হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ১০০টি পরিবার বিদ্যুৎ পেলেও দ্বন্দ্ব রয়ে গেলো বন বিভাগ এবং পল্লী বিদ্যুতের মধ্যে। স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বলছে, এ বিষয়টিতে বনবিভাগের মামলায় তারা আদালতেই লড়বে। অন্যদিকে বন বিভাগের মনোভাবও একইরকম। কোনোভাবেই সংরক্ষিত বনের মধ্যে দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার পক্ষে নয় তারা। এর ফলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর এই বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে দ্বন্দ্বের সমাধানে বন ও পল্লী বিদ্যুৎ; সরকারের এই দুই দফতর একে অপরকে আদালতই দেখাচ্ছে। অবশ্য আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনীতিকদের উদ্যোগে বন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের কথাও বলছেন পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তারা।
গত ২৬ মে বন বিভাগের করা এক মামলায় হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তাদের আদালতে হাজিরার হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরপরই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ১০০টি পরিবারের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় পল্লী বিদ্যুৎ। এভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি সকলের নজরে আসলে স্থানীয় জেলা প্রশাসন এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি আবার লাইনটি মেরামত করে জুড়ে দেয়।
বিদ্যুৎ সংযোগ জুড়ে দেওয়া হলেও দুই সরকারি দফতরের এই বিভেদ স্থানীয়ভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাধারণত যেখানে সরকারের সব দফতরের কাজই জনগণের সেবা এবং দেশের উন্নয়ন; সেখানে বন বিভাগ এবং পল্লী বিদ্যুতের পাল্টাপাল্টি অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জানা গেছে, বাহুবল উপজেলার পুটিজুড়ি বন বিটের মধুপুর হিল এর সংরক্ষিত বনের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা কালিগজিয়া। সেখানে দুটি টিলায় ৩০০ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পরিবারের বাস। ২০১৮ সালের শেষের দিকে কালিগজিয়ার ১০০ পরিবারকে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয় হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বাহুবল আঞ্চলিক অফিস।
বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় ওই এলাকায় সংযোগ দেওয়া হয়। ২০২০ সালে পুটিজুড়ি বন বিট অফিসও সেই লাইন থেকে একটি সংযোগ নেয়। এর পরের বছর কালিগজিয়া এলাকার ২ নম্বর টিলায় সংযোগ দিতে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি খুঁটি বসানোর কাজ শুরু করলে বাধা দেয় বন বিভাগ। একপর্যায়ে হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বাহুবল আঞ্চলিক অফিসের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. শহীদ উল্লাহর নাম উল্লেখ করে তিন জনের বিরুদ্ধে হবিগঞ্জ বন আদালতে মামলা করেন পুটিজুড়ি বন বিটের তৎকালীন বিট কর্মকর্তা জুয়েল রানা। মামলায় বনের প্রায় সাড়ে ১৬ লাখ টাকা ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়।
বন বিভাগ এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় জেলা প্রশাসন এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে বাহুবলের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মানুষ বিদ্যুৎ পেয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, সংরক্ষিত এই বনাঞ্চলের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে এরা বসবাস করছেন। তাদের আর যাওয়ারও জায়গা নেই। ফলে এখানকার মানুষ কীভাবে সারাদেশের বিদ্যুতের আলোর যাত্রায় যুক্ত হবেন, তাও চিন্তা করতে হবে। এখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করাতে তাদের জীবনের পরিবর্তন এসেছে। এখন আবার তাদের কাছ থেকে আলো কেড়ে নিলে জীবনে সংকট তৈরি হবে।
জানতে চাইলে হবিগঞ্জ পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মোতাহার হোসেন বলেন, এই লাইনটার বিষয়ে বন বিভাগ একটা মামলা করেছে। পরে আমরা জেলা প্রশাসকের সাথে বসে সমস্যার আপাতত সমাধান করে দিয়েছি। ওদের বিদ্যুৎ লাইন দেওয়া হয়েছে। সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক সাধারণ মানুষকে কষ্ট দেওয়ার কোনও মানে হয় না। গরিব মানুষের লাইন আটকে রেখে কোনও লাভ নাই। উনারা বিদ্যুৎ ব্যবহার করুক। দুই বিভাগ (বন ও বিদ্যুৎ বিভাগ) লড়বে।
তিনি বলেন, এই লাইনটি ২০১৭ সালে শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় জেলা প্রশাসকের সহায়তায় দেওয়া হয়েছিল। তারপরও যেহেতু বন বিভাগ মামলা করেছে, সেহেতু আমরা বন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করবো। বাহুবলের এমপি সাহেব এই বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছেন।
এদিকে হবিগঞ্জের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা তৌফিকুর রহমান বলেন, ‘এভাবে সংরক্ষিত এলাকায় বিদ্যুৎ লাইন দেওয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ, আমরা এ কারণেই মামলা করেছিলাম। এখন মামলাটি চলমান। বন বিভাগের এখন কিছু করার নেই। আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবে তাই আমরা মেনে নেবো।’
তিনি বলেন, ‘বাহুবলে বিদ্যুৎ সংযোগ আবার দেওয়া হলো, তো আমাদের একটা চিঠি অন্তত দেওয়া উচিত ছিল; এমন কিছু আমরা পাইনি।’
স্থানীয় বন বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আরইবির কর্মকর্তারা আমাদের সাথে কথা বলেছিল। আমরা বলেছি, এটা আইনগতভাবে হয়নি। এইক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি পেলে সেটা আলাদা বিষয়। ফলে আমাদের হাতে কিছু নেই। মামলা চলমান। বিদ্যুতের লাইন যদি আবার দিয়ে থাকে সেটা আমরা জানি না।’









