পঞ্চগড় জেলা পরিষদ নির্বাচনে টাকা নিয়ে ভোট না দেওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রার্থীরা

পঞ্চগড় প্রতিনিধি
০৪ জানুয়ারি ২০১৭, ০৮:০০আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০১৭, ০৮:০৪

পঞ্চগড়ে ভোটের টাকা ফেরত নিচ্ছেন একজন প্রার্থী পঞ্চগড় জেলা পরিষদ নির্বাচনে টাকার বিনিময়ে ভোট কেনাবেচা হয়েছে। বিজয়ী প্রার্থীরা খুশি হলেও পরাজিত প্রার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তারা অভিযোগ করছেন, টাকা নিয়েও অনেক ভোটার ভোট দেননি তাদের। তাই এখন টাকা ফেরত নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন ভোটারদের। টাকা ফেরত পেতে দেওয়া হচ্ছে হুমকিও। অনেক প্রার্থী এরই মধ্যে ভোটের জন্য দেওয়া টাকা ফেরত নিয়েছেন ভোটারদের কাছ থেকে। অনেক ভোটারও টাকা ফেরত দিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন। টাকা ফেরত নেওয়ার এমন ছবি ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকে। তা নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। প্রার্থী ও ভোটাররা এভাবে টাকার বিনিময়ে ভোট আদান-প্রদান করে নির্বাচনি আচরণ বিধি লঙ্ঘন করেছেন বলে সমালোচনা করছেন সচেতন মহল।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, পঞ্চগড় জেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবু বকর ছিদ্দিক এবং জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট মির্জা সারওয়ার হোসেনের নেতাকর্মী ও সমর্থকরাসহ পরাজিত সদস্য প্রার্থীদের সমর্থকরা টাকা ফেরত পেতে ভোটারদের চাপ ও হুমকি দিচ্ছেন।
নির্বাচনের ফলাফলের পর জেলার সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়ন পরিষদে পরাজিত এক চেয়ারম্যান প্রার্থী ভোটারদেরকে দেওয়া ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করছেন। আরেক পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থী দেবীগঞ্জ উপজেলার সুন্দরদিঘী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পরেশ চন্দ্র বাবুর বাসায় ভোটারদের সঙ্গে বৈঠক করে টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন তিনি। এ নিয়ে দুই সদস্যের মধ্যে হাতাহাতি হয়। সুন্দরদিঘী ইউনিয়ন পরিষদে তালাও লাগিয়ে দেওয়া হয়। কয়েকজন প্রার্থী দেবীগঞ্জ ও বোদা উপজেলায় টাকা নেওয়া ভোটারদের বাসায় এসে টাকা ফেরত দিতে চাপ দিয়েছেন। এছাড়া, জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দও ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন এবং প্রার্থীদের টাকা ফেরত দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
হানা গেছে, জেলা পরিষদ নির্বাচনে একজন সদস্য প্রার্থী ভোট নিতে সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়নের ১২ জন সদস্যকে টাকা দিয়েছেন। কিন্তু টাকা নিয়ে একজন সদস্য ভোট দিলেও অন্য ১১ জন সদস্য ভোট না দেওয়ায় তাদেরকে বেঈমান আখ্যায়িত করে টাকা ফেরত নেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছেন। এরই প্রেক্ষিতে চাকলাহাট ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের সদস্য জমিরউদ্দিন দুলাল ওই প্রার্থীর পক্ষের এক ব্যক্তিকে টাকা ফেরত দিয়েছেন। জনসম্মুখে টাকা ফেরত দেওয়ার ছবি ফেসবুকে প্রকাশ করা হয়েছে।
জেলা পরিষদ নির্বাচনের শুরু থেকেই ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত টাকার বিনিময়ে ভোট আদান প্রদানের গুঞ্জন চলছিল। ফলাফল ঘোষণার পর ফেসবুকে প্রকাশিত বিভিন্ন ছবি ও পোস্টে তার প্রমাণ উঠে আসে। তাতে দেখা যায়, ভোট নিতে প্রার্থীরা যেমন টাকা বিতরণ করেছেন, তেমনি দলমত নির্বিশেষে ভোটাররাও একাধিক প্রার্থীর কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। কোনও কোনও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা সম্মিলিতভাবে টাকা গ্রহণ করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বোদা উপজেলার নাশের মণ্ডল হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের এক প্রার্থী কোনও ভোট পাননি। এই তিন ইউনিয়নে ওই প্রার্থী প্রায় ৩ লাখ টাকা দিয়েছিলেন ভোটারদের। সদর উপজেলার রজলী খালপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে (গরিণাবাড়ি, মাগুড়া ও ধাক্কামারা ইউনিয়ন) একই দলের আরেক প্রার্থীর ফলাফলও একই। তিনিও প্রায় সমপরিমাণ টাকা ভোটারদের দিয়েছিলেন।
সদর উপজেলার চাকলাহাট, হাড়িভাসা ও কামাত কাজলদীঘি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত সাধারণ ৫নং ওয়ার্ডের সদস্য প্রার্থী আব্দুল কুদ্দুস প্রামাণিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভোটারদের সন্তুষ্ট রাখতে ৩৯ জন ভোটারের মধ্যে ২৫ জনকে ২০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। আমার প্রতিদ্বন্দ্বী এক প্রার্থী ভোটারদের এর কয়েকগুণ টাকা দিয়েছিলেন। আমি মাত্র একটি ভোট পেয়েছি।’ বিষয়টি জানতে পেরে তার সমর্থকরা চাকলাহাটের একজন ভোটারের কাছ থেকে টাকা ফেরত নিয়ে তাকে দিয়েছেন বলে জানান কুদ্দুস প্রামাণিক।
চাকলাহাট ইউপি সদস্য জমিরউদ্দিন দুলা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভোটের আগের দিন আমাকে কুদ্দুস ভাই টাকা দেন। কিন্তু আমি তাকে ভোট দেইনি। এজন্য টাকা ফেরত দিয়েছি।’
কয়েকজন প্রার্থী জানান, নির্বাচিত হতে যে কটি ভোট প্রয়োজন তার দ্বিগুণ ভোটারকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করতে হয়েছে। টাকা নেওয়ার পরও অনেকে ভোট দেননি।
আওয়ামী লীগের এক বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থক সফিয়ার রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বেশকিছু ভোটার এরই মধ্যে টাকা ফেরত দিয়েছেন। অনেকে সময় নিয়েছেন। টাকা ফেরতে পেতে নানা প্রক্রিয়া অব্যহত আছে।’
পঞ্চগড় পৌরসভার প্যানেল মেয়র আশরাফুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভোটের যে চিত্র প্রকাশ হয়েছে তাতে জনপ্রতিনিধিদের মান-সম্মান বলে আর কিছু থাকল না।’ এজন্য প্রার্থীরাও দায়ী বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নির্বাচনে জয়ী আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের স্থগিত কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি আমানুল্লাহ বাচ্চু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘টাকা দিয়ে ভোট কিনিনি। দীর্ঘদিন ধরে ইউপি চেয়ারম্যান থাকায় তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো। আমি ভোটারদের ভালোবাসা পেয়েই জয়ী হয়েছি।’
জেলা প্রশাসক ও নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা অমল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, ‘টাকা দিয়ে ভোট কেনাবেচার কোনও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কেউ করেনি। এজন্য এ বিষয়ে কোনও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। প্রমাণ সাপেক্ষে কেউ অভিযোগ করলে আইন অনুযায়ী যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

/টিআর/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম