বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন বিভাগের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে চরমপন্থী পরিচয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চাঁদা না পেলে এসব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হত্যার হুমকি দিচ্ছে নিষিদ্ধ ঘোষিত পূর্ব বাংলার কমিউনিষ্ট পার্টি (এমএল-জনযুদ্ধ) নাম ব্যবহারকারী চরমপন্থীরা। চরমপন্থীদের হত্যার হুমকির মধ্যে রয়েছে সরকারি কর্মকর্তাদের স্ত্রী ও সন্তানরাও। এতে বাগেরহাট জেলা ও বিভিন্ন উপজেলার বিভিন্ন বিভাগের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে ‘চরমপন্থী আতঙ্ক’।
মোবাইল ফোনে চাঁদা চেয়ে হুমকি পাওয়া ওই সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে নিরাপত্তা চেয়ে থানায় লিখিত আবেদন করেছেন। তবে পুলিশ আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে জানিয়েছে, হুমকিদাতাদের দ্রুত গ্রেফতারে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
গত কয়েকদিন চরমপন্থী সংগঠন জনযুদ্ধের প্রধান দাদা তপন, শিমুল ও হাতকাটা বিল্পব নাম পরিচয় দিয়ে বাগেরহাট বিদুৎ বিভাগ, এলজিইডি, মোল্লাহাট শিক্ষা অফিস, প্রণিসম্পদ বিভাগ এবং কচুয়া শিক্ষা অফিসসহ বিভিন্ন উপজেলার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মোবাইলে ফোন করে হুমকি দিচ্ছে। হুমকিদাতারা নিজেদের চরমপন্থী পরিচয় দিয়ে বলছে, গোলাগুলিতে তাদের দলের কয়েকজন সদস্য জখম হয়ে দেশের বাইরে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তাদের চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে অনেক টাকার প্রয়োজন। ২০ লাখ টাকা থেকে পাঁচহাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। হুমকিতে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে কোনও কোনও উপজেলার কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বিকালে বাগেরহাট এলজিইডি অফিসের পাঁচজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চরমপন্থী পরিচয় দিয়ে চাঁদা দাবি করে হুমকি দেওয়া হয়।
বাগেরহাট বিদুৎ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত নিবার্হী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ঘোষ বলেন, মঙ্গলবার দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে আমার দাফতরিক ল্যান্ডফোনে কল এলে রিসিভ কররি। পরে ওপাশ থেকে নিজেকে পূর্ব বাংলার কমিউনিষ্ট পাটি’র্র (এমএল-জনযুদ্ধ) সদস্য শিমুল পরিচয় দিয়ে ফোনটি তার কথিত বস দাদা তপনের কাছে দিয়ে দেয়। দাদা তপন তার কাছে দলের নেতা-কর্মীদের চিকিৎসা ও বিভিন্ন খরচ বাবদ ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দিলে জীবন নাশের হুমকি দেয়। একই দিন ০১৬৩৬-৬৫৬২০৪ এবং ০১৯৯৭-৫৫১৭১২ মোবাইর নম্বর থেকে বাগেরহাট বিদুৎ অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চরমপন্থী পরিচয়ে জীবন নাশের হুমকিসহ তাদের পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেয়।
ওই দিনই বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে বাগেরহাট মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। বাগেরহাট বিদুৎ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত নিবার্হী প্রকৌশলী তার দায়ের করা সাধারণ ডায়েরিতে হুমকির কারণে নিরাপত্তার অভার বোধ এবং সেজন্য মানসিক চাপের কারণে দায়িত্ব পালন বিঘ্নিত হবার সম্ভবনা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
বাগেরহাট এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী মো. গোলাম রাব্বানী জানান, চরমপন্থী জনযুদ্ধের বিপ্লব বাহিনী পরিচয় দিয়ে বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টা থেকে পৌনে ৫টা পর্যন্ত তিন দফায় তার কাছে মোবাইল করে চাঁদা দাবি করা হয়। প্রথম দফায় ফোন করে ২০ লাখ টাকা দাবি করে হুমকিদাতা। ওই পরিমাণ টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় পরবর্তীতে ১০ হাজার টাকা দাবি করে ওই চরমপন্থী পরিচয়দানকারী। হুমকির মুখে সে তাকে পাঁচহাজার টাকা দিতে রাজি হয়। এর পরে ওই হুমকিদাতা একটি বিকাশ নম্বর দিয়েছে টাকা পাঠানোর জন্য। বিষয়টি কাউকে জানালে পরিণতি খারাপ হবে বলে হুমিকদাতা জানায়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওই টাকা না দিলে হত্যার হুমকি দেয়। এমনকি স্ত্রী ও সন্তানদেরকে হত্যার হুমকি দিয়েছে বলে তিনি জানান।
একই অফিসের উপসহকারী প্রকৌশলী সাহিদ আলম ভুঁইয়া জানান, প্রায় একই সময়ে তাকেও ফোন করে চরমপন্থী পরিচয় দিয়ে পাঁচ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা না পেলে হত্যার হুমকি দিয়েছে তাকে। একইভাবে চরমপন্থী পরিচয় দিয়ে এলজিইডির হিসাবরক্ষক আব্দুল ওহাব, হিসাব সহকারী মো. আলম এবং ল্যাব টেকনিশিয়ান আসাদুল হকের কাছেও একইভাবে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক কচুয়া উপজেলার একজন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, ‘আমাকে এবং অফিসের কয়েকজনকে চরমপন্থী জনযুদ্ধের পরিচয় দিয়ে হাতকাটা বিল্পব বাহিনীর কথা বলে মোটা অঙ্কের চাঁদা দারি করা হয়। দারি করা ওই টাকা না পেলে আমাদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।
মোল্লাহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনম খায়রুল আনাম জানান, মোল্লাহাট উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তা ও সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা এবং প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে মোবাইল ফোন করে চরমপন্থী দলের সদস্য পরিচয় দিয়ে চাঁদা দারি করা হয়। হুমকিদাতা তাদেরকে জানিয়েছে যে, তাদের (চরমপন্থী) দলের বেশ কয়েকজন গোলাগুলিতে আহত হয়ে বিদেশে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তাদের চিকিৎসা করাতে প্রচুর পরিমাণ টাকার প্রয়োজন। সঙ্গীদের চিকিৎসা করানোর জন্য এই টাকা চাওয়া হচ্ছে।
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার পংকজ চন্দ্র রায় বলে‘ন, কয়েকদিন ধরে বাগেরহাটের বিভিন্ন উপজেলায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে মোবাইল ফোন করে চরমপন্থী জনযুদ্ধের পরিচয় দিয়ে চাঁদা দারি করা হচ্ছে। পুলিশ মোবাইল ট্র্যাক করে হুমকিদাতার অবস্থান মোটামুটি জানতে পেরেছে। মিথ্যা নাম পরিচয় ব্যবহার করে ওই হুমকি দিয়েছে। পুলিশ তাকে ধরতে চেষ্টা চালাচ্ছে। ওই হুমকিতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এক সময়ে চরমপন্থী অধ্যুষিত দক্ষিণঞ্চলে বর্তমানে চরমপন্থীদের কোনও ধরণের কার্যক্রম নেই।’
/এসএসএ/এসএনএইচ/








