গল্প-গুজব, হাসি-ঠাট্টা চলছে, একইসঙ্গে চলছে হাতপাখা তৈরির কাজ। বাড়ির আঙ্গিনায় দলবেঁধে বসে বিশ্রামের সময়ও চলে এ কাজ। যে যখনই সময় পায় বসে পড়ে হাতপাখা তৈরির কাজে। ১০ বছরের শিশু থেকে ৮০ বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত করছেন এ কাজ।
সম্প্রতি গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলা থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিম দিকে অবস্থিত রসুলপুর ইউনিয়নের আরাজি ছান্দিয়াপুর ও জামালপুর ইউনিয়নের বুজরুক রসুলপুর গ্রামে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা যায়। গ্রামটির দুই শতাধিক নারী-পুরুষ হাতপাখা তৈরির কাজ করে সংসার নির্বাহ করে থাকেন। পাখা তৈরির জন্য আশপাশের এলাকার মানুষ এই গ্রাম দুটির নাম দিয়েছেন পাখার গ্রাম।
সরেজমিনে দুই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রত্যেক বাড়ির আঙ্গিনায় পাখা তৈরির কাজ চলছে। কোথাও কোথাও নারী-পুরুষরা একসঙ্গে বসে, কোথাও কোথাও আলাদা আলাদাভাবে বসে সুতা গোছানো, বাঁশ কাটা, চাক তৈরি, সেলাই ও ডিজাইন তৈরির কাজ করছেন। চলছে গল্প-গুজব, হাসি-ঠাট্টা।
আরাজি ছান্দিয়াপুর গ্রামের প্রবীণ আবদুল খালেক বলেন, ‘২০ বছর ধরে দুই গ্রামের নারী-পুরুষরা পাখা তৈরি করে থাকে। প্রথমে অল্প কিছু পরিবার পাখা তৈরি ও বিক্রি শুরু করে। তারা ভালো উপার্জন করায় অন্য পরিবারগুলোও এই কাজ শুরু করে।’
পাখা তৈরির কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুই শতাধিক পরিবারের ৮০ ভাগ মানুষ পাখা তৈরি করেন। প্রতিটি পাখা ২০-২৫ টাকায় বিক্রি করে ৫-৭ টাকা লাভ হয়। তবে বর্তমানে সুতা ও বাঁশের দাম বেড়ে যাওয়ায় লাভ কিছুটা কম হচ্ছে।
আনোয়ার হোসেন ও রহিমা বেগম নামের দুইজন কারিগর জানান, বর্তমানে দুই গ্রাম থেকে প্রতিদিন ৫০০শ’ থেকে এক হাজার পাখা তৈরি করা হয়। এসব পাখা গাইবান্ধা ছাড়াও রংপুর, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে যান।
মিনা বেগম বলেন, ‘প্রতিটি পাখা তৈরিতে ১২ টাকার সুতা, ২ টাকার বাঁশের হাতল, ২ টাকার সুতা মোড়ানোর কাপড় ও পারিশ্রমিকসহ ২০ টাকার মতো খরচ হয়। কিন্তু একটি পাখা বিক্রি করলে লাভ হয় ৫ টাকা থেকে ১৫ টাকা। পাখা বিক্রিবাবদ প্রতিদিন যা আয় হয় তা দিয়ে সংসারের খরচ চলে যায় বলেও জানান তিনি।
মিনা বেগমের মতো আরও বেশ কয়েকজন কারিগর জানান, দেড় যুগ ধরে দুই গ্রামের নারী-পুরুষরা পাখা তৈরি করেন। এর থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে তারা সংসারের খরচ নির্বাহ, ছেলেমেয়েদের বিয়ে দেওয়া, বসতবাড়ি নির্মাণ, গরু-ছাগল কেনা ইত্যাদি কাজ করেন। অনেকে এই পাখা তৈরি করেই স্বাবলম্বী হয়েছেন।
তবে পাখা তৈরির কারিগরদের দাবি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও অল্প সুদে ক্ষুদ্রঋণের সহযোগিতা পেলে ভবিষ্যতে এখানে বড় ধরনের পাখা তৈরির কারখানা করা সম্ভব হবে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) গাইবান্ধা শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক এ কে এম মুশফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুই গ্রামে গিয়েছিলাম। তাদের সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
/এমএ/








