বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার নামুইট গ্রামে নিজাম উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি তার দ্বিতীয় বিয়েতে প্রামাণিকদের (মাতব্বর)দাওয়াত না দেওয়ায় তার পরিবারকে প্রায় তিন বছর ধরে ‘একঘরে’ (সমাজচ্যুত) করে রাখা হয়। গত শুক্রবার (৭ জুলাই) নিজাম উদ্দিনের প্রথম স্ত্রী লুৎফুন্নেছা (৪২) মারা গেলে মাতব্বররা তাকে গ্রামের কবরস্থানে দাফন করতে দেননি। স্বজনরা বাধ্য হয়ে লুৎফুন্নেছাকে বেলঘড়িয়া গ্রামে তার বাবার বাড়িতে নিয়ে দাফন দেন। এ ঘটনায় গ্রামের সাধারণ মানুষের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নন্দীগ্রাম পৌরসভার মেয়র পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি কামরুল হাসান সিদ্দিকী জুয়েল ঘটনার কথা অস্বীকার করে জানান, এখানে ‘একঘরে’ করে রাখার কোনও ঘটনা ঘটেনি। গ্রামের আদি বাসিন্দা ছাড়া নামুইট গোরস্থানে লাশ দাফনের সুযোগ নেই। নতুন বাসিন্দাদের লাশ কবর দিতে হলে ফি দিতে হয়। গোরস্থান কমিটির লোকজন না থাকায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। শনিবার দু’পক্ষকে ডেকে সকলের জন্য গোরস্থান উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। নন্দীগ্রাম থানার এসআই ইনামুল হক জানান, স্বামীর গ্রামে গৃহবধূর লাশ দাফনে বাধা দেওয়ার খবর পেয়ে তারা দুই গ্রামেই গিয়েছিলেন। ততক্ষণে ওই গৃহবধূর দাফন হয়ে গেছে।
নন্দীগ্রামের নামুইট গ্রামের বাসিন্দা আকবর আলী জানান, তাদের গ্রামে একাধিক সমাজ রয়েছে। প্রতিটি সমাজের আলাদা মাতব্বর রয়েছেন। তাদের গ্রামের মাতব্বর হলেন, মিঠু, আকবর হাজি, আশরাফ হাজি, কাফি, মোখলেস, খেজমত প্রমুখ। তার খালাতো ভাই নিজাম উদ্দিনের প্রথম স্ত্রী লুৎফুন্নেছা শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। এ কারণে প্রায় তিন বছর আগে নিজাম উদ্দিন প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। ওই বিয়ের সময় মাতব্বর মিঠুদের দাওয়াত দিয়ে না খাওয়ানোর কারণে তারা ক্ষুব্ধ হন। এরপর থেকে নিজাম উদ্দিনের পরিবারকে একঘরে (সমাজচ্যুত) করা হয়।
শুক্রবার দুপুরে নিজাম উদ্দিনের প্রথম স্ত্রী লুৎফুন্নেছা মারা যান। স্বজনরা তাকে গ্রামের কবরস্থানে দাফনের প্রস্তুতি নেন। কবর খোড়াও হয়েছিল। আকবর আলী অভিযোগ করেন, তাদের সমাজের মাতব্বর মিঠুদের প্ররোচনায় কবরস্থান কমিটির নেতা ও নন্দীগ্রাম পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রহমত আলী, তার বাবা গোলাম রব্বানী, আশরাফ আলী, লোকমান হোসেন প্রমুখ কবর দিতে বাধা দেন। অনুরোধ করেও মাতব্বরদের রাজি করা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে পাশের বেলঘড়িয়া গ্রামে লুৎফুন্নেসাকে তার বাবার বাড়ির কবরস্থানে দাফন করা হয়।
খবর পেয়ে নন্দীগ্রাম থানার পুলিশ দু’টি গ্রামে গেলেও তার আগেই দাফনের কাজ শেষ হয়ে যায়। এ নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এদিকে শনিবার নন্দীগ্রাম পৌরসভার মেয়র কামরুল হাসান সিদ্দিকী জুয়েল গ্রামের দু’পক্ষকে ডেকে মিমাংসা করে দিয়েছেন।
নামুইট গোরস্থান কমিটির নেতা ও পৌর কাউন্সিলর রহমত আলী জানান, নিজাম উদ্দিনের পরিবারকে কেউ একঘরে করে রাখেননি। কবরস্থান পরিচালনা কমিটির লোকজন না থাকায় লুৎফুন্নেছার লাশ দাফনে বিলম্ব হয়। তাই স্বজনরা তাকে অন্য গ্রামে নিয়ে দাফন করেছেন। পৌর মেয়র জুয়েল জানান, নামুইট কবরস্থানে গ্রামের পুরনো বাসিন্দাদের লাশ দাফন ফ্রি। আর নতুনদের ২ হাজার টাকা ফি দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। লুৎফুন্নেছারা ওই গ্রামে নতুন এবং তারা কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ না করেই দাফনের চেষ্টা করলে ভুল বোঝাবুঝি হয়। তবে তিনি শনিবার দু’পক্ষকে পৌরসভায় ডেকে এনে এ নিয়ম বিলুপ্ত এবং মিমাংসা করে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, সব কবরস্থানেই লাশ দাফনে ফি দিতে হয়। মৃত লুৎফুন্নেছার দেবর আকবর আলী, নন্দীগ্রাম উপজেলা যুবলীগের সভাপতি মাহমুদ আশরাফ মামুন ও অন্যরা এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা কবর দিতে বাধা দেওয়ায় জড়িত মাতব্বরদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। ওই পরিবারকে একঘরে রাখার সঙ্গে জড়িত মিঠু ও অন্য মাতব্বরদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।
/এপিএইচ/
আরও পড়ুন:
১৫ বছর ধরে আত্মগোপনে থেকে জঙ্গি কার্যক্রম চালাতো মাহফুজ








