ফের ঝুঁকির পাহাড়ে বাস!

মো.নজরুল ইসলাম টিটু, বান্দরবান
০২ জুলাই ২০১৭, ১৮:৫১আপডেট : ০৩ জুলাই ২০১৭, ০৮:৫০

ধসের পর আবারও পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি বানাচ্ছে স্থানীয়রা

ক’দিন আগেই এই পাহাড় হয়ে উঠেছিল প্রাণঘাতী। টানা বৃষ্টিপাতে পাহাড় ধসে চট্টগ্রামের পাঁচ জেলায় নিহত হয়েছিলেন ১৩৫ জন। এর মধ্যে বান্দরবানে প্রাণ হারান ৯ জন। ১৩ জুনের সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার ২০ দিনও পেরোয়নি।

বৃষ্টিপাতও অব্যাহত রয়েছে। মাটি নরম হয়ে পাহাড়গুলো এখনও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে রয়েছে। তবে এরই মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে পাহাড়ের পাদদেশের বসতিতে ফিরে যাচ্ছেন মানুষজন। এদের বেশিরভাগই নিম্নআয়ের কর্মজীবী মানুষ। এক বেলাও তাদের বসে থাকার জো নেই।

তারা বলছেন, ঝুঁকির কথা তারাও জানেন। কিন্তু কাজ না করলে খাবার জোটে না বলেই তারা পাহাড়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

পাহাড়ধসের পর প্রথম কিছুদিন স্থানীয় প্রশাসন বেশ তৎপর ছিল। এখন তাদের নজরদারিও কমে গেছে। ফলে  বিপদসংকুল হয়ে থাকা পাহাড়ে ফেরা মানুষগুলোকে কেউ বাধাও দিচ্ছে না।

গত ১৩ জুন রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে পাহাড় ধসে এক রাতেই প্রাণ হারান ১৩৫ জন। কয়েক দিনের ভারী বর্ষণের পর ওই দিন শেষরাতে হঠাৎ ধস নেমেছিল পাহাড়গুলোয়।

ওই দিন বান্দরবানের কালাঘাটা, লেমুঝিড়ি, আগা পাড়া ও ঘুংগুরু পাড়ায় মাটি চাপা পড়ে মারা যায় ৯ জন। আহত হন অন্তত ১২ জন। এ সময় বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে ওঠেন পাহাড়ের পাদদেশের বাসিন্দারা। কেউ কেউ আশ্রয় নেন আত্মীয় স্বজনের বাসায়।

প্রশাসনের তথ্য মতে, পাহাড়ধসের ঝুঁকি আছে এমন স্থান থেকে বিভিন্ন বিদ্যালয় ভবনের ১২টি আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নেয় প্রায় আড়াই হাজার পরিবার।এ ছাড়া, আরও  প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার আশ্রয় নেয় আত্মীয়-স্বজনের বাসায়।

ধসে পড়া পাহাড়ে ফিরে এসে আবারও বাড়ি তৈরি করছে স্থানীয়রা

পাহাড় ধসের ১৯ দিন পর রবিবার (০২ জুলাই)বান্দরবানের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে ক্ষতিগ্রস্তরা নিজেদের বাড়িতে ফিরে এসেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত বসত বাড়িগুলো ঠিকঠাক করে অনেকটা স্বাভাবিকভাবেই বাস করতে শুরু করেছেন তারা।

পাহাড় এখনও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে থাকার পরও তাদের মধ্যে এ নিয়ে তেমন কোনও আতঙ্কও দেখা যায়নি। কোথাও কোথাও নতুন করে ঘর তৈরি করতে পাহাড় কেটে সমান করা হচ্ছে। কেউবা ধসে পড়া পাহাড়ের মাটি সরিয়ে বাড়ির আঙিনা, রাস্তা পরিষ্কার করছেন।

বর্তমানে লামার বাসুরী পাড়ার ১৬টি, বাইশ পাড়ার ২৪টি, দরদরি পাড়ার ছয়টি ও আলীকদমে ৩০টি সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘর খালি আছে বলেও জানা গেছে। 

আশ্রয়কেন্দ্র থেকে পাহাড়ের বসতিতে ফিরে আসা পূর্বকালাঘাটার ফেন্সিঘোনার শিরিন আক্তার বলেন, আমার বাড়িটি পাহাড়ের নিচে অর্ধেক ঢুকে গিয়েছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর আমি ফিরে এসে মাটি সরিয়ে বাড়ি পরিষ্কার করেছি। এখন আমরা আগের মতোই এখানে বসবাস করছি।

এখানে থাকার ব্যাপারে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনও বাধা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা আসার পর এখানে প্রশাসনের কেউ আসেনি।

শিরিনের স্বামী সেলিম বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রে থাকাকালে না খেয়ে আমাদের মরার মতো অবস্থা হয়েছিল। প্রশাসনের শুকনো খাবারে পেট ভরা তো দূরের কথা, এগুলো খাওয়াও যায় না। কিছু কিনে খাওয়ারও সামর্থ্য ছিল না। এখন বাড়ি ফিরে এসে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে সংসার চালাচ্ছি। বলতে পারেন এখানে আশ্রয়কেন্দ্রের চেয়ে ভালো আছি।

তিনি আরও বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় দিলেই তো হবে না। আমাদের জন্য কাজের ব্যবস্থাও করতে হবে। যে কয়দিন সেখানে থাকবো, যেন ভালোভাবে থাকতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।

স্থানীয়রা বলেন, পাহাড় ধসের পরপরই প্রশাসন বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিল। তড়িঘড়ি করে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয় পাহাড়ে বা পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারীদের। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসায় প্রশাসনের এখন আর ততটা নজর নেই।

তারা বলেন, পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারীরা গরিব। পাহাড় কেটে কোন রকমে থাকার উপযোগী করে বসবাস করছেন তারা। তাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। কাজ করতে না পারলে খাবারও জোটে না তাদের। তাই বাধ্য হয়েই তাদের পাহাড়ে ফিরে আসতে হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের জেলা সভাপতি জুমলিয়ান আমলাই বলেন, এত মানুষের মৃত্যুর পরও বিভিন্ন জায়গায় এখনও পাহাড় কাটা হচ্ছে। পাহাড়ে বসবাসকারীরাও আশ্রয়কেন্দ্রে থেকে আগের স্থানে ফিরে গেছে। প্রশাসন নজর না দিলে আবারও পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

বাড়ি বানাতে নতুন করে কাটা হচ্ছে পাহাড়

শহরের লাঙ্গিপাড়ার পানির ট্যাংক এলাকায় ঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারী কাশেম অভিযোগ করেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর তাদের আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।

নূর হোসেন নামের একজন জানান পাহাড় ধসের পর স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তিনি আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে উঠেছিলেন। সেখানে সমস্যা হওয়াতে আগের বাসস্থানেই ফিরে এসেছ্নে। তিনি বলেন, এখানে ঝুঁকি থাকলেও ভালো আছি। নিজের মতো করে বাস করতে পারি। আত্মীয়ের বাসায় কতদিন থাকা যায়-এ প্রশ্ন করে তিনি বলেন,আমাদের জন্য সরকারের দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করা দরকার।

বান্দরবান মৃত্তিকা ও পানি সংরক্ষণ কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহবুবুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি ভারী বর্ষণে অনেকগুলো পাহাড় ধসে পড়েছে। অনেকগুলো ধসে না পড়লেও ভেতরে ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে। যেকোনও মুহূর্তে অল্প বৃষ্টিতে এসব পাহাড় ধসে পড়তে পারে।

তিনি বলেন, মানুষ পাহাড়ের পাদদেশে আবার ফিরে গেছে, তা আমি জানি। নিজেও দেখেছি। এ বর্ষায় তাদের সেখানে যেতে না দিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা করার দরকার ছিল।

এই কর্মকর্তা বলেন, আবহাওয়া অধিদফতর বলছে, যে কোনও সময় ভারী বৃষ্টি হতে পারে। যদি তা-ই হয়, তাহলে  তাদের সরানো সম্ভব না হলে যে কোন মুহূর্তে আগের মতো প্রাণহানি হতে পারে।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। এখন আর আগের মতো ঝুঁকি নেই, তাই সবাই নিজেদের বসতিতে ফিরে গেছে।

তিনি বলেন,  এখানে শুধু পাহাড় ধসের ঝুঁকিতেই মানুষ বসবাস করছে তা কিন্তু নয়, নদীর পাড়ের অনেক মানুষও ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতি বছর বর্ষায় পানি বৃদ্ধি পেলে তাদের বাড়িঘর নদীগর্ভে চলে যায়। আমরা সব কিছু মিলিয়ে একটি তালিকা করেছি। তাদের জন্য আমরা আশ্রয়ণ প্রকল্প করব । সেখানে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের আশ্রয় দিতে পারব বলে আশা করি।

/এএম/টিএন/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম