১০ বছরে ক্ষতি ১৬০ কোটি টাকা

পাটগুদামে অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা নিয়ে কঠোর হচ্ছে ফায়ার সার্ভিস

খুলনা প্রতিনিধি
৩০ মে ২০১৬, ১০:৫৬আপডেট : ৩০ মে ২০১৬, ১১:০৪

কাঁচাপাট পাটের গুদামে আগুন গুদামে মজুদ করার আগে ফায়ার সার্ভিসের কিছু বাধ্যবাধকতা থাকে। কিন্তু তা মানছেন না ব্যবসায়ী, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি। খোদ ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে থাকে উদাসীন। ফলে প্রতি বছর পাটের গুদামে লাগা রহস্যজনক আগুনের সূত্র ধরে ব্যাংক ও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বিপুল অর্থ লোপাট হয়ে থাকে।
এ অবস্থার মধ্যে পাটগুদামের অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা সুষ্ঠু ধারায় ফেরানো ও নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণের দিকে অগ্রসর হচ্ছে ফায়ার সার্ভিস। সরকারের এ সংস্থাটি পাটগুদামে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে করতে কঠোর হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স খুলনা বিভাগীয় উপ-পরিচালক শেখ মো. মিজানুর রহমান বলেন, পাটগুদাম ও মিলের লাইসেন্স নেওয়ার জন্য অবশ্যই অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা থাকতে হবে। অন্যথায় লাইসেন্স ইস্যু করা হবে না। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা শুধু লাইসেন্সের জন্যই তাৎক্ষণিক অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা রাখেন। কিন্তু লাইসেন্স পাওয়ার পর আর তা থাকে না। এ কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হচ্ছে।
মিজানুর রহমান বলেন, সব পাটগুদামের অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য জানতে চেয়ে কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এ তথ্য পাঠানোর জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরপরই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে।

গত ১০ বছরে খুলনায় পাটগুদাম ও মিলে ছোট-বড় ২ শতাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে বিপুল পরিমাণ পাট ভষ্মিভূতসহ প্রায় ১৬০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সর্বশেষ গত ৫ মে দিঘলিয়ায় জুট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডে (মণ্ডল জুট মিল) ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মিলের মেশিনারিজসহ অন্তত ১ হাজার ৪শ টন পাটপণ্য পুড়ে যায়। এ সব পাট পণ্যের মধ্যে চটের বস্তা ও সুতা ভারত, চীন ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে রফতানির অপেক্ষায় রাখা ছিল। মিল কর্তৃপক্ষের দাবি, এ আগুনে তাদের প্রায় ৯০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

কাঁচাপাট রফতানিকারক ও খুলনা চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক এস এম সাইফুল ইসলাম পিয়াস বলেন, পাট অন্যতম দাহ্য পদার্থ হলেও সহজে এতে আগুন লাগার কথা নয়। এ ধরনের অগ্নিকাণ্ডে মূলতঃ পাইকার ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে কারণে প্রতিটি আগুন লাগার ঘটনার সঠিক তদন্ত হলে পাটের গুদাম ও মিলে আগুন লাগার ঘটনা কমতে পারে।

গ্রীন ডেল্টা ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ও খুলনা আঞ্চলিক প্রধান শাহ জাহাঙ্গীর আবেদ জানান, পাট গুদামে পণ্য মজুদকরণে বিমা করার ক্ষেত্রে ইন্সুরেন্স কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান প্রকৃত ব্যবসায়ী বা ব্যাংক ঋণ গ্রহীতা কি-না সে বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখে। আর ব্যাংক দেখে তাদের ফায়ার লাইসেন্সসহ আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো। দুর্ঘটনা ঘটলে বিমা কোম্পানির নিজস্ব তদন্ত টিম, ব্যাংক, ফায়ার সার্ভিসের প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা শেষে ক্ষতিগ্রস্তদের ব্যাংকের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। তবে কেউ ইচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা সৃষ্টি করলে এবং তদন্তে তা প্রমাণিত হলে তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় না।

কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পাট ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়ার আগে পাট সংরক্ষণসহ আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিশেষ কারণে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি দাবি করলে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়।

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, খুলনায় ২০০৫ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত পাটের গুদামে ১৩টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দেখানো হয় ২১ কোটি টাকা। এছাড়া ২০১২ সালে খুলনা বিভাগে পাটের গুদামে ৭৭টি অগ্নিকাণ্ডে ৮ কোটি ৬০ লাখ ৯৬ হাজার টাকা, ২০১৩ সালে ৪৯টি অগ্নিকাণ্ডে ১২ কোটি ২৮ লাখ ৭৬ হাজার ৭০০ টাকা, ২০১৪ সালে ৪৭টি অগ্নিকাণ্ডে ১ কোটি ৬৬ লাখ ৪৯ হাজার ৫৩০ টাকা ও  ২০১৫ সালে ২৪টি অগ্নিকাণ্ডে ১৫ লাখ ৬৭ হাজার ৩৭৪ টাকা ক্ষতি দেখানো হয়।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খুলনা বিভাগে ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে পাটের গুদামগুলোতে ২২০টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এ সব অগ্নিকাণ্ডে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দেখানো হয়েছে প্রায় ৪৬ কোটি টাকা। ২০১৫ সালের অক্টোবরে মহানগরীর দৌলতপুরে এফআর জুট ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেডের ১০ নম্বর গুদামে আগুনে প্রায় ২৫ কোটি টাকার পাট পুড়ে যায় বলে দাবি করা হয়। এর আগেও ওই প্রতিষ্ঠানটির কয়েকটি পাটের গুদামে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

এর আগে, ২০০৬ সালে দিঘলিয়া উপজেলার শরিফ জুট গোডাউনে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতির পরিমাণ দেখানো হয় ১ কোটি ১৯ লাখ টাকা, ২০০৭ সালে দৌলতপুর উত্তরা পাট সংস্থা, ইস্টার্ন ট্রেডার্স ও  গোল্ডেন জুট সাপ্লাইয়ে পৃথক অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতি হয় ৩ কোটি ৫৯ লাখ ৩৫ হাজার ৩৯০ টাকা, ২০০৮ সালে সবুজ বাংলা গুদামে অগ্নিকাণ্ডে ৩ কোটি ৪৮ লাখ ৬০ হাজার ৮শ টাকা, ২০০৯ সালে পিপলস জুট মিল গুদামে ২০ লাখ টাকা, ২০১০ সালের ক্রিসেন্ট জুট মিলের গুদামে আগুনে ৮৫ লাখ ৮৪ হাজার টাকা, জিয়া ও মোল্লা জুট মিলে ৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা, অগ্রণী জুট সংস্থায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ও সৌরভ ট্রেডার্সে দেড় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়।

আরও পড়ুন: 

‘পানিতে ভেসে গেছে’ সঞ্চালন লাইনের ৫৬ কোটি টাকা
তিন সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত জবির শিক্ষার্থীরা

/এএ/এমএসএম /আপ -  এপিএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক