তেল-বর্জ্যে দূষণ বাড়ছে খুলনার ভৈরব নদে

হেদায়েৎ হোসেন, খুলনা
৩০ আগস্ট ২০১৬, ১৯:৩৮আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০১৬, ১৯:৩৮



খুলনার ভৈরব নদে দূষণ তেল আর শিল্পের নানা বর্জ্যে প্রতিনিয়ত দূষণ বাড়ছে খুলনার ভৈরব নদে। ভৈরব নদের দু’তীরের খালিশপুর ও দিঘলিয়া অংশে এ ধরনের দূষণের মাত্রা বেড়েই চলেছে।

তিনটি তেল ডিপোর মূল পয়েন্ট থাকার কারণে এ এলাকায় গড়ে উঠেছে চোরাই তেল সিন্ডিকেট। ইতোপূর্বে এরা জাহাজ থেকে হোসপাইপ দিয়ে তেল চুরি করা হতো। এখন তারা জাহাজের কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে জাহাজ থেকেই খোলা ড্রামে ভরে নৌকা ও ট্রলারে করে দুপাড়ে নেওয়া হয়।এই তেল নামানোর স্থানে প্রচুর তেল পড়ছে এবং তা নদীর পানিতে গিয়ে মিশছে। এছাড়া তিনটি তেল ডিপোর ধোয়ামোছার পর তেলযুক্ত বর্জ্যও নদীতে পড়ছে।

মহানগরীর দৌলতপুর-খালিশপুর এলাকায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি)তেলের তিনটি ডিপোর তেলযুক্ত পানি সরাসরি ভৈরব নদীতে মিশছে। এবাদে ভৈরব নদীর দু’তীরে থাকা ১০টি পাটকল থেকেও প্রতিদিনই বর্জ্য যাচ্ছে নদীর পানিতে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রর বর্জ্য পড়ছে নদীতে।

অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি পদ্মা কোম্পানির ডিজেল বহনকারী জাহাজ বার্মাশীল খেয়াঘাটের সামনে ভৈরব নদে থাকা ‘মার্কিনটেন ১৩’ থেকে রাতে ২৮ ব্যারেল অর্থাৎ ৫ হাজার ৬শ’ লিটার ডিজেল চুরির সময় স্থানীয় লোকজন খালিশপুরের চোরাকারবারীদের আটক করে। এ সময় এলাকাবাসী পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ রহস্যজনক ভূমিকা পালন করে।

এ বিষয়ে খালিশপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমীর তৈমুর ইলী বলেন, চোর আর জাহাজের কর্মকর্তারা মিলে তেল চুরি করলে পুলিশের কিছুই করার নেই। আর ঘাটে পড়ে থাকা তেলে নদী দূষণ বিষয়ে দৃষ্টি দিতে গেলেও অভিযোগ পাওয়াটা জরুরি।তিনি বলেন, এ সব ঘটনায় এ পর্যন্ত থানায় কোনও ধরনের অভিযোগ হয়নি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

বিভিন্ন সময়ে চোরাই তেল আটক করা হলেও অভিযোগ না পাওয়ার কারণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না বলে জানান আমীর তৈমুর ইলী।

তেল কোম্পানির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,তিনটি তেল কোম্পানির জন্য চট্টগ্রাম থেকে জাহাজযোগে আনা তেলের একটি অংশ চুরি হয়ে যায়, যা রোধ করা গেলে প্রতিষ্ঠানগুলো লাভবান হতে পারতা। আর তেল পড়ে নদীর পানি দূষিত হওয়ার চাপটাও কোনও কোম্পানিকে নেওয়া লাগতো না। তিনি বলেন, কোম্পানির ঘাটে আসা জাহাজ থেকে পাইপের মাধ্যমে তেল নামানোর সময় এক ফোঁটা তেলও নদীতে পড়ার সুযোগ নেই। প্রতিমাসে তিনটি ডিপোর গড়ে এক কোটি টাকার তেল চুরি হয়। পাচার হওয়ার পর ট্যাংকারে থাকা ফার্নেস অয়েলের সাথে পানি মিশ্রিত করে ঘাটতি পূরণ করা হয়।

স্থানীয় কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে, মহানগরীর খালিশপুরে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তেল কোম্পানির ডিপোর জন্য চট্টগ্রাম থেকে ট্যাংকারযোগে পেট্রোল, ডিজেল, অকটেন, কেরোসিন ও ফার্নেস অয়েলসহ সব ধরনের জ্বালানি তেল আনা হয়। ওই জাহাজ ডিপো সংলগ্ন ঘাটে নোঙর করে। চট্টগ্রাম থেকে তেলবাহী ট্যাংকার খালিশপুরের ভৈরব নদ সংলগ্ন তিনটি তেল ডিপোর ঘাটে নোঙর করার পরই তেল চোরাকারবারীরা তৎপর হয়ে ওঠে। বর্তমানে এরা জাহাজের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘ম্যানেজ’ করে প্লাস্টিকের ক্যানে করে তেল নামিয়ে আনেন। ফার্নেস অয়েল এভাবেই বেশি পাচার হচ্ছে। আর জাহাজের লোকজন এ ঘাটতি পোষাতে পানি মিশিয়ে তেল ডিপোতে সরবরাহ করে।

প্লাটিনাম জুট মিলের জিএম মাহাতাব আলী বলেন, ফার্নেস অয়েলের সঙ্গে পানি মেশানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি, এ রকম একটা ঘটনা ঘটার পর খুলনার সব মিল কর্তৃপক্ষ তিনটি ডিপোর কর্তৃপক্ষকে সতর্ক নোটিশ প্রদান করে।

খুলনার ভৈরব নদে দূষণ সূত্রে জানা গেছে, দিঘলিয়ার ফরমাইশখানার বার্মাশীল খেয়াঘাট থেকে খুলনা শহরসহ বিভিন্ন জায়গায় এ তেল পাচার হয়ে থাকে। এছাড়া খালিশপুর, দৌলতপুর ও দিঘলিয়া থানার বেশ কয়েকটি জ্বালানি তেলের দোকানে প্রতিনিয়ত চোরাই তেল বিক্রি হয়। দিঘলিয়া ও খালিশপুরের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নেতৃত্বে এ চোরাই তেলের বাজার সক্রিয়।

চোরা কারবারির সঙ্গে জড়িত নৌকার মাঝি ইউসুফ আলী জানান, তেল নিয়ে আসা জাহাজের লোকজনের পারাপারের জন্য তার নৌকা ব্যবহার করা হলে তখন তারা এর পারিশ্রমিক বাবদ কিছু তেল দেন। আবার জাহাজের লোকজন তেল বিক্রিও করে থাকেন। ওই তেল তিনি কিনে নেন। যা পাড়ে নেওয়ার পর নৌকা থেকে নামানোর সময় ঘাটে পড়ে। সামান্য তেল পড়লে জোয়ার-ভাটার এই ভৈরব নদের পানির তেমন একটা দূষণ হওয়ার কথা না।

খুলনা বিভাগীয় পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক মল্লিক আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রতিমাসে পরিবেশ অধিদপ্তরের কেমিস্ট শাখা থেকে নদীর পানি পরীক্ষা করা হয়। ভৈরব নদীর চরেরহাট ও ফুলতলা অংশের পানি সংগ্রহ ও পরীক্ষা হয়, যা আরও সতর্কতার সাথে পরীক্ষা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে ভৈরব নদীর আরও কয়েকটি স্থানের পানি সংগ্রহ করে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। তিনি জানান, নদীর পানিতে সাড়ে চার মিলিগ্রামের ওপরে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা থাকতে হবে। পরীক্ষায় কখনও কখনও এ মাত্রার চেয়ে প্রায় দুই থেকে তিন মিলিগ্রাম বেশি পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি ‘বেলা’র খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহাফুজুর রহমান মুকুল বলেন, ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের (ইটিপি) ছাড়পত্র ছাড়াই নদীর দু’পাড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ছোট-বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান। তবে কিছু প্রতিষ্ঠানের ইটিপি থাকলেও খচর বৃদ্ধির ভয়ে তা’ ব্যবহার করা হয় না। সংশ্লিষ্টরাও অজ্ঞাত কারণে এ বিষয়ে নীরবতা পালন করে থাকেন।

পরিবেশবিদদের মতে,ভাসমান তেলের কারণে সূর্যের আলো নদীর পানির নিচের স্তর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। ফলে, মাছ ও জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক বেঁচে থাকার পরিবেশ বিঘ্নিত হয়।মাছের পোনার নার্সারি গ্রাউন্ডও এ কারণে ধ্বংস হচ্ছে।

/এবি/

আরও পড়ুন

হিলি সীমান্তে পিস্তল, গুলি ও ম্যাগাজিন জব্দ

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম