নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার রামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য হয় ২০১৩ সালের নভেম্বরে। এরপর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পান সহকারী শিক্ষক রাজিয়া সুলতানা। কিন্তু তার পক্ষে স্কুলে পাঠদানের পাশাপাশি দাপ্তরিক কাজ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ায় কিছুদিন পরই সেই দায়িত্ব ছেড়ে দেন। এরপর থেকেই এই দায়িত্ব পালন করে আসছেন আরেক সহকারী শিক্ষক প্রশান্ত কুমার। বর্তমানে ওই বিদ্যালয়ে ছয়জন শিক্ষক পদের জায়গায় শিক্ষক আছেন তিনজন।
শুধু রামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নয়; জেলার ১১টি উপজেলার ২৯৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এতে এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক শৃঙ্খলাও ভেঙে পড়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১১টি উপজেলায় ১ হাজার ২১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে (রাজস্বখাত ও জাতীয়করণ ঘোষিত মিলে) শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে ৯৯৮টি। এর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ২৯৩টি বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। আর সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে ৭০৫টি।
নিয়ামতপুর, পোরশা, মহাদেবপুর ও সদর উপজেলার বেশ কিছু বিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রধান শিক্ষকবিহীন বিদ্যালয়গুলোতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী শিক্ষকরা। এসব ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকায় বেশিরভাগ সময় তাদের পক্ষে দুয়েকটির বেশি বিষয়ে পাঠদান করা সম্ভব হয়ে উঠে না। এতে বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
বেশ কয়েকজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জানান, প্রধান শিক্ষকের অতিরিক্ত দায়িত্ব তাদের কাছে বাড়তি বোঝা। তাদেরকে দাপ্তরিক কাজ ও পাঠদান একসঙ্গে চালাতে হয়। তাদের অভিযোগ, প্রায় প্রতি সপ্তাহে দাপ্তরিক প্রয়োজনে উপজেলা পর্যায়ে সভায় যোগ দিতে ছোটাছুটি করতে হয়। অথচ অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য সরকারিভাবে কোনও পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না।
নিয়ামতপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে আরও জানা গেছে, এই উপজেলায় ১২৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৯৫টি শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে ২৯টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। আর সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য আছে ৬৬টি।
নিয়ামতপুর উপজেলার পানিহারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক ইসমাইল হোসেন ২০১৪ সাল থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জানান, তার বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৯৬জন। মাত্র চারজন শিক্ষক তাদের দুই শিফটে পাঠদান করান। অথচ বিদ্যালয়টিতে শিক্ষকের অনুমোদিত পদ সংখ্যা ৭। এর মধ্যে আবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করায় তাকে প্রায় সময়ই দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়।
ওই উপজেলার রামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক প্রশান্ত কুমার বলেন, অভিজ্ঞতা না থাকায় দাপ্তরিক কাজে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। পাঠদানের পাশাপাশি এই অতিরিক্ত দায়িত্বকে বাড়তি বোঝা মনে হয়।
মহাদেবপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ১৩২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৪টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। আর সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে ৯১টি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা একেএম আমীরুল ইসলাম বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের ৬৫ শতাংশ পদে পদোন্নতি এবং ৩৫ শতাংশ নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে পূরণ হওয়ার কথা। তবে দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা পাওয়ায় এখন থেকে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ হবে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে। নতুন পদ্ধতিতে নিয়োগ দিতে একটু সময় লাগছে। এ বছরের মধ্যেই শূন্য পদগুলোতে নিয়োগ দেওয়া হবে।’
সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘রিট নিয়ে হাইকোর্টের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে গত ডিসেম্বরে ১২৮জন পুল শিক্ষককে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্যানেলে থাকা আরও ২৭৫জনকে আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।’
/এমএ/








