বরিশালের গৌরনদী উপজেলার নোয়াপাড়া গ্রামের রাজাকার কমান্ডার আদম আলী মাস্টারের নাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্ত না করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা। গৌরনদী উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ এমপির কাছে এ দাবি জানান তারা। এছাড়া আদম আলী মাস্টারের যুদ্ধাপরাধ তদন্ত করতে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ করেছেন গৌরনদী উপজেলার শরিকল এলাকার মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আলাউদ্দিন আহম্মেদের ছেলে নাজিম উদ্দিন টিপু।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের বসতঘরপুড়িয়ে দিয়েছিল রাজাকার কমান্ডার আদম আলী মাস্টার। তবে এসব অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দাবি করেছেন আদম আলী মাস্টার। তিনি মুঠোফোনে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আত্মরক্ষার জন্য রাজাকারের খাতায় নাম দিয়ে আমি ১২ দিন তাদের সঙ্গে ছিলাম। এরপর ৩৬ জন রাজাকারকে নিয়ে আমি নিজাম বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। তাই আমি একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। আমার কাছে ওসমানী ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নিজামের পৃথক ২টি সনদ আছে। আমার নাম তালিকাভুক্ত না করতে প্রতিপক্ষের লোকজন এ ধরণের কুৎসা রটাচ্ছে।’
এ বিষয়ে গৌরনদী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সৈয়দ মনিরুল ইসলাম বুলেট সেন্টু বলেন, ‘আদম আলী মাস্টারের নাম গেজেটভুক্ত হওয়ার প্রশ্নই ওঠেনা। তিনি আবেদন করতে পারেন কিন্তু আমরা কুখ্যাত এ রাজাকার, খুনি, লুটেরাকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে দেবনা।’
জানা গেছে, গত ৪ ফেব্রুয়ারি গৌরনদীতে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কার্যক্রম শুরু হয়। রাজাকার কমান্ডার আদম আলী মাস্টার মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। তার আবেদন নম্বর-৫২৯ ও ডিজিআই নম্বর-২০৫২৮০। আদম আলী মাস্টার, মাহিলাড়ার খাদেম মিলিটারি, বাটাজোরের তোতা মিয়ার বিরুদ্ধে গণহত্যা, নারী ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ রয়েছে।
আরও জানা গেছে, ওই সময়ে ৭২ জন রাজাকার নিয়ে গঠিত এলাকার রাজাকার বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন আদম আলী মাস্টার। তার সেকেন্ড ইনকমান্ড ছিলেন মাহিলাড়া গ্রামের খাদেম মিলিটারি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটসহ নানা দুষ্কর্মের অভিযোগে মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষুব্ধ হয়ে রাজাকার খাদেম মিলিটারিসহ তার পরিবারের ১৩ জন সদস্যকে একই সঙ্গে হত্যা করে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আদম আলীর বিরুদ্ধে স্থানীয় থানায় মামলা হয়। ওই সময় তিনি এলাকা ছেড়ে আত্মগোপন করলেও ১৯৭৫ সালে বঙ্গব্ন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর তিনি এলাকায় ফিরে আসেন। তবে আদম আলীর দুষ্কর্ম এলাকার লোকজনের জানা থাকলেও তার বিরুদ্ধে আজও মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না অনেকেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চন্দ্রহার গ্রামের কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ৭১ সালের ১৩ আশ্বিন চন্দ্রহার গ্রামের নেপাল হালদার, রাম সেনের ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা কন্যা সীমা রানী সেন, রুহিনী ঠাকুর, ব্রমা ঠাকুর, সুশীল চন্দ্র হালদার, হীরা লাল হালদারের ১০ বছরের ছেয়ে কালাচান, রাধাকান্ত মাঝির ১৩ বছরের ছেলে কমল মাঝি ও ১১ বছরের ছেলে সুভাষ মাঝিসহ ওই গ্রামের ১১ জনকে গুলি করে হত্যা করে রাজাকার কমান্ডার আদম আলী ও তার দোষর পাকসেনারা। ধারালো অস্ত্রদিয়ে সীমা রানী সেনের পেট কেটে সন্তান বের করে এনে সেদিন উল্লাস করেছিল নরপশুরা।’
ঘেয়াঘাট গ্রামের গনক বাড়ির কেষ্ট চক্রবর্তীর স্ত্রী সবিতা রানী (৬৫) জানান, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন ভাদ্র মাসের শেষের দিকে রাজাকার কমান্ডার আদম আলী ও তার সহযোগীরা আমাদের বাড়িতে হানা দেয়। এ সময় তারা আমার স্বামী কেষ্ট চক্রবর্তী, দেবর বলাই চক্রবর্তী, একই বাড়ির নারায়ন চক্রবর্তী, কালাচান চক্রবর্তী, মানিক চক্রবর্তীকে জবাই করে ও গুলি করে হত্যা করে।’
বাটাজোরের সিংগা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বারেক ফকির, দেওপাড়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা বিমল চন্দ্র দাশ জানান, ‘৭১ সালের ১৫ মে পাকসেনাদের আসার খবর পেয়ে বাটাজোরের হরহর গ্রামের বাড়ৈ বাড়ির মরার ভিটায় (স্বাধীনতা পরবর্তি সময়ে নামকরণ করা হয়) প্রাণ বাচঁতে বিভিন্ন এলাকার শতশত হিন্দু সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ ও শিশুরা আশ্রয় নিয়েছিল। সকাল ১১ টার দিকে আদম আলী পাকসেনাদের নিয়ে ওই স্থানে হানা দেয়। পাকসেনাদের এলোপাথারী গুলিতে সেদিন ১৩৫ জন নিরাপরাধ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।’
/এসএনএইচ/








