আজ ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস। ১৯৭৫ সালে পদ্মা নদীর ওপর (ভারতীয় অংশের নাম গঙ্গা) তিন কিলোমিটার দীর্ঘ, ৪০ মিটার প্রস্থ ১২৩টি পিলার বিশিষ্ট ১২১ দরজার ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে ভারত। কালক্রমে এ বাঁধ দেশের উত্তরাঞ্চলসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। এ বাঁধ শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জের নয়, উত্তরাঞ্চলের ইতিহাস ঐতিহ্যকে হরণ করেছে। কেড়ে নিয়েছে জীবন-জীবিকার শ্রেষ্ঠ উপকরণ পানি ব্যবহারের ন্যায্য অধিকার।
এ বিষয়ে সাদা মনের মানুষ ডা. আব্দুর রশিদ মাস্টার বলেন, ‘‘১৯৭৬ সালের ১৬ মে মজলুম জননেতা মরহুম মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী শিবগঞ্জ উপজেলার ঐতিহাসিক কানসাট রাজবাড়ী মাঠে এক জনসভায় বলেছিলেন, ‘ফারাক্কা বাঁধ আমাদের জন্য মরণ ফাঁদ’।’’
শিবগঞ্জ উপজেলার সাহাপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক জালাল উদ্দিন বললেন, ‘তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ফারাক্কা বাঁধ উদ্বোধন করেন। আর এর মধ্য দিয়ে আমাদের দুঃখ দিন দিন বাড়ছেই। বাঁধ নির্মাণের পর থেকে পদ্মার ভাঙনে শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা, দুর্লভপুর, পাঁকা, উজিরপুর, সুন্দরপুর, চরবাগডাঙ্গা, আলাতুলি, দেবিনগর, শাজাহানপুর, ইসলামপুরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের অংশ বিশেষ নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। ফলে ভিটেমাটি হারিয়ে লাখ লাখ মানুষ আজ অসহায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফারাক্কা বাঁধের কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হওয়ায় শিবগঞ্জসহ জেলার লাখ লাখ একর জমি মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে কুষ্টিয়া পর্যন্ত।’
সরেজমিনে ওইসব এলাকা ঘুরে জানা গেছে, ফারাক্কার বিরুপ প্রভাবে ধীরে ধীরে মরুকরণের দিকে এগুচ্ছে সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ। বাঁধের কারণে পদ্মা নাব্যতা, যৌবন ও ঐতিহ্য সবই হারিয়েছে। গত ৪২ বছর ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মার তীরবর্তী অঞ্চলে ব্যাপক নদী ভাঙন চলছে। পানিশূন্য হয়েছে এক সময়ের ভয়াল পদ্মা। ফলে জেলার অনেক অঞ্চলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর দিন দিন নিচে নেমে যাওয়ায় চরমভাবে ব্যহত হচ্ছে কৃষি কাজ।
এলাকার কয়েকজন কৃষক জানান, জীবন বাঁচাতে এলাকায় শত শত শ্যালো মেশিন বসিয়ে পানি তুলে পদ্মার তলায় ধান, গম ও সবজিসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল ফলাচ্ছেন কৃষকরা।
ঠুঠাপাড়ার বৃক্ষপ্রেমিক কার্তিক প্রমানিক, হুমায়ন, সাজেদুলসহ কয়েজন বলেন, ‘ফারাক্কার কারণে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার নিশানা পাওয়া যায়না। শুধু আষাঢ়-কার্তিক মাস পর্যন্ত পানি থাকে। বাকি সময় চারিদিকে শুধু ধু ধু বালুচর।’
এক সময়ের জেলে হান্নান জানান, ‘এক সময় এ পদ্মায় আমরা শত শত লোক রুপালী ইলিশ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতাম। এখন পদ্মার সঙ্গে সঙ্গে সে মাছও হারিয়ে গেছে।’
বৃদ্ধ মাঝি হাজী মো. আয়েশ উদ্দিন জানান, ‘আগে ভারতের মেঘাহাট হতে বাংলাদেশের গোদাগাড়ীর লালগোলা পর্যন্ত ৫’শ’-৭’শ’ নৌকায় মালামাল বহন করা হতো। প্রতি নৌকায় ১২/১৫ জন মাঝিমল্লা থাকতো। সে সময় উভয় এলাকার মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন ছিলো। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধের কারণে আজ আমরা সব হারিয়েছি।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রাসরণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মঞ্জুরুল হুদা বলেন, ‘ফারাক্কার কারণে অতিরিক্ত খরাপ্রবণ হয়ে উঠেছে জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। এতে বেশি ক্ষতি হচ্ছে কৃষিখাতের।’
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী বাহার উদ্দিন মৃধা জানান, ‘প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে জেলার ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর গড়ে ৮০/৮৫ ফুট নিচে নেমে যাচ্ছে। বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলের গোমস্তাপুর, নাচোল ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের কিছু অংশে পানির স্তর নেমে যাওয়ার হার উদ্বেগজনক।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ সাহিদুল আলম বলেন, ‘ফারাক্কার কারণে এলাকায় ব্যাপক নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে নদীর বামতীরে বাঁধ নির্মাণ করা হলেও পানি নিয়ন্ত্রণের কারণে শুষ্ক মৌসুমেও নদীভাঙন দেখা দিচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে না পারলে শুধু পদ্মা পাড়ের মানুষই নয়, বৃহত্তর বরেন্দ্র অঞ্চলসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে।’
বর্ষা মৌসুমে ফারাক্কা বাঁধের গেট খুলে দেওয়ায় সৃষ্টি হচ্ছে বন্যা এবং নদী ভাঙন। ফলে প্রতিবছর ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে পদ্মা পাড়ের মানুষ এবং ফসলি জমি। শুষ্ক মৌসুমে পানি শূন্যতা ও অসময়ে বেশি পানি প্রবাহের কারণে নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। পদ্মা নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ভারত নিয়ন্ত্রণ করায় পদ্মার নাব্যতা হারিয়ে জেগে উঠছে বিশাল বিশাল চর।
/এসএনএইচ/








