প্রশাসনের নির্দেশনায় রাতভর বোঝানোর পর হরকাতুল জিহাদ (হুজি) নেতা মুফতি হান্নানের সহযোগী শরীফ সাহেদুল বিপুলের মরদেহ শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করেন তার বাবা হেমায়েত হোসেন পাটওয়ারী। লাশ দাফনও করা হয় তার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের মৈশাদী ইউনিয়নের পাটওয়ারী বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে।
জানা গেছে, জঙ্গি বিপুলের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার দু’দিন আগ থেকে কারা কর্তৃপক্ষ তার বাবার সঙ্গে লাশ গ্রহণ ও দাফন বিষয়ে যোগাযোগ করে। কিন্তু সে সময় লাশ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান হেমায়েত হোসেন।
এ বিষয়ে সদর উপজেলার মৈশাদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মানিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জঙ্গি বিপুলের বাবা ছেলেকে দেখতে যাননি, ফাঁসির পর লাশও গ্রহণ করতে রাজি হননি। পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাকে বিষয়টি সুরাহা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিপুলের বাবা অবসরপ্রাপ্ত মানুষ। তাকে গাইডলাইন দেওয়ার মতোও কেউ নেই। ছেলের জন্য প্রথম থেকেই তিনি ‘আপসেট’ ছিলেন। ছেলের বিপথগামী হওয়াকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেননি তিনি। তবে দায়িত্ব পাওয়ার পর বিপুলের বাবার সঙ্গে আমি কথা বলি এবং তাকে লাশ গ্রহণের জন্য বোঝানোর চেষ্টা করি। তবে প্রথমে তিনি লাশ নিতে রাজি হননি। পরে তাকে বললাম, ‘আপনি লাশ দেইখেন না, লাশ রিসিভ করারও দরকার নেই। আমরাই সব করবো। যেহেতু আপনার সন্তানের লাশ আসতেছে আপনি শুধু আমাদেরকে তার কবর করার জায়গাটা দেখিয়ে দেন।’
মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এভাবে অনেক বোঝানোর পর তিনি লাশ গ্রহণ করতে রাজি হন এবং নিজে গিয়েই কবরের জায়গা নির্ধারণ করে দেন। সঙ্গে সঙ্গেই আমরা কবর খোঁড়ার কাজ শুরু করি এবং তাকে বুঝিয়ে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করি। এক পর্যায়ে লাশ আসার পর তিনি তা দেখেন এবং নিজের ইচ্ছাতেই কাগজে সই করে লাশ রিসিভ করেন।’
পুলিশ জানায়, প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিপুলের ফাঁসির বিষয়টি পরিবারকে অবহিত করে লাশ প্রহণের কথা বলা হয়। তবে জঙ্গি ছেলের লাশ নেবেন না এবং এমনকি লাশ দেখবেনও না বলে জানান হেমায়েত হোসেন। তবে প্রশাসনের নির্দেশে স্থানীয় ইউপির ব্যবস্থাপনায় বিপুলের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের মৈশাদী ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের পাটওয়ারী বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানেই তার দাফন করা হয়।
বৃহস্পতিবার ভোর ৪টা ২০ মিনিটে জঙ্গি বিপুলের লাশ গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের মৈশাদী ইউনিয়নের পাটওয়ারী বাড়িতে এসে পৌঁছায়। পরে জানাজা শেষে ৪টা ৪০ মিনিটে পুলিশের উপস্থিতিতে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। জানাজা পড়ান স্থানীয় ইমাম হেলাল উদ্দিন। পুলিশের কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে দাফনের সময় উপস্থিত ছিলেন চাঁদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আফজাল হোসেন, চাঁদপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওয়ালিউল্লা ওলি, ডিআইও ওয়ান নূরুজ্জামান, স্থানীয় চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মানিক প্রমুখ।
উল্লেখ্য, সিলেটে হযরত শাহজালাল (র.)- এর মাজার প্রাঙ্গণে ২০০৪ সালের ২১ মে বাংলাদেশে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপরে গ্রেনেড হামলা করে হরকাতুল জিহাদের জঙ্গিরা। এ ঘটনায় আনোয়ার চৌধুরীসহ ৭৬ জন আহত হন। ঘটনাস্থলেই পুলিশের এএসআই কামাল উদ্দিন নিহত হন। পরে পুলিশ কনস্টেবল রুবেল আহমেদ ও হাবিল মিয়া নামে আরেক ব্যক্তি হাসপাতালে মারা যান। পুলিশ ওই দিনই সিলেট কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করে। ২০০৭ সালের ৭ জুন হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান, তার ভাই মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে মফিজ ওরফে অভি, শরীফ শাহেদুল আলম ওরফে বিপুল ও দেলোয়ার ওরফে রিপনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। মামলায় ৫৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ২০০৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক সামীম মো. আফজাল রায় ঘোষণা করেন। আসামিদের মধ্যে মুফতি হান্নান, বিপুল ও রিপনকে মৃত্যুদণ্ড এবং মহিবুল্লাহ ও আবু জান্দালকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেন হান্নান ও বিপুল। আর রিপনের পক্ষে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আইনজীবী নিয়োগ করা হয়। শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত রায়েও ওই তিন আসামির সর্বোচ্চ সাজার সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। গত বছরের ৭ ডিসেম্বর মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে ওই তিন জঙ্গির আপিল শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বাধীন চার বিচারকের আপিল বিভাগ খারিজ করে দেন। চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি মুফতি হান্নানসহ তিনজনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখে আপিল বিভাগের দেওয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।
ওই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষের আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের আবেদন) শুনানি শেষে চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি রায় দেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি আমির হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ। তাতে আসামিদের আপিল খারিজ হয়ে যায়। ফলে মুফতি হান্নানসহ তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং দু’জনের যাবজ্জীবন দণ্ড বহাল থাকে। এরপর রায় পুনর্বিবেচনার আপিলও খারিজ হয়ে গেলে গত ২১ মার্চ তাদের মৃত্যু পরোয়ানা কারাগারে পাঠানো হয়। সবশেষে ছিল কেবল রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা। সেটিও ১০ এপ্রিল প্রত্যাখ্যাত হলে কারাবিধি অনুযায়ী দণ্ড কার্যকর করা হয়।
/এসএনএইচ/








