের এলটি গ্রাহক বা নিম্নচাপের গ্রাহক বলা হয়। এ শ্রেণির গ্রাহকের সংখ্যা আবাসিক এলাকায় বেশি। এসব গ্রাহকের ক্ষেত্রে সার্ভিস লাইন, মিটার বোর্ড, ফিউজ মেরামত ও সার্কিট ব্রেকার চালু ইত্যাদি কাজের জন্য সাধারণত পাঁচ শ’ টাকা সার্ভিস চার্জ হিসেবে নেওয়ার নিয়ম আছে। এই টাকা ব্যাংক বা ভেন্ডিং স্টেশনের মাধ্যমে দেওয়ার কথা। অন্যদিকে সার্ভিস ড্রপ বা ক্যাবল মেরামতের ক্ষেত্রে এক ফেজের জন্য ২০০ টাকা আর তিন ফেজের জন্য ৫০০ টাকা ব্যাংক বা ভেন্ডিং স্টেশনের মাধ্যমে দেওয়ার কথা। সার্ভিস তার পরিবর্তন বা চুরি যাওয়া সার্ভিস তার পরিবর্তন (মালামাল ছাড়া) এক ফেজের ক্ষেত্রে এক হাজার টাকা, আর তিন ফেজের ক্ষেত্রে দুই হাজার টাকা নেওয়ার নিয়ম করেছে ডিপিডিসি। এটিও ব্যাংক বা ভেন্ডিং স্টেশনের মাধ্যমে দেওয়ার কথা। সার্ভিস ক্রিমপিট লাগানো (মালামাল ছাড়া) এক ফেজের ক্ষেত্রে ৫০০ টাকা, তিন ফেজের ক্ষেত্রে ৮০০ টাকা এবং এমটি অর্থাৎ যারা ৫০ কিলোওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে তাদের ক্ষেত্রে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত সার্ভিস চার্জ নেওয়া হয়। এদিকে সাধারণ সমস্যার ক্ষেত্রে ৬০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত সার্ভিস চার্জ নেওয়া হয়।
এছাড়া বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকদের মিটার স্থাপনের ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা চার্জ নেওয়ার নিয়ম করেছে ডিপিডিসি। এক্ষেত্রে ৭৫০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হতে পারে। অন্যদিকে প্রিপেইড মিটার ভাড়া বাবদও তারা গ্রাহকের কাছ থেকে ৪০ টাকা থেকে শুরু করে ২৫০ টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকে।
বিদ্যুতের দামের বাইরে বাড়তি অর্থ আদায় করার বিষয়ে বিইআরসি সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা কোনও কোনও ক্ষেত্রে একটা মিনিমাম অর্থ আদায় করার বিধান নির্ধারণ করে দিয়েছি। এর বাইরে কেউ আদায় করতে পারবেন না।’ তবে বিতরণ কোম্পানিগুলো বিইআরসির বেঁধে দেওয়া সীমার বাইরে গিয়ে বেশি অর্থ আদায় করছে বলে অভিযোগ পাওয়ার কথা তিনিও স্বীকার করেন।

 

 

/ওআর/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম