পরিচিত ফসল চাষের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে নতুন নতুন ফসল চাষে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের আশরাফ হোসেন স্বপন সফলতা পেয়েছেন। পরিচিতি পেয়েছেন সৃজনশীল চাষি হিসেবে। উৎপাদন যথাযথ হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় থাকা সত্ত্বেও ঝুঁকি নিয়ে নতুন নতুন ফসল চাষ করে চলেছেন তিনি। এবার বিদেশি ড্রাগন ফল চাষ করে এলাকায় রীতিমত হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন। লাভজনক হওয়ায় সুস্বাদু এ ফলের চাষ সম্প্রসারিতও করেছেন। এখন ক্রমশ ছড়িয়ে দিতে চান জেলাব্যাপী।
কৃষি উদ্যোক্তা স্বপন জানান, প্রথম দিকে ধান, পাট ও আখের মতো পরিচিত ফসল চাষ শুরু করলেও কয়েক বছর পরেই চাষে বৈচিত্র্য আনেন। ধান-পাট বাদ দিয়ে শুরু করেন ফুল চাষ। ২০০১ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশি বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির ফুল চাষ করে ভালো মুনাফাও পেয়েছিলেন। তার দেখাদেখি অনেকে ফুল চাষ করে লাভবান হয়েছেন। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে ফুল চাষিদের বেশ মন্দা সময় যায়। এ সময় ফুল ও গাছে পচন ধরে। বাজার দরও কম পাওয়া যায়। এজন্য নতুন ফসল চাষে মনোযোগ দেন তিনি। একসময় টেলিভিশন ও পত্র পত্রিকায় স্ট্রবেরি চাষ নিয়ে প্রতিবেদন দেখে এ ফল চাষে আগ্রহ জন্মে তার। ২০১৪ সালে ১৮ শতক জমিতে স্ট্রবেরি চাষ শুরু করেন। প্রথম বছরে খুব বেশি লাভ না পেলেও পরের বছর নিজের উৎপাদিত চারা দিয়ে ৬৮ শতক জমিতে স্ট্রবেরি চাষ করে আর্থিকভাবে বেশ লাভবান হন।
স্বপন জানান, বালিয়াডাঙ্গা বাজারে তার একটি কীটনাশক ও বীজ এর ব্যবসা প্রতিষ্ঠা আছে। সেই সূত্রে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা কৃষিবিদ আব্দুল্লাহ আল নোমানের সাথে পরিচয়। তারই অনুপ্রেরণায় ২০১৪ সালে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারা এনে ২৫ শতক জমিতে ড্রাগন চাষ শুরু করেন। প্রতিটি চারা ১শ’ ২০টাকা দরে ক্রয় করেন। ড্রাগন চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করে কংক্রিটের পিলার স্থাপন করতে হয়। একটি কংক্রিটের পিলারের চার পাশে ৪টি চারা লাগনো হয়। এক একরে ৫শ’টি চারা লাগানো যায়। পিলারের উপর একটি টায়ার বেঁধে দেওয়া হয়। এই টায়ারের উপর ড্রাগনের শাখা প্রশাখা ছড়িয়ে থাকে। স্বপন জানান, অক্টোবর মাসে ড্রাগন চারা লাগানো হয়। প্রায় ১৮ মাস পরে গাছে ফল আসে। ১ বিঘা জমিতে ড্রাগন চাষে ফল আসা পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ টাকা খরচ হয়।
সাধারণত জুলাই আগস্টে ফল পাকতে শুরু করে। ফুল আসার ৪০ থেকে ৪৫ দিনের মাথায় ফল পেকে যায়। একটি পরিপুষ্ট পাকা ফলের ওজন প্রায় ৩শ’ থেকে ৪শ’ গ্রাম হয়। এক নাগাড়ে প্রায় ৩ থেকে ৪ মাস ফল সংগ্রহ করা যায় বলে চাষি স্বপন জানান। স্বপন আরও জানান, এ ফল চাষে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হয় না। সাধারণত কেঁচো কমপোস্ট সার প্রয়োগ করা হয়। ওষুধ প্রয়োগ করা লাগে না। পাকা ফল ফ্রিজিং বাদেই ৮ থেকে ১০ দিন ভালো থাকে। এলাকায় ড্রাগন চাষ ছড়িয়ে দিতে তিনি ৫ হাজার চারা দিয়েছেন। কেউ এ ফল চাষে আগ্রহী হয়ে তার কাছে আসলে পরামর্শসহ তাকে যাবতীয় সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন।
এদিকে কালীগঞ্জে বোরহান উদ্দিন নামের এক সৌখিন চাষি প্রায় ৩ বছর আগে শখের বশে ড্রাগনের চাষ শুরু করেন। ২৮ শতক ড্রাগনের ক্ষেত থেকে প্রথম বছর খুব একটা লাভ আসেনি।
বোরহান জানান, ড্রাগন চাষে প্রথম বছর খরচ একটু বেশি হয়। পরের বছর থেকে খরচ নেই বললেই চলে। এ বছর গাছের পরিচর্যা, সেচ ও সার বাবদ ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তবে এ মৌসুমে (২০আগস্ট পর্যন্ত) এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ৩ লাখ টাকার ড্রাগন ফল বিক্রি করেছেন। এ বছর তিনি আরও ১ লাখ টাকার ফল বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন। ড্রাগন একবার লাগালে একনাগাড়ে ২৫ বছর ফল পাওয়া যায়। তাই এই ফল চাষে যে কোনও কৃষকই লাভবান হতে পারবেন। ড্রাগন ফল স্থানীয় বাজারেও বিক্রি হচ্ছে। কালীগঞ্জের মুনছুর প্লাজার সামনে অনন্ত ফল ভাণ্ডারে ড্রাগন ফল বিক্রি হয়।
ফল বিক্রেতা কৃষ্ণ জানান, সাধারণ ক্রেতাদের কাছে ড্রাগন ফল অপরিচিত ও এর দাম বেশি হওয়ায় অন্যান্য ফলের তুলনায় বিক্রি কম হয়। তবে আগের তুলনায় বিক্রি বেড়েছে।
বোরহান জানান তিনি অধিকাংশ ফল ঢাকার একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে বিক্রি করেন। বাংলাদেশে উৎপাদিত ড্রাগন ফল বিদেশে রফতানি হচ্ছে বলে তিনি জেনেছেন। ফলের সাইজ অনুযায়ী প্রতি কেজি ড্রাগন ২৫০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়।
কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ জাহিদুল করিম জানান, বাংলাদেশে এ ফলের চাষ এখনও সেভাবে শুরু হয়নি। কালীগঞ্জ উপজেলায় বোরহান ও স্বপন নামের ২ জন চাষি ক্যাটকাস প্রজাতির এ ফলের চাষ শুরু করেছেন। অধিক পুষ্টিগুণ সম্পন্ন এ ফল চোখকে সুস্থ রাখে, শরীরের চর্বি কমায়, রক্তের কোলেস্টেরল কমায়, উচ্চ রক্তচাপ কমানোসহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করে। ঢাকায় এ ফলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় বাজারেও এ ফল বিক্রি শুরু হয়েছে। উপজেলার চাষিদের উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে আগামী ৩ বছরে কমপক্ষে ১০ হেক্টর জমিতে লাভজনক ড্রাগন ফলের চাষ সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনা আছে বলে তিনি জানান।
/এইচকে/
পড়ুন: চিংড়ির পাশাপাশি সবজি চাষে আগ্রহী হচ্ছেন সাতক্ষীরার মাছ চাষিরা








