লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দরে রাজস্ব আদায়ের ২৪ লাখ টাকা আত্মসাতসহ চালান জালিয়াতি করে বিরাট অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় জড়িত ৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে উচ্চ পর্যায়ের তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি। বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান তপন কুমার চক্রবর্তীর নির্দেশে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি ৪২ পাতার এ প্রতিবেদন দাখিল করে।
স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (হিসাব) গাজী মো. আলী আকবরের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন- স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের উপ-পরিচালক (ট্রাফিক) মামুন কবীর তরফদার ও হিসাবরক্ষক রিপন চন্দ্র সোম।
গত ৫ ও ৬ মে সরজমিনে তদন্ত কমিটি বুড়িমারী স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের রক্ষিত আমদানি-রফতানি ফাইলপত্র পর্যালোচনা করে মোট ৪২ পাতার একটি তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেন। ওই প্রতিবেদন গত ১১ মে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর দাখিল করা হয়।
ওই প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়, আমদানি-রফতানি পণ্যের রাজস্ব আদায়ের টাকা জনতা ব্যাংক বুড়িমারী শাখার এসএনডি-১০ নং অ্যাকাউন্টে জমা করার কথা।
এ হিসাব নম্বরটি বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের (বাস্থবক) নিজস্ব পরিচালিত। কিন্তু আমদানি-রফতানি পণ্যের আদায়কৃত সরকারি রাজস্ব ২৩ লাখ ৭৩ হাজার ৬১৩ টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে ট্রাফিক পরিদর্শক আব্দুল কাদের জিলানী, ট্রাফিক পরিদর্শক জাহাঙ্গীর আলম ও ওয়্যার হাউজ সুপার আবু মুসা মো.তারেক যোগসাজস করে তা আত্মসাৎ করেন।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সরকারি কোষাগারের এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয় মর্মে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা রয়েছে। এ ঘটনায় ওই তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ও বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিবেদনে সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।
কিন্তু ওই তিন কর্মকর্তা অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনা ধামাচাপা দিতে কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার পেছনে ধরনা দিচ্ছে বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
তদন্ত কমিটির দাখিলকৃত প্রতিবেদনটি বাংলা ট্রিবিউনের হাতে আসলে তা পর্যালোচনায় দেখা যায়, বুড়িমারী স্থলবন্দরের ট্রাফিক শাখায় রক্ষিত তথ্যাদি প্রাথমিক পর্যায়ে ‘দৈবচয়ন’ ভিত্তিতে তিনটি চালানের কপি যাচাই করা হয়। এতে তদন্ত কমিটি কাছে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়ে। যাচাই করা চালানগুলো হলো-২০১৫ সালের ২৩ নভেম্বরের চালান নং ৫৭১, একই বছরের ৭ জুলাইয়ের চালান নং ৬৪ ও একই বছরের ২৬ এপ্রিলের চালান নং ২৬০।
ওয়্যার হাউজ সুপার আবু মুসা মো.তারেক ৫৭১ নং চালানটি প্রস্তুত করেন। ওই চালানের মালামালগুলো ২০১৫ সালের ৫ অক্টোবর স্থলবন্দরে প্রবেশ করে এবং কাস্টমস কর্তৃপক্ষ একই বছরের ২২ নভেম্বর আউটপাস ইস্যু করেন।
এ হিসেব মতে পণ্যগুলো স্থলবন্দরে ৪৭ দিন অবস্থান করে। স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের নিয়মানুযায়ী ও সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রতিদিনের জন্য এসব পণ্যের বন্দর ব্যবহারে রাজস্ব দিতে হয় ২ হাজার ৬৬৭ টাকা। ফলে ৪৭ দিনে সরকার রাজস্ব পাওয়ার কথা ১ লাখ ২৫ হাজার ৩৪৯ টাকা। কিন্তু ওয়্যার হাউজ সুপার তারেক মাত্র একদিনের রাজস্ব ২ হাজার ৬৬৭ টাকা জমা দেখিয়ে অবশিষ্ট টাকা আত্মসাৎ করেন।
একই কায়দায় বন্দরের ট্রাফিক পরিদর্শক জাহাঙ্গীর আলম ৬৪ ও ২৬০ চালান দুটি প্রস্তুত করেন। তিনি ৬৪ ও ২৬০ নম্বর চালানে ৬০ দিনের বদলে মাত্র ৪ দিনের সরকারি রাজস্ব ব্যাংকে জমা করে অবশিষ্ট টাকা আত্মসাৎ করেন।
প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এসব চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে সামান্য অর্থ জমা দিয়ে বিরাট অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়। আর এর মাধ্যমে ওই তিন কর্সকর্তা আত্মসাৎ করেছেন বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ। সম্প্রতি এই তিন কর্মকর্তা আরও ১৬ লাখ ৮৪ হাজার ৫৮৬ টাকা আত্মসাৎ করেন বলেও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বুড়িমারী স্থলবন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্থলবন্দর কার্যক্রম শুরুর পর হতেই একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট, ট্রাফিক পরিদর্শক ও ওয়্যার হাউজ সুপার কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কোটি কোটি টাকা সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আত্মসাৎ করে আসছে। কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বেপরোয়া চাঁদাবাজির শিকারও হন বলে দাবি করেন ব্যবসায়ীরা।
তবে এ ব্যাপারে নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে বাকি দুই কর্মকর্তার ঘাড়ে দোষ চাপিয়েছেন ট্রাফিক পরিদর্শক আব্দুল কাদের জিলানী। তিনি অর্থ কেলেঙ্কারির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ট্রাফিক পরিদর্শক জাহাঙ্গীর আলম ও ওয়্যার হাউজ সুপার আবু মুসা মো.তারেক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে সরকারি রাজস্বের টাকা জমা না দিয়ে তা আত্মসাৎ করেছেন। তারাই চালান জালিয়াতি করেছেন। কিন্তু,বন্দরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে আমার ওপর দোষ চাপানো হচ্ছে।
অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনা সম্পর্কে তদন্ত কমিটির কাছে লিখিতভাবে বিস্তারিত জানিয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের উপ-পরিচালক (ট্রাফিক) ও তদন্ত কমিটির অন্যতম সদস্য মামুন কবীর তরফদার জানান, স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের নির্দেশে বুড়িমারী স্থলবন্দরের রাজস্ব (মাশুল) আদায় ও জমা সংক্রান্ত বিষয় তদন্ত করা হয়। ৪২ পাতার তদন্ত প্রতিবেদন চেয়ারম্যানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ব্যাংকে টাকা জমা না করে আত্মসাৎ ও ৩টি চালান প্রাথমিক তদন্তে গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়ার তথ্য ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিন সদস্য তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের (হিসাব) পরিচালক (যুগ্ম সচিব) গাজী মো. আলী আকবর বলেন, প্রাথমিক তদন্তে ২৩ লাখ ৭৬ হাজার ৬১৩ টাকা বাস্থবকের অ্যাকাউন্টে (তহবিল) জমা না করে আত্মসাৎ করার প্রমাণ মিলেছে। দৈবচয়ন ভিত্তিতে ৩টি চালানের কপি যাচাইকালে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম পাওয়া যায়। এতে বিরাট অঙ্কের রাজস্ব (মাশুল) ফাঁকি দিয়ে জালিয়াতি করে তা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ট্রাফিক পরিদর্শক আব্দুল কাদের জিলানী, জাহাঙ্গীর আলম এবং ওয়্যার হাউজ সুপার আবু মুসা মো. তারেকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মতামতসহ প্রতিবেদনটি স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ চেয়ারম্যানের কাছে দাখিল করা হয়েছে।
এছাড়া বুড়িমারী স্থলবন্দরের অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা বন্ধে একটি অডিট টিম গঠন করে দ্রুত বুড়িমারী স্থলবন্দরে পাঠানোসহ আরও ৯টি বিষয়ে সুপারিশ করা করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা আমার জানা নেই। তবে এ বিষয়ে কিছু জানার থাকলে প্রশাসনিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
/এআর/টিএন/
আরও পড়তে পারেন : কুষ্টিয়ায় টিসিবির কার্যক্রম স্থবির, পণ্য তুলছেন না ডিলাররা








