বিদায় নেওয়ার আগের ২৭ দিনে কুমিল্লার সদ্য সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল শতাধিক সংগঠন, প্রতিষ্ঠান থেকে সংবর্ধনা এবং উপহার নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, জেলা প্রশাসনের কর্মচারীদের থেকেও নিয়েছেন কয়েক লাখ টাকা। গত ২৩ আগস্ট গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে বদলি নির্দেশের পর ১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা থেকে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সকাল, দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যা ও রাতে তিনি এসব সংবর্ধনা নেন।
জানা গেছে, কুমিল্লায় ডিসি হিসেবে ২বছর ৩মাস দায়িত্ব পালন করেন মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল। আর সংবর্ধনার বিষয়টি একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে দিয়ে সমন্বয় করান। ওই প্রশাসকই ডিসির পছন্দ-অপছন্দের কথা জানিয়ে দিতেন।
প্রশাসনের বিভিন্ন সূত্র জানায়, কুমিল্লার ১৬টি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) নির্দেশ দিয়ে এসব সংবর্ধনা অনুষ্ঠান করা হয়েছে। এ নিয়ে বিরক্ত কয়েকজন ইউএনও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ইউএনও জানান, সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য আমাদের কোনও বাজেট নেই। ডিসি স্যারের চাপে আয়োজন করতে হয়েছে। এ জন্য আমাদের স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির নিকট হাত পাততে হয়েছে।
এছাড়া মনের মতো সংবর্ধনা না পাওয়ায় মুরাদনগর উপজেলার ইউএনও মোহাম্মদ মনসুর উদ্দিনকে ভরা অনুষ্ঠানে শাসান জেলা প্রশাসক। তিনি ইউএনও মোহাম্মদ মনসুর উদ্দিনকে বলেন, ‘কিভাবে তুমি চাকরি করো আমি দেখে নেবো।’ রাগারাগি করে ২ সেপ্টেম্বর মুরাদনগরের অনুষ্ঠান ছেড়ে জেলা প্রশাসক গাড়ির নিকট চলে যান। তখন তাকে বুঝিয়ে ইউএনওর পক্ষে দুঃখ প্রকাশ করে ফিরিয়ে আনেন উপজেলা চেয়ারম্যান সৈয়দ আবদুল কাইয়ুম।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত মুরাদনগর উপজেলার নবীপুর পশ্চিম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন জানান, অনুষ্ঠানে কি নিয়ে যেনো রাগারাগি করে ডিসি স্যার ইউএনও স্যারকে বকাবকি করে চলে যান। পরে উপজেলা চেয়ারম্যান সাহেব ইউএনও স্যারের পক্ষে তাকে বলে-কয়ে ফিরিয়ে আনেন।
তবে ছোট জায়গায় সংবর্ধনা নেবেন না জানিয়ে ডিসি ৭ সেপ্টেম্বর কয়েকটি জায়গার সংবর্ধনা বর্জন করেছিলেন। কিন্তু একই দিন (৭ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ জেলা প্রশাসককে বর্ণাঢ্য আয়োজনে সংবর্ধনা দেন। মো. হাসানুজ্জামান কল্লোলের জন্য বিশাল তোরণও নির্মাণ করা হয়। সেখানে দীর্ঘক্ষণ রোদে দাঁড়িয়ে থেকে তাকে বরণ করেন শিক্ষার্থীরা। কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ অধ্যক্ষ এ এস এম আবদুল ওহাব বলেন, ‘তিনি সম্মানিত মানুষ, তাই ছোটখাটো আয়োজন করে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে।’
এছাড়া, ১০ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বীরচন্দ্র নগর মিলনায়তনে তিনি সংবর্ধনা নেন। সেখানে ৪৭টি সংগঠন তাকে ফুল ও উপহার প্রদান করেন।
অন্যদিকে, ২০১৫ সালের ১ আগস্ট জেলা প্রশাসকের মা রওশন আরা বেগম মারা যান। এ নিয়ে তিনি বিভিন্ন উপজেলায় ইউএনওদের দিয়ে গণহারে দোয়ার মাহফিল করান। শোকের ব্যানার টানানো হয় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের বাইরে। কুমিল্লা জেলা কলেক্টরেট স্কুলে মায়ের নামে পাঠাগার, জেলা প্রশাসনের অর্থে প্রকাশ করা বই মায়ের নামে উৎসর্গ করার বিষয়টিও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
এসব বিষয়ে সাবেক জেলা প্রশাসক মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সত্য নয়। এখানে আমি ৭০/৭২টা সংগঠনের সভাপতি। তারা আমাকে ভালোবেসে সংবর্ধনা দিয়েছে। আর কাউকে নির্দেশ দেওয়া হয়নি। উপজেলার অধিকাংশ অনুষ্ঠানের ব্যানারে লেখা ছিলো বিদায়কালীন মতবিনিময়। আমার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ৪জন সংসদ সদস্যও। মানুষ কাজ করলে ভুল হয়। আমি মূলত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়েছি দোয়া ও বিদায় নিতে। আর বিদায়ের সময় মানুষ আমাকে টাকা দেবে কেনো। যারা মিথ্যা বলে তাদের যেন জিব খসে পড়ে।’
/এমও/আপ-এনএস/








