ভর্তুকিতে বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো: তারপরও কর্মীদের ‘প্রফিট বোনাস’ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন

সঞ্চিতা সীতু
২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০০ আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০০

বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় মেটাতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। অথচ সরকারি সেই সহায়তা কোম্পানির হিসাবে কীভাবে বিবেচনা করা হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। সরকারের দেওয়া অর্থ কোম্পানির দায় হিসেবে গণনায় না ধরায় মুনাফা দেখানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এমনকি মুনাফার অর্থ প্রফিট বোনাস হিসেবে দেখানো হচ্ছে। যদিও বিদ্যুৎ বিভাগ এই বোনাস না দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে বিদ্যুৎ বিভাগের এক চিঠিতে এই বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এখন বিদ্যুৎ বিভাগ যদি নতুন করে নির্দেশনা জারি না করে, তাহলে সংশোধিত শ্রম আইনে মুনাফা দিতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে লভ্যাংশ বণ্টন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু শ্রম আইনের সংশোধনী পাস হওয়ায় এখন আটকে রাখা মুনাফা দিতে হবে। এতে করে সরকারের প্রতি বছর অন্তত ৩০০ কোটি টাকা লোকসান হতে পারে।

বর্তমানে পিডিবি পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করছে গড়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সায়। বিপরীতে উৎপাদন ব্যয় ১২ টাকা ৯১ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি ইউনিটে ঘাটতি ৪ টাকা ৫২ পয়সা, যা সরকারকে ভর্তুকির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। এই হিসাবে বিদ্যুৎ খাতে বছরে ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি সহায়তায় পরিচালিত কোম্পানিগুলোর মুনাফা নির্ধারণে ভর্তুকির হিসাব যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

বিদ্যুৎ বিভাগের ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিলের একটি আদেশে বলা হয়, বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিপিসিএল) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মুনাফা বণ্টনের বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। সরকার থেকে পাওয়া অর্থ কোম্পানিগুলো লোকসানের দায় হিসেবে নিচ্ছে না। বরং তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মুনাফা পাচ্ছেন। এর আগে গত বছরের ১৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়। সভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কোম্পানিগুলোর হিসাব নির্ধারণে সরকারি সহায়তা বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।

এরপর চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি বিদ্যুৎ বিভাগ আরেকটি আদেশে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকারি ভর্তুকিতে পরিচালিত বিদ্যুৎ বিভাগের আওতায় সরকারি মালিকানাধীন এবং সরকার-টু-সরকার (জি টু জি) যৌথ অংশীদারত্বে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোকে ভর্তুকি চলাকালে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লভ্যাংশ বণ্টন না করার নির্দেশনা দেয়। ফ্যাসিলিটি অ্যাগ্রিমেন্টের আওতায় নেওয়া বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের আগেও লভ্যাংশ বণ্টন না করার কথা বলা হয়। যদিও বিদ্যুৎ খাতের অনেক কোম্পানিই এই নির্দেশ মানছে না।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকার প্রফিট বোনাস না দেওয়ার বিষয়ে কঠোর হলেও শ্রম আইনের সংশোধনীতে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত না করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়। বর্তমান সরকারের আমলে গত ১০ এপ্রিল অধ্যাদেশটি সংসদে পাস করা হয়। কিন্তু শ্রম আইনে মুনাফা বণ্টনের ব্যবস্থা থাকায় বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত হারে মুনাফার ৫ শতাংশ ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডসহ সংশ্লিষ্ট তহবিলে জমা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রফিট পাওয়ার কথা।

জানা যায়, বিদ্যুৎ খাতের পাঁচটি সরকারি কোম্পানি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রায় ৯৬ কোটি টাকা মুনাফা বিতরণ করেছে। এর মধ্যে নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি দিয়েছে প্রায় ৩৭ কোটি টাকা, আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি ২৬ কোটি ৮১ লাখ, ইলেক্ট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ ১৬ কোটি ৭৭ লাখ, রুরাল পাওয়ার কোম্পানি ৯ কোটি ৮৪ লাখ এবং বি-আর পাওয়ারজেন ৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা। তবে এর বাইরেও সরকারের গ্যাস কোম্পানি এবং যৌথ উদ্যোগের কোম্পানি রয়েছে। যৌথ উদ্যোগের কোম্পানিগুলোর মুনাফা এখনও বণ্টন করা হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারের অধীনের এসব সেবা-প্রতিষ্ঠান লাভ-লোকসানের হিসাবে কেন পড়বে। তারা তো জনগণের সেবা দেওয়ার কথা। কোম্পানিগুলো বেশি দামে কিনে কম দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করে লোকসান দিচ্ছে বলে সরকার ওদের ভর্তুকি দিচ্ছে। অন্যদিকে তারা কোম্পানি হিসেবে প্রফিট বোনাস দিচ্ছে। একটা প্রতিষ্ঠান যদি প্রফিটই করে তাহলে সরকার কেন তাকে ভর্তুকি সরকার। এটা এক ধরনের লুণ্ঠন। সরকার এই লুণ্ঠনে সহযোগিতা করছে ভর্তুকি দিয়ে। আর সেই দায় চাপছে জনগণের ঘাড়ে।’

তিনি বলেন, ‘এটি রাষ্ট্রের ক্ষমতার অপব্যবহার। অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রতিবাদের পর প্রফিট বোনাস দেওয়া বন্ধ হয়েছে। যেমন মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিংয়ে এখন আর প্রফিট বোনাস দেওয়া হয় না।’ এসব লুণ্ঠন বন্ধ করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, ‘এটা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া দরকার। ওরা বলছে, ওরা লোকসান করছে, তাই তাদের ভর্তুকি দিতে হবে। আবার তারাই কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রফিট বোনাস দিচ্ছে। একটার সঙ্গে আরেকটার সমন্বয় নেই। আমাদের (জনগণের) টাকায় ভর্তুকি দিচ্ছে, আবার আমাদেরই বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সেই টাকা আদায় করা হচ্ছে। সরকারকে এসব চিহ্নিত করে বন্ধ করা উচিত। অতীতের সরকারগুলোও এই কাজ করে এসেছে। এখনো সেই ধারাবাহিকতায়ে চলছে।’ যদিও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর কোনও কর্মকর্তা অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই  এই বিষয়ে কাজ শুরু করেছি। আওয়ামী লীগের আমলে এই লুটপাট শুরু হয়। এত এত সমস্যা রেখে গেছে। ‘সাড়া গায়ে ব্যথা, ওষুধ দেবো কোথা’ টাইপ অবস্থা আমাদের। শুধু বিদ্যুৎ না অন্য কোম্পানিগুলোর বিষয়ে আমরা কাজ করছি।’

/এপিএইচ/ইউএস/এমওএফ/
সম্পর্কিত
বিশ্ববাজারে পণ্যের দামে বড় ধাক্কার আশঙ্কা, সতর্ক করলো বিশ্বব্যাংক
‘ব্যবসায়ীরা চান, দামও বাড়ে: গ্রাহকদের আসলে দেখার কেউ নাই’
বিগত আমলের মতো বিদ্যুৎ খাতে নয়-ছয় করার সুযোগ নেই: রিজভী
সর্বশেষ খবর
বছরে ১৬০ রাত আকাশজুড়ে বিদ্যুতের ঝলকানি! প্রকৃতির এই বিস্ময় কোথায়?
বছরে ১৬০ রাত আকাশজুড়ে বিদ্যুতের ঝলকানি! প্রকৃতির এই বিস্ময় কোথায়?
বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় আজ দিল্লির অবস্থান দ্বিতীয়, ঢাকা কত নম্বরে?
বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় আজ দিল্লির অবস্থান দ্বিতীয়, ঢাকা কত নম্বরে?
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু
৪,২১৮ কিমি অটোরিকশা সফর, শেষে সেটিকেই ব্রিটেনে নিয়ে গেলেন দম্পতি
৪,২১৮ কিমি অটোরিকশা সফর, শেষে সেটিকেই ব্রিটেনে নিয়ে গেলেন দম্পতি
সর্বাধিক পঠিত
নভেম্বর থেকে কর্মী যাবে মালয়েশিয়ায়, খরচ জানালেন প্রতিমন্ত্রী
নভেম্বর থেকে কর্মী যাবে মালয়েশিয়ায়, খরচ জানালেন প্রতিমন্ত্রী
আমজনতার তারেককে সফরসঙ্গী করায় সমালোচনা নিয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী
আমজনতার তারেককে সফরসঙ্গী করায় সমালোচনা নিয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী
ইউরোপের ট্রেনের সঙ্গে বন্দে ভারতের তুলনা করে যা জানালেন পোল্যান্ডের পর্যটক
ইউরোপের ট্রেনের সঙ্গে বন্দে ভারতের তুলনা করে যা জানালেন পোল্যান্ডের পর্যটক
পরিবার নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন সেই এমপি, আপত্তিকর ভিডিও নিয়ে যা বললেন
পরিবার নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন সেই এমপি, আপত্তিকর ভিডিও নিয়ে যা বললেন
ঘূর্ণিঝড়ের নাম কে রাখে, কীভাবে ঠিক হয় সেই নাম?
ঘূর্ণিঝড়ের নাম কে রাখে, কীভাবে ঠিক হয় সেই নাম?