জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি: মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা

ইমরান আলী
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:৫১ আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৩৯

একদিকে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, তার ওপর বাড়ানো হলো জ্বালানি তেলের দাম। এতে জনগণের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম হয়েছে। হঠাৎ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘটনায় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, এমনিতেই নিত্যপ্রয়োজনীয়সহ সব পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এর ওপর তেলের দাম বাড়ায় এখন আরও বাড়বে পণ্যের দাম। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় ছাড়া কোনও বিকল্প ছিল না।

রাজধানীর বনশ্রীর বাসিন্দা হাফিজুর রহমান গুলশানের একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা এমন একটি বিষয়, যার সঙ্গে সবার সংযোগ রয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি মানে সবজি থেকে শুরু করে সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়বে। খাবারের দাম বাড়বে, চালের দাম বাড়বে, মাছের দাম বাড়বে; এ রকম সব পণ্যের দাম বাড়বে। আপনি বাসা থেকে বের হবেন, রাস্তায়ও বেশি টাকা লাগবে।’

তিনি বলেন, ‘কিছু দিন আগেই বাড়ানো হয়েছে তেলের দাম। দাম বাড়ানোয় ভয়াবহ সংকট তৈরি করা হয়। তেল নিতে সাধারণ মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট হয়েছে। এরপর বাড়ানো হলো তেলের দাম। আর এখন চলছে গ্যাসের সংকট। সিএনজি স্টেশনে গ্যাস নাই, গ্যাস নাই বাসাবাড়িতেও। এমন অবস্থায় মানুষের স্বস্তি নেই। সবকিছুর পণ্যের বাড়তি মূল্য। মানুষ চেষ্টা করছে কোনোমতে বাঁচার। এরপর সব জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হলো।’

হাফিজুর রহমান বলেন, ‘সামনে বোরো মৌসুম আসছে। সেচের দাম বাড়বে, তাহলে ধানের দাম বাড়বে। এভাবে প্রতিটি সেক্টরে এর প্রভাব পড়বে।’

এ বিষয়ে কথা হয় ইঞ্জিনিয়ার ফজলুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এই প্রভাব বড়লোক থেকে শুরু করে সব শ্রেণির মানুষের ওপর পড়বে। এখানে ছোট লোক, বড় লোক নেই। এমনিতেই মানুষের ত্রাহি অবস্থা। সেখানে যদি এভাবে তেলের দাম বাড়ে, মানুষ কী করবে। গত দেড়-দুই বছর মানুষ অনেক ভোগান্তির মধ্যে রয়েছে। এই ভোগান্তি বাড়া ছাড়া উপায় নেই।’

ফজলুর রহমান আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এর প্রভাবে কিছুটা সচ্ছল মানুষ, যারা পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকেন, এখন তারা ঢাকাতেও থাকতে পারবেন না। পরিবার বাড়ি পাঠিয়ে নিজেকে মেসে থেকে জীবনযাপন করতে হবে, সেই সময় আসছে।

গাড়িতে রিফিল করা হচ্ছে জ্বালানি তেল। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

এদিকে তেলের দাম বাড়ানোর ফলে উবার-পাঠাও চালকরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, গতবার তেলের দাম বাড়ার ফলে বাসভাড়া যেভাবে বেড়েছিল, উবার-পাঠাওয়ের ভাড়া সেভাবে বাড়েনি। কষ্ট করে সবাই মেনে নিয়েই চলছেন। কিন্তু এবার ভাড়া না বাড়িয়ে উপায় থাকবে না।

সাদেক হোসেন নামের পাঠাও-উবার বাইক চালক বলেন, ‘বনশ্রী থেকে গুলশান ১ বা ২ যেতে আগে দেড়শত, কোনও কোনও সময় ২০০ টাকায় নিয়ে যাওয়া যেত। কিন্তু এখন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে যেতে হবে। তাছাড়া কোনও উপায় থাকবে না।’

তিনি বলেন, তার বাইকটি পালসার। এক লিটার অকটেন বা পেট্রোলে সর্বোচ্চ ৪০ কিলোমিটার যায়। এখন এক লিটারের দাম ১৬৫ টাকা। ‘সেই হিসেবে আমি যদি ভাড়া না বাড়িয়ে রাইড শেয়ার করি, তাহলে আমি চলবো কী করে’- বলেন তিনি।

সাদেক হোসেন আশঙ্কা করেন, আগে যে মানুষ বাইকে রাইড শেয়ারিংয়ে চলতেন, তিনি আর হয়তো নাও চলতে পারেন। কারণ ভাড়া বেশি হলে তারও খরচ বাড়বে। তিনি খরচ বাঁচাতে চাইবেন। এমন অবস্থায় তাদের মতো রাইড শেয়ারিং চালকরাও বড় বিপদে পড়তে পারেন।

সাইফুল ইসলাম নামের আরেক রাইড শেয়ারিং চালক বলেন, ‘এবারের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো তো আমাদের ওপর একেবারে পেরেক ঠুকে মারার মতো। এমনিতেই আমাদের অবস্থা তত ভালো না, তার ওপর এভাবে দাম বাড়লে আমরা কীভাবে রাইড শেয়ারিং করবো।’

জ্বালানি তেল নেওয়ার অপেক্ষায় বাইকাররা। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

রেন্ট-এ-কার চালক সোহেল রানা বলেন, ‘এখন চলছে গ্যাস সংকট। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে দুই-তিনশত টাকার গ্যাস পাই। তেলের ওপর অনেক সময় নির্ভরশীল হতে হয়। এখন তেলের দাম যেভাবে বাড়লো, তাতে আমরাও কীভাবে চলবো, এমন দুশ্চিন্তায় রয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের এমন কাস্টমার রয়েছে, যারা ছুটি পেলে নানা জায়গায় বেড়াতে যায়। কিন্তু এভাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে তারাও চিন্তা করবে বাইরে যাবে কিনা। তারা যদি যায়ও, তবে সাশ্রয়ী অন্য উপায়ে যাওয়ার চিন্তা করবে।’

কেউ কেউ বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় জীবনযাপনে বড় প্রভাব পড়বে। সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়বে। রাস্তায় চলাচলের ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে। সব মিলিয়ে মানুষের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর বড় চাপ আসবে। এই চাপ কীভাবে সামলাবে, তা নিয়েই দুশ্চিন্তা তাদের। মূল্য বাড়ানোর আগে সাধারণ মানুষের এসব দিক বিবেচনা করা সরকারের উচিত বলেও উল্লেখ করেছেন কেউ কেউ।

আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং বিপিসির বড় অঙ্কের লোকসানের কথা উল্লেখ করে দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে নতুন এই মূল্য নির্ধারণের কথা জানানো হয়। নতুন দাম আজ সোমবার রাত ১২টা থেকে কার্যকর হবে।

নতুন দাম অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। কেরোসিনের দাম প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫৫ টাকা করা হয়েছে। পেট্রলের নতুন দাম প্রতি লিটার ১৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬০ টাকা করা হয়েছে। অকটেনের দাম প্রতি লিটার ১৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

জ্বালানি বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে গত মার্চ মাস থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্য ও ফ্রেইট বা জাহাজ ভাড়া উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এখনও অব্যাহত রয়েছে।

এর আগে গত ১৮ এপ্রিল সরকার ডিজেলের মূল্য লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করেছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা সত্ত্বেও গত পাঁচ মাস দেশে তেলের মূল্য অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেলেও জনস্বার্থে এতদিন দেশে দাম বাড়ানো হয়নি। এর ফলে গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।

তাছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মূল্য এখনও অনেক কম রয়েছে বলেও জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

‘সমন্বয় করা ছাড়া কোনও বিকল্প ছিল না’

এদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে তেলের দাম সমন্বয় করেছে সরকার। একইসঙ্গে দাম বাড়ানোর কারণে জনগণের যে কষ্ট হবে, তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে অব্যাহতভাবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সংকট প্রতিদিন নতুন মাত্রায় আমাদের সামনে আবির্ভূত হচ্ছে। এর ফলে বিমার প্রিমিয়াম ও জাহাজ ভাড়া বাড়ছে। এ অবস্থায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকারের পক্ষে এ মুহূর্তে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া কোনও বিকল্প ছিল না। আমরা বারবারই বলেছিলাম যে উপায়হীন না হলে এই অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তটি সরকার নিতে চাইবে না, কিংবা নেবে না।

এ রকম একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত কঠিন উল্লেখ করে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘জনগণের জীবনমানের কষ্ট লাঘবের অভিপ্রায়ে রাজনীতিতে এসেছি। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে জনগণের যে কষ্ট হবে, এটি আমি উপলব্ধি করি। সেই কারণে জনগণের কাছে আন্তরিকভাবে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। চলমান সংকট দ্রুত কেটে যাবে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জ্বালানি তেলের দাম আবারও সমন্বয় করে আগের পর্যায়ে বা তার চেয়েও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।’

/ইউএস/এমওএফ/
সম্পর্কিত
জাতীয় গ্রিডের পাইপলাইন ছিদ্র করে ৪২৯২ লিটার তেল চুরি, মাটির নিচে গোপন ট্যাংক
জাতীয় গ্রিডে সৌরবিদ্যুতের অবদান ৪ শতাংশ: দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর কতটা
যুদ্ধের কারণে দেশে জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না: বিদ্যুৎমন্ত্রী
সর্বশেষ খবর
রাজধানীতে হঠাৎ থানার সাম‌নে দুই কক‌টেল বি‌স্ফোরণ 
রাজধানীতে হঠাৎ থানার সাম‌নে দুই কক‌টেল বি‌স্ফোরণ 
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে বিএনপির শোভাযাত্রা, নেতৃত্ব দেবেন প্রধানমন্ত্রী
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে বিএনপির শোভাযাত্রা, নেতৃত্ব দেবেন প্রধানমন্ত্রী
স্বর্গের লোভ দেখিয়ে শিশুদের অনাহারে হত্যা, কেনিয়ার ধর্মগুরুর ২০০ বছরের সাজা
স্বর্গের লোভ দেখিয়ে শিশুদের অনাহারে হত্যা, কেনিয়ার ধর্মগুরুর ২০০ বছরের সাজা
মসজিদে জুমার খোতবার সময় হামলায় বিএনপি নেতা নিহত
মসজিদে জুমার খোতবার সময় হামলায় বিএনপি নেতা নিহত
সর্বাধিক পঠিত
সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় সংসার চলে যাদের, তাদের জন্য সুখবর নাকি দুঃসংবাদ?
সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় সংসার চলে যাদের, তাদের জন্য সুখবর নাকি দুঃসংবাদ?
প্রথমদিন সেন্টমার্টিনে ৮৩৭ পর্যটক, যেতে খরচ লাগে কত
প্রথমদিন সেন্টমার্টিনে ৮৩৭ পর্যটক, যেতে খরচ লাগে কত
গাজীপুর সাফারি পার্কে জন্ম নিয়েছে নীলগাইয়ের চার শাবক
গাজীপুর সাফারি পার্কে জন্ম নিয়েছে নীলগাইয়ের চার শাবক
প্রতিদ্বন্দ্বী নাকি সহকর্মী, একসঙ্গে কয়টি সিনেমা করেছেন মৌসুমী-শাবনূর
প্রতিদ্বন্দ্বী নাকি সহকর্মী, একসঙ্গে কয়টি সিনেমা করেছেন মৌসুমী-শাবনূর
কেন ভারতের এই গ্রামটিকে বলা হয় ‘মিলিয়নিয়ার ভিলেজ’
কেন ভারতের এই গ্রামটিকে বলা হয় ‘মিলিয়নিয়ার ভিলেজ’