দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত গভীর আর্থিক ও কাঠামোগত সংকটে রয়েছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক নেতারা। অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ, আমদানিনির্ভরতা, ডলার সংকট, ভর্তুকির চাপ এবং দুর্বল সুশাসনের কারণে খাতটি টেকসই নয় বলে মত দেন তারা। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার পরিবর্তন হলেও জাতীয় ঐকমত্য, কাঠামোগত সংস্কার ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার ওপর জোর দেন বক্তারা।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আগামী সরকারের জন্য টেকসই পথনির্দেশনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলা হয়। ইংরেজি অনলাইন ‘জাস্ট এনার্জি নিউজ’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ‘বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিলের’ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জাস্ট এনার্জি নিউজের সম্পাদক শামীম জাহাঙ্গীর।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘‘প্রাইমারি এনার্জিতে দীর্ঘদিনের অবহেলার ফলেই আজকের সংকট তৈরি হয়েছে। গ্যাস অনুসন্ধান প্রায় স্থবির থাকলেও বিদ্যুৎ খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।’’ তিনি বলেন, ‘‘নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিবর্তে বিদ্যমান সম্পদের দক্ষ ব্যবহার এবং দেশীয় জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।’’
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন। তিনি বলেন, ‘‘দেশের জ্বালানির প্রায় ৯৭ শতাংশ ফসিল ফুয়েলনির্ভর এবং বর্তমানে জ্বালানি ও বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানিনির্ভর। গ্যাস খাতে সিস্টেম লসের নামে বাস্তবে বড় অঙ্কের চুরি ও অপচয় হচ্ছে, যা এখন সরাসরি আমদানিকৃত এলএনজির ক্ষতির সমান।’’
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘‘বিদ্যুৎ খাতে নীতিগত ভুল ও অস্বচ্ছ চুক্তির কারণে আজ জনগণ বড় আর্থিক বোঝা বহন করছে।’’ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল বাতিল করে ওয়ান-টু-ওয়ান নেগোশিয়েশনের মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্র দেওয়া দুর্নীতির পথ খুলে দিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও আইইউবির উপাচার্য অধ্যাপক এম. তামিম বলেন, ‘‘নিজস্ব গ্যাস ছাড়া সুলভ বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব নয়। তবে বিদ্যমান চুক্তি যাচাই না করে হঠাৎ বাতিল করলে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’’
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম. শামসুল আলম বলেন, ‘‘বছরের পর বছর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অনিয়ম চলায় বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ভেঙে পড়েছে।’’ তিনি বলেন, ‘‘নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় খাতে জবাবদিহিতা নেই।’’ সেক্টর সংস্কারে অপ্রিয় সত্য সামনে আনা ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর তিনি জোর দেন।
অর্থনীতিবিদ মুশতাক হোসাইন খান বলেন, ‘‘বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি।’’ দুর্নীতি বন্ধ না হলে কোনও নীতিগত সংস্কার কার্যকর হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিলের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. রফিকুল ইসলাম, জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির আহ্বায়ক সাবেক বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী মহাসচিব আহসানুল মাহবুব জুবায়ের, আইএমইডির সাবেক সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়জুল্লাহ, বিইআরসির সাবেক সদস্য মো. মিজানুর রহমান, চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম. জাকির হোসেন খানসহ আরও অনেকে।









