সিরাজগঞ্জে চিকিৎসক ও নার্সকে হত্যায় সহযোগীতাকারী দুই আসামি কাজিপুরের কবিরাজ আশরাফ আলী শেখ ওরফে আছাব আলী (৬৫) ও সহযোগী তমছের আলী (৩৫) আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মঙ্গলবার বিকেলে সিরাজগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক নজরুল ইসলাম ১৬৪ ধারায় তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। ডিবি পুলিশের ওসি ওয়াহেদুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে তমছের আলীর আত্মীয় কাজিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চাকরিচ্যুত আয়া মনোয়ারা ওরফে চায়না খাতুনকে মঙ্গলবার দুপুরে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাকে আদালতে হাজির করার পর দু’দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। এ হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি কাজিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আয়া লাকী খাতুনকে পুলিশ গ্রেফতারের পর রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। রিমান্ড শেষে গত শনিবার তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। বর্তমানে লাকী জেলা কারাগারে আছেন।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টায় পুলিশ সুপার কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, ‘হত্যার রহস্য বা উদ্দেশ্য অনেকটাই উন্মোচিত হয়েছে। কাজিপুর উপজেলা হাসপাতালের আউট সোর্সিং আয়া লাকীর সঙ্গে চিকিৎসক মনিরুজ্জামান দুর্ব্যবহার ও দীর্ঘ সময় ডিউটি করাতেন। এছাড়া চাকরিচ্যুত করার ভয় দেখিয়ে তার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেন। এ কারণে চিকিৎসক মনিরুজ্জামানের জন্য সরবরাহকৃত খাদ্যে বিষ মিশিয়েছিলেন বলে লাকী আদালতে স্বীকার করেছেন।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘কাজিপুরের তমছের আলীর স্ত্রীকেও চাকরি দেওয়ার কথা ছিল। তবে তাকে চাকরি না দিয়ে উপরন্তু তার আত্মীয় মনোয়ারা ওরফে চায়নাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এ ঘটনায় চায়না ও তমছের চিকিৎসক মনিরুজ্জামানের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। তারা এর আগেও বিষ সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু, তখন কবিরাজ বিষ দিতে না পারায় তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। এ হত্যকাণ্ডের সঙ্গে চায়না খাতুনের যোগসাজস আছে কি, না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
এ ব্যাপারে সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. শেখ মো. মনজুর রহমান বলেন, ‘৬ মাস আগে চিকিৎসক মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করে সিভিল সার্জন ও জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন আরেক আয়া চায়না খাতুন।
তিনি আরও জানান, চিকিৎসক মনিরুজ্জামান কাজিপুর হাসপাতালে যোগদানের পর নার্স ও অন্য কর্মচারীদের বেশ কিছু অপরাধ ও অনিয়ম ধরে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেন। যৌন হয়রানি ছাড়াও সহকর্মীদের ওপর বেশি মাত্রায় খবরদারিসহ সম্প্রতি কাজিপুরের বিভিন্ন অবৈধ ক্লিনিকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার বিষয়টি তার মৃত্যুর কারণে হতে পারে বলে আমরা ধারণা করছি। ’
প্রসঙ্গত গত ২৫ এপ্রিল কাজিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উচ্চমান সহকারী আলমগীরের স্ত্রী মমতা বেগমের রান্না করা খাবারের মধ্যে ছিল ভাত, বেগুন ভাজি, কচুর লতির তরকারি, কাঁচা কাঠালের তরকারি ও বোয়াল মাছের তরকারি। লাকী শুধু বোয়াল মাছের তরকারিতে বিষ মিশিয়ে ছিলেন। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা ডা. মনিরুজ্জামানের কক্ষে বসে তিনি ও উচ্চমান সহকারী আলমগীর খাবার খাচ্ছিলেন। এসময় তাদের সঙ্গে যোগ দেন সেবিকা যোবেদা খাতুন। ডায়বেটিক এর রোগী হওয়ায় কোষাধাক্ষ্য আব্দুল হামিদ শুধু কাঁঠালের তরকারি দিয়ে বাড়ি থেকে আনা রুটি খান। খাবার খাওয়ার পর পরই ডা. মনিরুজামান, সেবিকা যোবেদা ও উচ্চমান সহকারী আলমগীর অসুস্থ্য হয়ে পড়লে তাদের শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে (শজিমেক) নেওয়া হয়। রাত ৯টায় সেবিকা যোবেদা, পৌনে ১০টায় চিকিৎসক মনিরুজ্জামান মারা যান। উচ্চমান সহকারী আলমগীর সেখানে চিকিৎসাধীন আছেন। এ ঘটনায় কাজিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন বাদী হয়ে মামলা করেন।
/জেবি/
আরও পড়তে পারেন: রংপুরে ড. ওয়াজেদ মিয়ার মৃত্যুবার্ষিকী পালিত








