চলমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে বাড়তি দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করছে সরকার। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক কোটেশন সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় স্পট মার্কেটে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) সর্বোচ্চ ২৯ দশমিক ৭৯৫ মার্কিন ডলার দরে এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অথচ গত বছরের ডিসেম্বরে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি সাড়ে ১০ ডলারের নিচে কেনা হয়েছিল। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে দাম প্রায় তিন গুণ হয়েছে।
এমন উচ্চ দামে এলএনজি আমদানি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলমান জ্বালানি সংকট কাটাতে আপাতত দামের বিষয়টি নিয়ে বেশি ভাবার সুযোগ নেই। তাদের মতে, সারা বিশ্বেই এখন জ্বালানি সংকট বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সামনে জ্বালানি পাওয়া আরও কঠিন হয়ে যাবে। তাই আগে সংকট কাটাতে হবে, এরপর দাম নিয়ে ভাবা যাবে।
সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এরই মধ্যে বেশি দামে এলএনজি কেনার অনুমোদন দিয়েছে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিটির ২০২৬ সালের ৪৪তম সভায় পাঁচ কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে দুই কার্গো আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ৯ থেকে ১০ অক্টোবর ২০২৬ সময়ের জন্য ৫২তম কার্গো, ১২ থেকে ১৩ অক্টোবরের জন্য ৫৩তম কার্গো, ১৪ থেকে ১৫ অক্টোবরের জন্য ৫৪তম কার্গো, ১৫ থেকে ১৬ অক্টোবরের জন্য ৫৫তম কার্গো এবং ২৭ থেকে ২৮ অক্টোবরের জন্য ৫৬তম কার্গো এলএনজি কেনা হবে।
এর মধ্যে ৫২তম কার্গোর জন্য টোটালএনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড, যুক্তরাজ্যকে সুপারিশকৃত দরদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কার্গোর একক দরপ্রতি এমএমবিটিইউ ২৮ দশমিক ৯৫ মার্কিন ডলার।
৫৬তম কার্গোর জন্য ভিটাল এশিয়া পিটিই লিমিটেড, সিঙ্গাপুরকে সুপারিশ করা হয়েছে। এ কার্গোর একক দরপ্রতি এমএমবিটিইউ ২৯ দশমিক ৭৯৫ মার্কিন ডলার।
এছাড়া সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় দুই কার্গো এলএনজি কেনার জন্য ডারাব ইনকরপোরেটেড, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব সভায় অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়। এ প্রস্তাবে একক দর নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি এমএমবিটিইউ ১৭ মার্কিন ডলার। প্রতিষ্ঠানটিকে সুপারিশকৃত দরদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, মাইন্ড মিঙ্গল এলএলসি, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় আরও দুই কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে একক দরপ্রতি এমএমবিটিইউ ১৯ মার্কিন ডলার। মাইন্ড মিঙ্গল এলএলসিকেও সুপারিশকৃত দরদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন এত বেশি দামে এলএনজি
কাতারে ইরানি হামলার পর থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ রাখতে ফোর্স মেজর ঘোষণা করায় বিপাকে পড়েছে পেট্রোবাংলা। এজন্য এলএনজি আমদানির বহুমুখী ক্ষেত্র খোঁজা হচ্ছে। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তিতে দেশটি থেকে বছরে অন্তত এক বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানির বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেন, ‘এই মুহূর্তে শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক সংকট চলছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে অনেক দেশ নিজেদের থাকা মজুত দিয়ে প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দিলেও এখন সবার মজুত ফুরিয়ে আসছে। ফলে তারাও এখন বাজার থেকে জ্বালানি কিনতে শুরু করেছে।’
তিনি বলেন, ‘কাতার এলএনজি সরবরাহ শুধু বন্ধ করেছে তা নয়, তারা কিছু জ্বালানি উল্টো আমদানিও করছে। ফলে সব বড় বড় দেশ যখন জ্বালানি কিনতে শুরু করে, তখন দাম বৃদ্ধি খুব স্বাভাবিক। এই অবস্থায় দরদাম যাচাই-বাছাই করে এলএনজি কিনতে হবে, এটা যেমন ঠিক, তেমনি না কিনেও তো সরকারের উপায় নেই। সংকট কাটাতে হলে বিকল্প তো কিছু নেই সরকারের হাতে।’
গানভরের এলএনজির দাম নিয়েও প্রশ্ন
বর্তমানে বাংলাদেশে থাকা দুটি এলএনজি টার্মিনালের একটি পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এক্সিলারেট, অন্যটি বাংলাদেশের কোম্পানি সামিট। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি কোম্পানি গানভর থেকে প্রথমবার বাংলাদেশে এলএনজি কার্গো এসেছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হলেও মূলত এর দাম নির্ধারণ হবে স্পট মার্কেটের আদলে। অর্থাৎ, যখন যে দামে এলএনজি বিক্রি হবে, বাংলাদেশকে সেই দামই পরিশোধ করতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, গানভর শুধু গ্যাসের ট্রেডিং কোম্পানি নয়। যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাস উৎপাদন সম্পদেও তাদের মালিকানা বা বিনিয়োগ রয়েছে। তবে গানভরের সঙ্গে এক্সিলারেট এনার্জিও বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ করছে।
আর এক্সিলারেট কেবল এলএনজি ট্রেডিং করে। অর্থাৎ উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে কিনে ভোক্তার কাছে বিক্রি করে। বাংলাদেশ কাতারের যে খনি থেকে এলএনজি কেনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেছে, সেই একই খনি থেকে এক্সিলারেট এলএনজি কিনে পেট্রোবাংলার কাছে বিক্রি করে।
যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির এলএনজি আসার পর প্রশ্ন উঠেছে, আন্তর্জাতিক বাজার দরেই কি এই এলএনজি কিনছে বাংলাদেশ, নাকি বাজার দরের চেয়ে বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, বাংলাদেশের সঙ্গে কাতার ও ওমানের যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে, সেখানকার দামের তুলনায় গানভরের এলএনজির দাম অনেকটাই বেশি।
গানভরের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত ১১৭ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হবে। চুক্তির আওতায় ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের ১৪টি কার্গোর দাম নির্ধারিত হয়েছে এশিয়ার জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) সূচকের সঙ্গে প্রতি এমএমবিটিইউতে শূন্য দশমিক শূন্য ৮৭৫ ডলার যোগ করে।
এশিয়ার স্পট এলএনজি বাজারের গুরুত্বপূর্ণ মূল্যসূচকগুলোর একটি জাপান-কোরিয়া মার্কার। এরপর ২০২৯ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত সরবরাহের ক্ষেত্রে দাম হবে হেনরি হাবের ১২১ শতাংশের সঙ্গে ৫ দশমিক ২০ ডলার যোগ করে। যুক্তরাষ্ট্রের হেনরি হাব প্রাকৃতিক গ্যাসের আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত একটি মূল্যসূচক।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর জেকেএম মার্কারে ২৭ দশমিক ৫১ ডলার/এমএমবিটিইউ এলএনজি বিক্রি হয়েছে। এর সঙ্গে শূন্য দশমিক শূন্য ৮৭৫ ডলার যোগ করে গানভরকে মূল্য পরিশোধ করতে হবে।
কাতার-ওমানের চুক্তিতে দাম কত
বাংলাদেশের প্রথম দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহকারী কাতার এনার্জি বর্তমানে বছরে ১৮-২৫ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ করতো। প্রতি এমএমবিটিইউর দাম ১০ দশমিক ১১৪ ডলার।
দ্বিতীয় দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারী ওমানের ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড ২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ করছে। ১০ বছরের চুক্তিতে বছরে ১০-১৫ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ করছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতি এমএমবিটিইউর দাম ৯ দশমিক ৪৪৪ ডলার। চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৮ সালে।
ভারত থেকে ডিজেল আমদানি
এদিকে ভারত থেকে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে সবশেষ গত ১৩ সেপ্টেম্বর প্রায় ৪ হাজার মেট্রিক টন বা ৪৭ লাখ লিটার ডিজেল দিনাজপুরের পার্বতীপুর রিসিভিং টার্মিনাল ডিপোতে আসে। এটি পাইপলাইনের ৭২তম চালান।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেডের (এনআরএল) মধ্যে ১৫ বছরের ডিজেল আমদানির চুক্তি হয় ২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর। ২০২৬ সালে ওই চুক্তির আওতায় ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম ওঠানামা করতে পারে বলে জানানো হয়।









