হরকাতুল জিহাদ (হুজি) নেতা মুফতি হান্নানের সহযোগী জঙ্গি শরীফ সাহেদুল বিপুলের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোর ৪টা ৪০ মিনিটে পুলিশের উপস্থিতিতে পারিবারিক কবরস্থানে বিপুলকে দাফন করা হয়। এর আগে তার জানাজা পড়ান স্থানীয় ইমাম হেলাল উদ্দিন। ডিবি পুলিশের এসআই মোতাহের ও চাঁদপুর পুলিশের ডিআইও-ওয়ান নূরুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
ডিবি পুলিশের এসআই মোতাহের জানান, জঙ্গি বিপুরের লাশ ভোর ৪টা ২০ মিনিটে তার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের মৈশাদী ইউনিয়নের পাটওয়ারী বাড়িতে এসে পৌঁছে। এ সময় লাশ গ্রহণ করেন বিপুলের বাবা হেমায়েত উদ্দিন পাটওয়ারী।
চাঁদপুর পুলিশের ডিআইও ওয়ান নূরুজ্জামান জানান, জঙ্গি বিপুলের লাশ আসার পর জানাজা শেষে ৪টা ৪০ মিনিটে পুলিশের উপস্থিতিতে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। জানাজা পড়ান স্থানীয় ইমাম হেলাল উদ্দিন।
জানাজায় অংশ নেন আত্মীয়স্বজন, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন লোক।
পুলিশের কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে দাফনের সময় উপস্থিত ছিলেন চাঁদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আফজাল হোসেন, চাঁদপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওয়ালি উল্যা ওলি, ডিআইও ওয়ান নূরুজ্জামান, স্থানীয় চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মানিক।
এর আগে বুধবার রাত ১০টায় ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার মামলায় মুফতি হান্নানসহ তার সহযোগী শরীফ শাহেদুল আলম ওরফে বিপুলের ফাঁসি কার্যকর করা হয় গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে। কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে রাত বারোটার পর দু’টি অ্যাম্বুলেন্সযোগে তাদের লাশ কাশিমপুর কারাগার থেকে বের করা হয়। এর মধ্যে মুফতি হান্নানের লাশ নিয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্স গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া এবং বিপুলের লাশ নিয়ে অন্য অ্যাম্বুলেন্স চাঁদপুরের মৈশাদী গ্রামের উদ্দেশে রওয়ানা হয়।
এর আগে হরকাতুল জিহাদ (হুজি) নেতা মুফতি হান্নানের সহযোগী শরীফ শাহেদুল বিপুলের মরদেহ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান তার বাবা হেমায়েত হোসেন পাটওয়ারী। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিপুলের ফাঁসির বিষয়টি অবহিত করে লাশ প্রহণ করার কথা বলা হলে তিনি জঙ্গি ছেলের লাশ নেবেন না এবং এমনকি লাশ দেখবেনও না বলে জানান। প্রশাসনের নির্দেশে স্থানীয় ইউপির ব্যবস্থাপনায় বিপুলের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের মৈশাদী ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের পাটওয়ারী বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানেই তার দাফনের জন্য কবর খোঁড়া হয়। তবে বাড়িতে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স আসার পর জঙ্গি বিপুলের বাবাই তা গ্রহণ করেন।
উল্লেখ্য, সিলেটে হযরত শাহজালাল (র.)- এর মাজার প্রাঙ্গণে ২০০৪ সালের ২১ মে বাংলাদেশে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপরে গ্রেনেড হামলা করে হরকাতুল জিহাদের জঙ্গিরা। এ ঘটনায় আনোয়ার চৌধুরীসহ ৭৬ জন আহত হন। ঘটনাস্থলেই পুলিশের এএসআই কামাল উদ্দিন নিহত হন। পরে পুলিশ কনস্টেবল রুবেল আহমেদ ও হাবিল মিয়া নামে আরেক ব্যক্তি হাসপাতালে মারা যান।
পুলিশ ওই দিনই সিলেট কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করে। ২০০৭ সালের ৭ জুন হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান, তার ভাই মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে মফিজ ওরফে অভি, শরীফ শাহেদুল আলম ওরফে বিপুল ও দেলোয়ার ওরফে রিপনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
মামলায় ৫৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ২০০৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক সামীম মো. আফজাল রায় ঘোষণা করেন। আসামিদের মধ্যে মুফতি হান্নান, বিপুল ও রিপনকে মৃত্যুদণ্ড এবং মহিবুল্লাহ ও আবু জান্দালকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেন হান্নান ও বিপুল। আর রিপনের পক্ষে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আইনজীবী নিয়োগ করা হয়। শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত রায়েও ওই তিন আসামির সর্বোচ্চ সাজার সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। গত বছরের ৭ ডিসেম্বর মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে ওই তিন জঙ্গির আপিল শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বাধীন চার বিচারকের আপিল বিভাগ খারিজ করে দেন। চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি মুফতি হান্নানসহ তিনজনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখে আপিল বিভাগের দেওয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।
ওই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষের আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের আবেদন) শুনানি শেষে চলতি বছরের ১১ ফেব্র“য়ারি রায় দেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি আমির হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ। তাতে আসামিদের আপিল খারিজ হয়ে যায়। ফলে মুফতি হান্নানসহ তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং দু’জনের যাবজ্জীবন দণ্ড বহাল থাকে।
এরপর রায় পুনর্বিবেচনার আপিলও খারিজ হয়ে গেলে গত ২১ মার্চ তাদের মৃত্যু পরোয়ানা কারাগারে পাঠানো হয়। সবশেষে ছিল কেবল রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা। সেটিও ১০ এপ্রিল প্রত্যাখ্যাত হলে কারাবিধি অনুযায়ী দণ্ড কার্যকর করা হয়।
আরও পড়ুন: মুফতি হান্নানসহ তিন জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর
/এমএনএইচ/








