নীলফামারীতে ৮ম খ্রিস্টাব্দের রাজা বিরাটের বিন্নাদিঘীর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন উদ্ধারের কাজ শুরু হয়েছে। একইদিনে জেলার জলঢাকা উপজেলায় আবিষ্কৃত হয়েছে ৪২ গম্বুজের একটি সুলতানি আমলের মসজিদ।
বৃহস্পতিবার (২ফেব্রুয়ারি) বিকেলে জেলা সদরের গোড়গ্রাম ইউনিয়নে বিন্নাদিঘীর প্রত্নতাত্ত্বিক খননের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেন, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আমাদের সংস্কৃতির অংশ। সরকার এসব নিদর্শন রক্ষায় কাজ করছে। দেশের যেসব স্থানে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া যাবে, সেখানে একটি করে প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর নির্মাণ করা হবে। ঐতিহাসিক নিদর্শন হওয়ায় নীলফামারীর বিন্নাদিঘী এলাকায় (নীলসাগর) প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নীলফামারীসহ আশপাশের জেলার যেসব স্থানে এমন নির্দশন আছে পর্যায়ক্রমে খনন করে তা উদ্ধারের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
সাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদফতরের উদ্যোগে ওই খনন কাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসময় উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইব্রাহীম হোসেন খান, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মহা পরিচালক আলতাফ হোসেন, জেলা প্রশাসক জাকীর হোসেন, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মুজিবুর রহমান, প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের রাজশাহী বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দেওয়ান কামাল আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক মমতাজুল হক প্রমুখ।
কথিত আছে, ৮ম খ্রিস্টাব্দে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পরাজিত পাণ্ডবদের পানি পানের জন্য রাজা বিরাট তার রাজ্যের গোরগ্রাম ইউনিয়নে ওই দিঘীটি খনন করেন। দিঘীর আয়তন ৫৩ দশমিক ৯০ একর। গভীরতা ২৮ ফুট থেকে ৩২ ফুট পর্যন্ত। ১৯৮৩ সালে ওই দিঘীর নামকরণ করা হয় নীলসাগর। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত দিঘীটি সংস্কারের মাধ্যমে দৃষ্টিনন্দন করে গড়ে তোলা হয়। বর্তমানে সেখানে বসে প্রতিবছর হিন্দু ধর্মের অনুসারীদের পূণ্য স্নানমেলা। পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলায় সেখানে প্রতিবছরের শীত মৌসুমে অতিথি পাখিরাও আসে।
এদিকে একইদিনে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের যৌথ অনুসন্ধানে মাটির নিচ হতে বেরিয়ে এলো সুলতানী আমলের ধ্বংসপ্রাপ্ত ৩০টি পিলারের ওপর ৪২ গম্বুজের মসজিদের নকশার নির্দশন। এটি পাওয়া যায় জেলা সদর থেকে উত্তরে ২৫ কিলোমিটার অদূরে জলঢাকা উপজেলার ধর্মপাল ইউনিয়নের সতিষের ডাঙ্গা গ্রামে। শুধু মসজিদ নয় সেই সঙ্গে এখানে উদ্ধার করা হয়েছে ১৫০০ বছরের আগের শিলাপাথরের বদনা, পানির পাত্র ও বড় বড় শিলাপাথর এবং পাট কুয়া।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাড়ে ১১টায় স্থানটি পরিদর্শন করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইব্রাহিম হোসেন খান ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের ডিজি আলতাব হোসেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের আঞ্চলিক অফিসের সহকারী পরিচালক নাহিদ সুলতানা।
সুলতানী আমলের মসজিদটি আবিষ্কারকারী দলটির প্রধান নওগাঁ পাহাড়পুর যাদু ঘরের ইনচার্জ ছাদেককুজ্জামান। তিনি বলেন, বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদের পর একইরকম আকৃতির মসজিদ পাওয়া গেল নীলফামারীতে। এটি ৩০টি পিলারের ওপরে স্থাপিত ৪২ গম্বুজের মসজিদ। গঠনগত ঐক্যের কারণে এ মসজিদটিকেও সুলতানী আমলের বলে ধারনা করা হয়েছে। এটির দৈর্ঘ্য ২৪.৭৬ মিটার ও প্রস্থ ২০.৫৭ মিটার। মসজিদটির চারদিকে দেয়াল ছিল। ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদটির সবকিছুই আজ বিলীন। তবে এখনও রক্ষিত রয়েছে পাটকুয়া, শিলাপাথরের বদনা, পানিপানের পাত্রসহ বিভিন্ন নির্দশন।
তিনি বলেন, খননকারীরা যতই লালমাটির গভীরে যাচ্ছেন, ততই বেরিয়ে আসছে একের পর এক ইটের তৈরি নকশায় অলঙ্কৃত নিদর্শন, দেয়ালের বাইরে হাতে কাটা ইটের জালি নকশা ও বিভিন্ন স্থাপনা। গত বছরের ১৫ নভেম্বর থেকে এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক সন্ধান চালিয়ে এসবের দেখা মিললো।
এসব বিষয় নিয়ে এক গবেষণামূলক সেমিনার বিকাল সাড়ে ৫টায় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয় ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের যৌথ আয়োজনে নীলফামারী জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক জাকীর হোসেনের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর।
/টিএন/








