ঢাকার হলি আর্টিজান জঙ্গি হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৯ বছর বয়সী অবিন্তা কবির। কিন্তু নাটোরে যেন শত শত অবিন্তা কবির এখনও জীবিত। সেখানকার পল্লী কল্যাণ শিক্ষা সোসাইটি (পিকেএসএস) সংগঠনের মাধ্যমে অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন সিংড়া উপজেলায় চালু করেছে পাঁচটি স্কুল। স্কুলগুলো ব্যতিক্রমী পাঠদানের মাধ্যমে জয় করে নিয়েছে মানুষের মন। স্কুলগুলোর কার্যক্রমও প্রসারিত হচ্ছে ধীরে ধীরে। আর এসব স্কুলের ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা যে বেড়ে উঠছে একেকজন অবিন্তা হয়ে।
পিকেএসএস-এর নির্বাহী পরিচালক ডেইজি আহম্মেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা রুবা আহম্মেদের পরামর্শ ও নির্দেশনায় সিংড়া পৌর শহরের উত্তর নিংগুইন, নিংগুইন ঘুনপাড়া, পাটকোল, তাজপুর ইউনিয়নের পারচক হরিপুর ও বামিহাল এলাকার জয়কুঁড়িতে পাঁচটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয় গত ফেব্রুয়ারিতে। প্রতিটি স্কুলে রয়েছে ৩০ জন শিক্ষার্থী। স্কুলগুলোতে ৪ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য রয়েছে সব ধরনের আধুনিক ও যুগপোযোগী শিক্ষার ব্যবস্থা।’
ডেইজি আহম্মেদ বলেন, ‘একজন অভিজ্ঞ শিক্ষিকা, একজন মনিটরিং কর্মকর্তা, একজন প্রজেক্ট কর্মকর্তা ও একজন করে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা রয়েছে প্রতিটি স্কুলে। তাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে।’ তিনি নিজে এবং ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষও এসব স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রম দেখাশোনা করেন বলে জানান তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতি মাসে শিক্ষিকাকে ৬ হাজার টাকা, মনিটরিং কর্মকর্তাকে ১২ হাজার টাকা, প্রজেক্ট কর্মকর্তাকে ১৪ হাজার টাকা এবং হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তাকে ৮ হাজার টাকা বেতন দেওয়া হয়। এছাড়া স্কুলটির জমির মালিককেও প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হয়।’
সরেজমিনে নিংগুইন উত্তরপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় আত্রাই নদীর পাশেই রাস্তা ঘেঁসে রাজুর বাড়িতে নির্মিত হয়েছে অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন স্কুল। স্কুলটির ওপরের চালা ও চারিদিকে টিনের বেড়া। স্কুলটির সামনে রয়েছে অপ্রশস্ত একটি আঙ্গিনা। স্কুলটির ভেতরে কোনও বেঞ্চ নেই, তবে রয়েছে মাদুর। মাদুরে বসেই শিক্ষার্থীরা শিক্ষা গ্রহণ করে। শ্রেণিকক্ষে রয়েছে একটি ব্ল্যাকবোর্ড আর চারিদিকে দেয়ালে সাঁটানো রয়েছে শিক্ষার্থীদের অঙ্কিত বিভিন্ন চিত্র।
ঈদের ছুটিতে রাজু ও তার পরিবারের সদস্যরা বেড়াতে গিয়েছে আত্মীয়ের বাড়িতে। তবে রাজুর ছোট ভাই, স্থানীয় আলহাজ্ব জালাল উদ্দিন কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির ছাত্র জাকারিয়া হোসেন মুন জানান, রাজুর মা রুবিয়া খাতুন দীর্ঘদিন ব্র্যাক স্কুলে শিক্ষকতা শেষে এই স্কুলের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছেন।
মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে রাজু জানান, ডেইজি আহম্মেদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী তিনি নিজের ৬০ হাজার টাকা খরচ করে বিদ্যালয়টি নির্মাণ করেছেন। প্রতি মাসে তাকে ভাড়া বাবদ দেওয়া হয় ৩ হাজার টাকা। বিদ্যালয়ে ব্যবহৃত ফ্যানটি দিয়েছেন ডেইজি আহম্মেদ তবে বিদ্যুৎ বিল তিনি পরিশোধ করেন। প্রথম পর্যায়ে ১ বছরের চুক্তি করা হয়েছে। পরবর্তিতে প্রজেক্টের মেয়াদ বাড়লে তা আরও ৫ বছরের জন্য করা হবে বলে তাকে জানানো হয়েছে।
শিক্ষিকা রুবিয়া খাতুন জানান, বিদ্যালয়ের ৩০ জন শিক্ষার্থীই বেবি শ্রেণির। বিদ্যালয়ের সময় ৯টা থেকে ১১টা হলেও প্রতি শিক্ষার্থীর পড়া তৈরি না হওয়া পর্যন্ত তাদের ছুটি দেওয়া হয় না। প্রতিদিন বাংলা, ইংরেজি, গণিত ছাড়াও ড্রইং, সাধারণ জ্ঞান পড়ানো হয়। এছাড়া শিক্ষার্থীদের আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্যে গান, কবিতা, ছড়া ইত্যাদির চর্চা করানো হয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে শিক্ষা গ্রহণ করেন।
মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে পাটকোল বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সীমা খাতুন জানান, ‘প্রতি শিক্ষিকাকে নিয়োগ দেওয়ার পরই শিক্ষা প্রদানের ওপর তাদের সাত দিনের ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রতি মাসে তাদের কার্যক্রমের ওপর রিফ্রেশ মিটিং করা হয়।’
নিংগুইন উত্তরপাড়া বিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী মাহি জানায়, ‘আপা আমাদের অত্যন্ত যত্নসহকারে পড়ালেখা শেখান। বিদ্যালয়ে পড়তে পেরে আমি খুব খুশি। কোনও কারণে একদিন বিদ্যালয়ে যেতে না পারলে তার খুব খারাপ লাগে।
মাহির মা মমতা বেগম জানান, বিদ্যালয়ের আপা তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে অত্যন্ত যতœসহকারে পড়ালেখা করান। কোন সমস্যা হলে তাদের ডেকে পরামর্শ করেন। বিদ্যালয়ের প্রতি শিক্ষার্থীরা খুব আগ্রহী। তিনি তার সন্তানকে এমন বিদ্যালয়ে ভর্তি করে গর্বিত। তিনি দাবী করেন, বিদ্যালয়টি ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত উন্নীত করা হলে তার মত সকল অভিভাবকই ছেলে-মেয়েদের উন্নত শিক্ষার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারতেন।
এক প্রশ্নের জবাবে মমতা দাবী করেন, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা গ্রহণে তাদের কোন খরচ হয় না। বরং শিক্ষার্থীদের খাতা,কলম,পেনসিল ইত্যাদি কর্তপক্ষই সরবরাহ করে থাকে।
এব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে ডেইজি আহম্মেদ জানান, সম্প্রতি অবিন্তা-কবির ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা রুবা আহম্মেদ স্কুলগুলো ভিজিট করেছেন। ইতোমধ্যেই তিনি অভিভাবকদের দাবীর বিষয়টি ফাউন্ডেশন কতৃপক্ষকে জানিয়েছেন।
স্থানীয় অভিভাবকদের দাবী, অবিন্তা-কবির ফাউন্ডেশন স্কুল কর্তপক্ষ তাদের শিশুদের আধুনিক,যুগোপোযোগী ও ব্যতিক্রমী শিক্ষা প্রদান করে একদিকে যেমন তাদের যোগ্য নাগরিক করে গড়ে তুলছে, অপরদিকে বিদ্যালয়ের নামটি তাদের হৃদয়ে গেঁথে যাচ্ছে। বিদ্যালয়ের কার্যক্রমের কারণেই স্থানীয় অভিভাবকরা বিদ্যালয়টি নাম আর নামীয় ব্যক্তি অবিন্তা-কবিরকে স্মরণ করছে প্রতিনিয়ত। তাদের হৃদয়ে খোদাই হয়ে যাচ্ছে হলি আর্টিজানে নিহত অবিন্তা-কবির। অবিন্তা-কবির ফাউন্ডেশন স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রম আরও বৃদ্ধি করা গেলে শিশু থেকে অভিভাবক, এর পর প্রতিবেশী হয়ে দিনের পর দিন সকল মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিবে অবিন্তা আর কবিরের নাম। আর এর মাধ্যমে চির অমর হয়ে থাকবে নাটোরবাসীসহ দেশবাসীর হৃদয়ে অবিন্তা-কবির। জীবদ্দশায় অবিন্তা-কবির লিখেছিলেন ‘আমার জীবনের গল্পটি লিখেছেন অনেকেই। সবচেয়ে বড় অংশটি লিখেছেন আমার মা-বাবা। বন্ধুরাও লিখেছেন অনেকটা জুড়ে, কখনও সেটা মুখের গল্প, আনন্দের গল্প, সবসময় পাশে থাকবার গল্প।’
স্থানীয়রা মনে করেন, এমন স্কুল প্রতিষ্ঠা বৃদ্ধি করা আর এর কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানো গেলে শুধু বাবা-মা,বন্ধু নয়, নাটোরসহ সারাদেশের মানুষের পাশে থাকার অবিন্তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব। এব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের দৃষ্টি ও পদক্ষেপ কামনা করেছেন নাটোরের সচেতন মহল।
/এসএনএইচ/








