কেশবপুরে কালোমুখ হনুমানের সংখ্যা বাড়ছে

তৌহিদ জামান, যশোর
১৫ জুলাই ২০১৭, ০৪:৪৭আপডেট : ১৫ জুলাই ২০১৭, ০৪:৫৯

কালোমুখ হনুমান (ছবি- প্রতিনিধি)

নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব, খাদ্য সংকট ও অপমৃত্যু সত্ত্বেও যশোরের কেশবপুরে কালোমুখ হনুমানের সংখ্যা বাড়ছে। গত বছরের জরিপ অনুসারে সেখানে ৩শ’ ২০টি হনুমান থাকলেও এখন তা সাড়ে ৪শ’ ছাড়িয়ে গেছে। উপজেলা সামাজিক বন কর্মকর্তা এমএম মিজানুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য জানান।

এমএম মিজানুর রহমান বলেন, ‘সরকারি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে হনুমানগুলো রক্ষণাবেক্ষণের চেষ্টা করা হচ্ছে। স্থানীয় ঠিকাদারের মাধ্যমে হনুমানের জন্য প্রতিদিন খোসাসহ এক মণ পাকা কলা, দুই কেজি পাউরুটি এবং আড়াই কেজি চিনাবাদাম সরবরাহ করা হয়। হনুমানগুলো কেশবপুর উপজেলা চত্বর, কুঠিবাড়ি শ্মশান চত্বর, রামচন্দ্রপুর, পাইলট স্কুল মাঠ, মধ্যকুল, নরেন্দ্রপুর ও হাসপাতাল চত্বরে বিচরণ করে। আমরা কয়েকটি স্পটে এই খাবারগুলো পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করি।’  

তবে প্রয়োজনের তুলনায় খাদ্যের পরিমাণ কম বলেও জানান এই কর্মকর্তা। তার মতে, ‘প্রতিদিন দুই থেকে তিন মণ পাকা কলা, পাঁচ কেজি পাউরুটি এবং পাঁচ কেজি চিনাবাদাম সরবরাহ করতে পারলে ভাল হয়।’

কালোমুখ হনুমান (ছবি- প্রতিনিধি)

এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, যশোরের কেশবপুর উপজেলার ঐতিহ্য এই কালোমুখ হনুমান। বছরের পর বছর ধরে এ অঞ্চলে হনুমানগুলোকে দেখা যায়। গাছপালা না থাকায় ও খাদ্য সংকটের কারণে হনুমানগুলো আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় চলে যায়। এদের সংরক্ষণের জন্য একটি অভয়ারণ্য করা প্রয়োজন। তাহলে তারা সেখানে নিরাপদে বিচরণ করতে পারবে।

স্থানীয়দের মতে, চার বছর আগে একটি বেসরকারি সংস্থা কেশবপুরের হনুমানদের জন্য প্রয়োজনীয় ফলজ ও বনজ বৃক্ষরোপণের কাজ শুরু করে। কিন্তু গত বছরের অতিবৃষ্টি এবং জলাবদ্ধতায় বেশকিছু গাছ নষ্ট হয়ে গেছে।

এ ব্যাপারে কেশবপুর সদরের বাসিন্দা রহমত আলী বলেন, ‘কালোমুখ হনুমান আমাদের জীবনের সঙ্গেই মিশে আছে। কিন্তু খাদ্যের অভাব, থাকার জায়গার সমস্যা, বৈদ্যুতিক ক্যাবলে জড়িয়ে অপমৃত্যু এবং কিছু দুষ্ট লোকের নির্যাতনে হনুমানের অপমৃত্যু হচ্ছে।’ খাদ্যের সন্ধানে অনেক হনুমান এলাকা ছেড়ে চলে গেছে বলেও জানান তিনি।

কালোমুখ হনুমানের ঐতিহাসিক উপস্থিতির ব্যাপারে স্থানীয়রা জানান, ব্রিটিশ আমলে দক্ষিণ ভারতের কয়েকজন মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী ব্যবসার উদ্দেশ্যে কেশবপুরে আসেন। তারা কয়েকটি কালোমুখ হনুমান সঙ্গে নিয়ে আসেন। সেগুলোই বংশবৃদ্ধি করে এ অঞ্চলে নিজেদের ‘হনুমান সম্রাজ্য’ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে এখানে দুই হাজারের মতো কালোমুখ হনুমান ছিল বলেও জানান তারা। তবে বন উজাড়করণ, গাছের সংখ্যা কমে যাওয়া, খাদ্যাভাব এবং মানুষের অত্যাচারে তাদের সংখ্যা কমতে থাকে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

গাছের ডালে কালোমুখ হনুমান (ছবি- প্রতিনিধি)

তবে কেশবপুরের সামাজিক বন বিভাগ কর্তৃপক্ষের দাবি, সীমিত সাধ্যের মধ্যেও হনুমানগুলো রক্ষবেক্ষণের চেষ্টা করছেন তারা। তবে হনুমানের খাদ্য ও আবাসস্থলের জন্য ফলজ ও বনজ বৃক্ষের সংখ্যা বাড়ানো দরকার বলেও অভিমত তাদের।

তবে হনুমান রক্ষণাবেক্ষণ খুব সহজ নয় বলে জানিয়েছেন উপজেলা বন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘হনুমানগুলো এক জায়গায় স্থির থাকে না। আর একেকটি দলে দু’টির বেশি পুরুষ হনুমানও থাকে না। সংখ্যায় বেশি হলে নিজেরাই মারামারি করে অন্যত্র চলে যায়। অভয়ারণ্য তৈরি করে এদেরকে এক জায়গায় আটকে রাখা কঠিন।’

তবে ঝড়-বৃষ্টিসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করতে তাদের জন্য একটা টাওয়ার নির্মাণ করা যেতে পারে। তাহলে তারা এ অঞ্চল ছেড়ে কোথাও যাবে না বলেও মত দিয়েছেন এই বন কর্মকর্তা।

এ ব্যাপারে কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. কবীর হোসেন জানান, হনুমানের খাদ্য সরবরাহের জন্য যে বাজেট আছে তা আসলে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তবে হনুমান সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি আরও জানান, বেসরকারি সাহায্যের জন্য স্থানীয় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংস্থা জাইকার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।

কালোমুখ হনুমান (ছবি- প্রতিনিধি)

এ ব্যাপারে উপজেলা চেয়ারম্যান এইচএম আমির হোসেন বলেন, ‘বিরল প্রজাতির এই হনুমান আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে গেছে। এদের সংরক্ষণের জন্য অভয়রাণ্য প্রয়োজন। সম্প্রতি এ ব্যাপারে জাপানি আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রতিষ্ঠান ‘জাইকা’র কান্ট্রি ডিরেক্টরের সঙ্গে কথা বলেছি। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার্থে প্রাণিবিদদের সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি মাস্টারপ্ল্যান দিতে বলেছেন তিনি। এ জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি।’

অভয়ারণ্যের প্রসঙ্গে তিনি জানান, কেশবপুরের বিল খুকশিয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)’র একটি বিশাল জায়গা আছে। এছাড়া গৌরিঘোনা ইউনিয়নে ৯০ একরের মতো খাসজমি আছে। বিদ্যানন্দকাঠি এলাকায় খানজাহান আলীর দিঘির পাশেও বিস্তীর্ণ এলাকা পড়ে আছে। এসব জায়গায় যে কোনও স্থানে হনুমানের জন্য অভয়ারণ্য করা সম্ভব।

/এএইচ/এমএ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম