অবশেষে ভোটার হচ্ছেন বাংলাদেশের বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দারা। পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ, বোদা ও সদর উপজেলার ৩৬টি বিলুপ্ত ছিটমহল, পাটগ্রাম উপজেলার ৫৫টিসহ লালমনিরহাট জেলার মোট ৫৯টি বিলুপ্ত ছিটমহল এবং কুড়িগ্রাম জেলার ১২টি ছিটমহলের মধ্যে ১১টি বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দারা ভোটার হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। বাকি একটি ছিটমহল জনবসতিশূন্য হওয়ায় সেটি বাদ থাকছে।
রবিবার (১০ জুলাই ২০১৬) থেকে বিলুপ্ত এ সব ছিটমহলের বাসিন্দাদের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তকরণের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।
ছিটমহলের প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে ভোটার হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এই কাজ চলবে আগামী ১৬ জুলাই পর্যন্ত। ১৭ জুলাই থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত ভোটারদের ছবি তোলা হবে। এরপর ১ আগস্ট খসড়া তালিকা প্রকাশ এবং খসড়া তালিকা সংশোধন করে ৪ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে।
পঞ্চগড় জেলা
বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তকরণ প্রসঙ্গে পঞ্চগড় জেলা নির্বাচন অফিসার দেওয়ান মো. সারোয়ার জাহান জানান, পঞ্চগড়ের বোদা, দেবীগঞ্জ ও সদর উপজেলার ৩৬টি বিলুপ্ত ছিটমহলে ৪১ জন তথ্যসংগ্রহকারী ও ১১ জন সুপারভাইজার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে রবিবার থেকে তারা তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেছেন।
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানানো হয়,বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোর মধ্যে দেবীগঞ্জে নয় হাজার, বোদা উপজেলায় দুই হাজার এবং পঞ্চগড় সদর উপজেলায় এক হাজার ৫শ জন সম্ভাব্য ভোটারের তালিকা সংগ্রহ করা হবে।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার গাড়াতি ছিটমহলের চেয়ারম্যান মো. মফিজার রহমান জানান, এ জেলার ৩৬টি ছিটমহলের মধ্যে ১৭টি ছিটমহলে জনবসতি রয়েছে। অবশিষ্ট ১৯টি ছিটমহলে কেউ বসবাস করেন না। ভোটার হতে পারার কারণে ছিটমহলের বাসিন্দাদের মধ্যে বেশ উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে।
লালমনিরহাট জেলা
পাটগ্রাম উপজেলার ৫৫টিসহ লালমনিরহাট জেলার মোট ৫৯টি বিলুপ্ত ছিটমহলে ভোটার তালিকা তৈরির জন্য তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারসহ মোট ৩১ জনকে স্থানীয় নির্বাচন অফিস নিয়োগ দিয়েছে।
রবিবার বিকেলে সরেজমিন পাটগ্রাম উপজেলার বিলুপ্ত সর্ববৃহৎ ১১৯ নম্বর বাঁশকাটা ছিটমহলে গিয়ে দেখা যায়, জয়নাল আবেদিনের বাড়ির উঠানে নারীপুরুষের জটলা।
কাছে গিয়ে জানা যায়, ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য বিলুপ্ত ছিটবহলবাসীরা তথ্যসংগ্রহকারী সহকারী শিক্ষক আতাউর রহমানকে ঘিরে ধরে একজন একজন করে তথ্য দিচ্ছেন। সেখানেই কথা হয়, জয়নাল আবেদিন জবেদ আলী,সাফিউল ইসলাম ও নজরুল ইসলামের সাথে।
তারা বলেন,ভারত-বাংলাদেশ সরকার ছিটমহল সমস্যার সমাধান করে আমাদের জীবনের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। বিলুপ্ত ছিটবাসীদের উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন। এবার ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আমরা এখন নিজের ভোট দিতে পারবো। নিজের পছন্দের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবো। এর চেয়ে আর কী চাই আমাদের!
পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আফতাবুজ্জামান বলেন,এ উপজেলার মোট সাতটি ইউনিয়নে ৫৫টি বিলুপ্ত ছিটমহল রয়েছে। জনবসতিবিহীন ১৯টি বিলুপ্ত ছিটমহল বাদে জনবসতিপূর্ণ ৩৬টি ছিটমহলের অধীবাসীদের ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারসহ মোট ২৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে যেন কোনো ছিটবাসী বাদ না পড়েন, সেজন্য সবখানে মাইকিং করা হচ্ছে।
লালমনিরহাট জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ফজলুল করিমের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,পাটগ্রামের সাতটি ইউনিয়ন,হাতীবান্ধার একটি ও সদর উপজেলার একটি ইউনিয়নের অভ্যন্তরে মোট ৫৯টি বিলুপ্ত ছিলমহল রয়েছে। এর মধ্যে পাটগ্রামে ৫৫টি,হাতীবান্ধায় দুটি ও সদর উপজেলায় দুটি ছিটমহল রয়েছে।
কুড়িগ্রাম জেলা
ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে শুরু করেছেন কুড়িগ্রামের বিলুপ্ত ছিটমহলের অধিবাসীরাও।
রবিবার থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে কুড়িগ্রাম জেলার সদ্যবিলুপ্ত ১২টি ছিটমহলের মধ্যে ১১টিতে (একটি ছিটমহল জনবসতি শূন্য) ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তকরণ কার্যক্রম শুরু হয়।
সকালে ফুলবাড়ী উপজেলায় অন্তর্ভুক্ত দাসিয়ারছড়া ছিটমহলের কালিরহাট বাজার এলাকায় এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবেন্দ্রনাথ উরাঁও। এ সময় জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেনসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
তথ্যসংগ্রহের কাজে চারজন সুপারভাইজার এবং ১৯ জন তথ্যসংগ্রহকারীকে নিয়োগ করা হয়েছে।
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অন্তর্ভুক্ত বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার ফিরোজ আহমেদ জানান,ভোটার তালিকার কাজ শুরু হওয়ায় আমরা খুবই আনন্দিত। আমরা এখন ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবো। আমাদের এখন জাতীয় পরিচয়পত্র হবে। বাংলাদেশের নাগরিকত্বের স্বাদ পূর্ণতা পাবে।
এদিকে, বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা জানান,অনেক দিনের আন্দোলনের পর আমরা ছিটমহলবাসী বাংলাদেশের নাগরিক হয়েছি। কিন্তু ভোটার হতে পারিনি। ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির কাজ শুরু হয়েছে। এখন আমরা বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবো।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন,১৬ জুলাই পর্যন্ত তথ্যসংগ্রহ শেষে ১৭ জুলাই থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত ভোটারদের ছবি তোলা হবে। এরপর ১ আগস্ট খসড়া তালিকা প্রকাশ এবং খসড়া তালিকা সংশোধন করে ৪ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে।
এর আগে জেলার ১২টি ছিটমহলের সাত হাজার সাতশ ৪৭ জন অধিবাসীকে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারত-বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ১৬২টি ছিটমহল বিনিময় কার্যকর করে শেখ হাসিনা-নরেন্দ্র মোদির সরকার। তার আগে এ সব ছিটমহলে দুই দফায় যৌথভাবে হেডকাউন্টিং (মাথা গণনা) সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়।
এরপর ভারতের ভেতরে থাকা বাংলাদেশি ৫১টি ছিটমহল এবং বাংলাদেশের ভেতরে থাকা ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল বিনিময় হয়। এতে বাংলাদেশ পায় ১১১টি ও ভারত পায় ৫১টি ছিটমহল। এর মধ্যে বাংলাদেশের মানচিত্রে নতুনভাবে যোগ হওয়া ভারতীয় ১১১টি ছিটমহলের মোট ৩৭ হাজার ৫৩৫ জন নাগরিক বাংলাদেশি নাগরিকত্বের জন্য আবেদন জানান।
ছিটমহল বিনিময় কার্যকর হলে এ বছরের (২০১৬) ১১ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার এক গেজেটের মাধ্যমে তাদের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব দিয়ে গেজেট প্রকাশ করে। তারই ধারাবাহিকতায় বিলুপ্ত ছিটবাসীদের দেশের ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তসহ জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার লক্ষ্যে ১০ জুলাই থেকে ১৬ জুলাইয়ের মধ্যে তথ্যসংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
আরও পড়ুন: লাউয়াছড়ায় পর্যটকদের ভিড়ে উধাও বন্যপ্রাণী
/এবি/আপ-এআর/








