২০১০ সালে বিদ্যুতের জন্য যখন চরম হাহাকার, তখন আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন সংযোগও বন্ধ রাখা হয়েছিল। ২০১৪ সালে নতুন আইন জারি করে সরকার। বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে চাহিদা দুই কিলোওয়াটের বেশি হলে মোট চাহিদার ২ ভাগ হারে সৌর প্যানেল স্থাপনের বাধ্যবাধকতা যুক্ত করা হয়। শিল্প সংযোগের ক্ষেত্রে বলা হয়, চাহিদা ৫০ কিলোওয়াটের ওপর বেশি হলে ১০ শতাংশ আসতে হবে সোলার প্যানেল থেকে। মাঝে কিছুদিন ছাড় দেওয়া হলেও এখনও বলবৎ আছে আইনটি। সরকারের উদ্দেশ্য ছিল অন্তত দিনের বেলায় বাড়ির সিঁড়ির বাতি ও লিফট চলবে সোলারে। কিন্তু শুরু থেকেই বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রে সোলার ছিল এক নিদারুণ ‘বাণিজ্যে’র নাম।
যেভাবে হলো ‘বাণিজ্য’
বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার জন্য একটি সোলার প্যানেল বসাতে হবে। এজন্য বাড়ির মালিক তৃতীয় পক্ষকে যুক্ত করতো। এই পক্ষ সোলার প্যানেল বসিয়ে দিয়ে বিতরণ কোম্পানির লোকদের দিয়ে পরিদর্শন করানোর ‘ব্যবস্থা’ও করে দিতো। সংযোগ পাওয়ার পর সেই প্যানেলের খবর রাখতো কোনও পক্ষই।
বাড়ির মালিক তো বটেই, বিতরণ কোম্পানিও ওই প্যানেলের খোঁজ নিতো না। ফলে বেশিরভাগ প্যানেল হয়ে পড়েছে বিকল।
বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল সংযোজন করতেন এমন এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এগুলো যে অকেজো এটা জানা কথা। যারা বিদ্যুৎ সংযোগ দেয় তারাও জানে এগুলো এখন চলে না।
তিনি আরও জানান, কোনও কোনও ক্ষেত্রে এমনও হয়েছে, বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভাড়া নেওয়া হয় প্যানেল। সংযোগ লেগে যাওয়ার পর আবার খুলে নিয়ে আসা হয়েছে। তখন বাড়ির মালিক গিয়ে থানায় জিডি করেছেন ছাদ থেকে প্যানেল চুরি হয়েছে।
জরিপ
বিতরণ কোম্পানি প্যানেলের কোনও খবর রাখেনি— এমন অভিযোগ মানতে নারাজ অনেকে। ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো) গত বছর রাজধানীর টঙ্গি এলাকায় একটি জরিপ করে। সেই জরিপের ফলাফল বলছে টঙ্গি এলাকার ৮০ ভাগ সৌর প্যানেল অকেজো পড়ে রয়েছে।
বিতরণ কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাউসার আমির আলি শুক্রবার (২২ জুলাই) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা এখন (বিকালে) বিদ্যুৎ সাশ্রয় নিয়ে বৈঠক করছি। গ্রাহককে কীভাবে উৎসাহ দেওয়া যায়, কীভাবে সোলার সিস্টেমগুলোকে আবার কার্যকর করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করছি।
সূত্র বলছে, কেবল ঢাকার দুই বিতরণ কোম্পানির এলাকায় ৬২ হাজারের মতো সোলার সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছিল। এখান থেকে মোট ৪২ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ার কথা ছিল।
প্রসঙ্গত ঢাকার দুই বিতরণ কোম্পানির বিদ্যুতের চাহিদা ৩ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি।
গ্রাহক যা বলছেন
খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ার বাসিন্দা কাউসার আলী জানান, তার বাসায় যে সোলার প্যানেল আছে সেটি ডেভেলপার কোম্পানি স্থাপন করেছিল। এই সোলার থেকে এখন প্রায় ৩৫ ওয়াট/ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। যা খুবই সামন্য। এই বিদ্যুৎ সরাসরি মেইন লাইনে যুক্ত করা আছে।
মগবাজারের আরেক বাসিন্দা আবু বকর জানান, বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য তিনি সোলার প্যানেল স্থাপন করেছিলেন। এটি দিয়ে তার সিঁড়ির লাইট জ্বলতো। এখন নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। এরপর আর তা মেরামত করা হয়নি।
সৌর প্যানেল স্থাপন স্থাপনের পর সেটাকে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। এর জন্য চাই অভিজ্ঞ কর্মী। দরকার প্রশিক্ষণ। যেহেতু গ্রাহক এটি কোনও ধারণা ছাড়াই স্থাপন করেছে তাই আপাতত এটাকে অপচয়ই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা বললেন
স্রেডার সাবেক চেয়ারম্যান মো. আলাউদ্দিন বলেন, শুধু বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য বাধ্য হয়ে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হলে বাড়ির মালিক এটির ব্যবহারে আগ্রহ পাবেন না এটাই স্বাভাবিক। যদি স্থাপনের সময় গ্রাহকদেরকে এর সুবিধা সম্পর্কে জানানো যেতো এবং মাঝে মাঝে নজরদারি করা হতো, তবে আগ্রহের জায়গা তৈরি হতো।
তিনি আরও বলেন, আবাসিকের এই রুফটপ সোলারের চেয়ে নেট মিটারিং পদ্ধতি ভালো। এতে গ্রাহক তার লাভটা সরাসরি দেখতে পায়।
প্রসঙ্গত, নেট মিটারিং পদ্ধতি হলো গ্রাহক নিজের আঙ্গিনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা ব্যবহারের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবে। পরে ওই বিদ্যুতের বিনিময়ে তার বিদ্যুৎ বিল সমন্বয় হবে। ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ বিশ্বের অনেক দেশে এই পদ্ধতি চালু আছে।









