রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১২ সালে তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থা বিভাগ থেকে মাস্টার্স পাস করেন মেহেদী হাসান (ছদ্মনাম)। বেকার জীবনযাপন করছেন এখনও। বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন চাকরির জন্য। টিউশনি করে নিজের খরচ যোগান। এরমধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তনের ডাক পেলেন। কিন্তু নিবন্ধন ফি, যাতায়াত ভাড়া, আবাসনসহ আনুসঙ্গিক ব্যয় বহন করার মতো সক্ষমতা তার নেই। ফলে প্রবল ইচ্ছা সত্ত্বেও সমাবর্তনে অংশগ্রহণ সম্ভব হচ্ছে না তার পক্ষে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, এর আগের সমাবর্তনেও একই ফি ছিল। তাই কমানোর কোনও সুযোগ নেই। তার ওপর আবার গাউন দিয়ে দেওয়া হবে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, যদি গাউনের জন্য ফি বাড়ানো হয় তাহলে গাউন না দিয়ে ফি কমানো হোক। কারণ, এককালীন গাউনের মালিক হওয়ার চেয়ে সমাবর্তনে অংশগ্রহণ বেশি তৃপ্তি ও আনন্দদায়ক।
গত ৩০ অক্টোবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ৩ নভেম্বর থেকে সমাবর্তনের নিবন্ধন শুরু হবে। চলবে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ে পিএইচডি, এমফিল, স্নাতকোত্তর এবং এমবিবিএস, বিডিএস ও ডিভিএম ডিগ্রি অর্জনকারীরা এ সমাবর্তনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। প্রত্যেকটি ক্যাটাগরিতে অংশগ্রহণকারীদের তিন হাজার ৫৭০ টাকা ফি দিয়ে নিবন্ধন করতে হবে বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতরের প্রশাসক অধ্যাপক মশিহুর রহমান।
সমাবর্তনে অংশগ্রহণে আগ্রহী লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী সাজিদ রহমান বলেন, ২০১১-২০১৪ সেশনে মাস্টার্স পাস করা ব্যাচকে হিসাবের আওতায় আনলে ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী পাওয়া যাবে, যারা এখনও বেকার। কেউবা ঢাকায় টিউশনি করে চলছেন আর চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কেউ বাড়ি থেকে খরচ এনে কোচিং করছেন, কেউ পার্ট টাইম চাকরি করে নিজের খরচটা কষ্ট করে চালিয়ে নিচ্ছেন, অনেকে আবার বাড়ি ফিরে গেছেন। এখন এই অবস্থায় তাদের পক্ষে তিন হাজার ৫৭০ টাকা ফি দিয়ে নিবন্ধন, তারপর রাজশাহীতে যাওয়া-আসা, থাকা-খাওয়ার খরচ জোগাড় করে কাঙ্ক্ষিত সমাবর্তনে অংশ নেওয়া কতজনের পক্ষে সম্ভব হবে?’
২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের আইন বিভাগের নওরিন রহমান বলেন, ‘রাবির একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের মাস্টার্স পাস করা শিক্ষার্থী যে এখনও বাড়ি থেকে টাকা এনে বা টিউশনি করে চাকরির খোঁজে ঢাকায় মেসে বা হোস্টেলে থাকছে তার মাসিক খরচ কত, তা আমরা মোটামুটি ধারণা রাখি। এই সমাবর্তনের সামগ্রিক খরচ বহন করতে গেলে তার সারা মাস কি অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে, তা আমাদের সবারই জানা।’
২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সুমাইয়া নকশি বলেন, ‘সমাবর্তন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য কাঙ্ক্ষিত বিষয়। সবাই সমাবর্তনে অংশগ্রহণের জন্য মুখিয়ে থাকে। কিন্তু ঢাবি, জাবি ও চবির তুলনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় যদি দুই হাজার টাকায় সমাবর্তন করতে পারে তাহলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় কেন পারবে না?’
বাংলাদেশের চারটি স্বায়ত্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের নিবন্ধন ফি তুলনা করলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধন প্রায় দ্বিগুণ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধুমাত্র স্নাতকোত্তর ক্যাটাগরিতে সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। আর এই একটি ক্যাটারিতে তিন হাজার ৫৭০ টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৯তম সমাবর্তন ২০১৫ সালের ১৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর দুই ক্যাটাগরিতে সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। প্রত্যেক ক্যাটাগরিতে নিবন্ধন ফি ছিল দুই হাজার টাকা।
এদিকে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫ম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। এতে স্নাতক ক্যাটাগরিতে অংশগ্রহণকারীদের জন্য এক হাজার ৫০০ টাকা, স্নাতকোত্তর ক্যাটাগরিতে এক হাজার ৫০০ টাকা, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর যৌথ ক্যাটাগরিতে দুই হাজার ৫০০ টাকা নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৬ সালের ৩১ জানুয়ারি। এতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় ক্যাটাগরিতে দুই হাজার টাকা নিবন্ধন ফি নির্ধারিত ছিল।
জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় তো গাউন দেয় না। কিন্তু আমরা গাউন দিচ্ছি। তাই অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় বললেতো হবে না। দেখতে হবে যে, কার ফ্যাসিলিটি কেমন থাকছে। বেকার আর সকার বলে তো সমাবর্তন হয় না, সমাবর্তন হয় ছাত্রদের। এর আগে নবম সমাবর্তনেও একই ফি ছিল। এটা কমানোর সুযোগ নেই।’
/বিটি/টিএন/








