রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে একদিন পর আবারও তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। শুক্রবার পাম্পগুলোতে গ্যাসের প্রেসার কিছুটা ভালো থাকলেও শনিবার (২৯ আগস্ট) সকাল থেকে তা আবার কমে যায়। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সিএনজিচালিত পরিবহনের চালকেরা। সকাল থেকে দিনের বেশির ভাগ সময়ই ফিলিং স্টেশনের সামনে দীর্ঘ লাইনে কাটছে তাদের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর মিলছে ৪০-৫০ টাকার গ্যাস।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শনিবার একটি সিএনজিতে ৪০-৫০ টাকার বেশি গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। প্রাইভেটকারে সর্বোচ্চ ১২০ টাকার গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। যেখানে গতকাল শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ১৫০ টাকা পর্যন্ত গ্যাস পেয়েছেন সিএনজি অটোরিকশার চালকরা। আর প্রাইভেটকারের চালকরা ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত গ্যাস নিতে পেরেছেন।
চালকদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে আকারভেদে সিএনজি-চালিত অটোরিকশায় ৬০০ টাকা পর্যন্ত গ্যাস নেওয়া যায়। আর ৬০ লিটারের সিলিন্ডার থাকা প্রাইভেটকারে প্রায় ৬০০ টাকার গ্যাস এবং ৯০ লিটারের সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত গ্যাস নেওয়া যায়।
এদিকে এমনিতে গ্যাসের প্রেসার কম, তার ওপর বিদ্যুৎ চলে গেলে গ্যাস সরবরাহও বন্ধ থাকে। দিনে বেশ কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যায়। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে তা আসতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। বিদ্যুৎ আসার পর মেশিন চালিয়ে গ্যাসের প্রেসার স্বাভাবিক হতে আরও আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। ফলে গ্যাস নিতে গিয়ে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়ছেন চালকেরা।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
মিরপুরে দীর্ঘ লাইন
গাবতলী, কল্যাণপুর, কালশী, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া এলাকার সিএনজি স্টেশনগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস ও অটোরিকশাকে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।
গাবতলীর মোহনা ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষমাণ প্রাইভেটকার চালক খলিল বলেন, গ্যাস সংকট আরও বেড়েছে। গভীর রাতে সামান্য পাওয়া গেলেও দিনে পাওয়া যাচ্ছে না। দেড় ঘণ্টার মতো লাইনে দাঁড়িয়ে যে গ্যাস পেয়েছি, তা দিয়ে মাত্র দুটি ট্রিপ দিতে পেরেছি। এখন আবার লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের দুঃখ দেখার কেউ নেই।
ডেমরায় দুই ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা
ডেমরা এলাকাতেও একই অবস্থা। সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের জন্য দুই ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করতে হচ্ছে পরিবহন চালকদের। প্রতিটি স্টেশনের সামনে গাড়ির দীর্ঘ লাইন। যাত্রী টানতে না পারায় রুজি-রোজগার ও পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বেশির ভাগ চালক। গ্যাস বিক্রি কম হওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে ফিলিং স্টেশন মালিকদেরও।
রাসেল ফিলিং অ্যান্ড সিএনজি স্টেশনে রেন্ট-এ-কার চালক মো. বশির হাওলাদার বলেন, ঠিকমতো গ্যাস না পাওয়ায় প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে। দূরপাল্লার যাত্রী নিতে পারছি না। যাত্রী গাড়িতে রেখে এখন আর গ্যাস নেওয়া যায় না। কারণ ২-৩ ঘণ্টা লাইনে থাকতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের পরিবারের সবাইকে না খেয়ে মরতে হবে।
সবুজবাগে চাপ সর্বনিম্ন
মুগদা, মানিকনগর, সবুজবাগ, খিলগাঁও, বনশ্রী ও হাজীপাড়া এলাকায় অন্যদিনের তুলনায় বেশি গ্যাস সংকট দেখা গেছে। গ্যাসের চাপ সর্বনিম্ন থাকায় বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সিএনজিচালিত যানবাহনের চালকেরা। অনেক ফিলিং স্টেশনে ‘গ্যাস নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখতেও দেখা গেছে।
শান্ত ফিলিং স্টেশনে লাইনে থাকা চালক কবির হোসেন বলেন, সকাল ৯টায় লাইনে দাঁড়িয়েছি, এখন দুপুর ২টা। কিন্তু সিরিয়াল পাইনি। দিন যত যাচ্ছে গ্যাসের সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। গ্যাস না পেলেও মালিককে প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ টাকা জমা দিতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে কী করব বুঝতে পারছি না।
উত্তরায় সরবরাহ বন্ধ, কোথাও দীর্ঘ লাইন
উত্তরায় গ্যাস সংকট ছিল তীব্র। গ্যাসের অভাবে অধিকাংশ সিএনজি ফিলিং স্টেশনে সরবরাহ বন্ধ ছিল। যেসব স্টেশন চালু রাখা হয়েছিল, চাপ কম থাকায় সেগুলোতে পরিবহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়।
খন্দকার ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার কামাল আহমেদ বলেন, পরিবহনের বড় একটি অংশ গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে গ্যাসের চাপ কম থাকায় পরিবহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে আমাদের কিছুই করার নেই।
সিএনজিচালক জসিম বলেন, রাত থেকে লাইনে আছি, এখনো গ্যাস পাইনি। এভাবে চলতে থাকলে সংসার চালাব কীভাবে। সামনে বাচ্চাদের স্কুলের বেতন দেব কীভাবে। এত মানসিক চাপ আর নিতে পারছি না।
বাসাবাড়িতেও গ্যাস সংকট
শুধু সিএনজি ফিলিং স্টেশন নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়িতেও গ্যাস সংকট চরমে। গ্যাস না থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বলছে না চুলা। বাধ্য হয়ে অধিকাংশ পরিবার সিলিন্ডার ও বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করছে। বিকল্প হিসেবে অনেকে হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
এ ছাড়া দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পথে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যও স্থবির হয়ে পড়ছে।
উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা জাহানারা বেগম বলেন, ভোরে গ্যাস থাকলে সারা দিনের রান্না করে রাখা যায়। কিন্তু গত তিন দিন ধরে গ্যাস নেই বললেই চলে। বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে।
বনশ্রী এলাকার গৃহিণী চম্পা খাতুন বলেন, সকাল থেকে বাসায় কোনো গ্যাস নেই। বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করতে হয়েছে। এখন তো বিদ্যুৎই আমাদের ভরসা হয়ে গেছে। আবার কারেন্ট চলে গেলে বসে থাকতে হয়। আমরা সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছি।
ডেমরার গৃহিণী আফরোজা বেগম বলেন, গ্যাস তো আজ অনেক দিন নেই। আমরা বৈদ্যুতিক চুলাতেই রান্না করছি। বিদ্যুৎ চলে গেলে সেই রান্নাও বন্ধ। গ্যাসের সমস্যা সমাধানে সরকার কোনো পদক্ষেপই নিচ্ছে না। আমাদের এলাকায় অনেক বাসাবাড়িতেই গ্যাস নেই।
বাড্ডার গৃহিণী শায়লা বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ; দুটোরই সমস্যা। আমরা খুবই সমস্যার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাসাবাড়ির গ্যাস সংকটে রাজধানীর হাজার হাজার পরিবার এখন বিকল্প উপায়ে রান্না করছে। ইনডাকশন চুলা ও রাইস কুকারের দামও বেড়ে গেছে।









