দীর্ঘস্থায়ী বন্যার পর গত দুই সপ্তাহে পানি কমলেও, বৃষ্টির কারণে আবারও বাড়তে শুরু করেছে মৌলভীবাজারের হাকালুকি ও কাউয়াদীঘি হাওরের পানি। অপরদিকে মৌলভীবাজারের বন্যাদুর্গত কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলায় খোলাবাজারে চাল বিক্রির (ওএমএস) কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ও ভিজিএফ বন্ধ করে দেওয়ায় দুর্ভোগ বাড়ছে বানভাসী মানুষের। এমনটাই অভিযোগ স্থানীয়দের।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)-এর নির্বাহী প্রকৌশলী ইন্দ্র বিজয় শংকর চক্রবর্তী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে হাওরের পানি বাড়ছে। কিন্তু “ওভার অল” পানি কম আছে। শেরপুর ও শেওলা পয়েন্টে কুশিয়ারার পানি বিপদসীমার ২১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘উজানের পানির কারণে সমস্যা বেশি হয়। যতই বৃষ্টি হোক না কেন, হাওরের পানি বাড়লেও ২-১ দিন পর তা নেমে যাবে। ভারতের পানি না আসলেই হলো।’
স্থানীয়রা জানায়, সম্প্রতি কুশিয়ারা নদী; হাকালুকি, কাউয়াদীঘি ও হাইল হাওরে পানি বৃদ্ধির কারণে মৌলভীবাজার জেলার ৫টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নে বন্যা হয়েছে। এতে বড়লেখা, জুড়ী, কুলাউড়া, রাজনগর ও সদর উপজেলার তিন লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।
এ ব্যাপারে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত এপ্রিলে অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নামা পাহাড়ি ঢলে তিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বন্যা দেখা দেয়। এতে হাকালুকি হাওরের সব বোরো ধান তলিয়ে নষ্ট হয়ে যায়। বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় তিন উপজেলায় আউশ ধানের বেশ কিছু জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যার পানি পুরোপুরি না নামায় রোপা আমনের আবাদও ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় অনেক এলাকার কৃষকেরা ভাসমান বীজতলা তৈরি শুরু করেন।
এদিকে বন্যায় বোরো ফসল নষ্ট হওয়ায় খাদ্য অধিদফতরের উদ্যোগে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে তিনটি উপজেলায় ডিলারের মাধ্যমে ওএমএসের চাল বিক্রি শুরু হয়। প্রতি কেজি ১৫ টাকা দরে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ৫ কেজি চাল কিনতে পারতেন। গত ১ জুলাই সরকারি নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে এসব এলাকায় ওএমএসের চাল বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এছাড়া, গত ৬ আগষ্ট দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর থেকে জারি করা এক আদেশে ঈদুল আজহা উপলক্ষে বন্যা কবলিত, দুস্থ এবং অতি দরিদ্র লোকজনের জন্য ভিজিএফের খাদ্যশস্য বরাদ্দ স্থগিতের কথা জানানো হয়। ওই কর্মসূচির আওতায় প্রত্যেক উপকারভোগীর বিপরীতে ১০ কেজি করে খাদ্যশস্য বরাদ্দ হতো।
এদিকে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসন জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী মৌলভীবাজারের ৫টি উপজেলার ১টি পৌরসভা ও ২৫টি ইউনিয়নে ২৯৪টি গ্রামে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ২ লাখ ৯৪ হাজার ২৭০ জন। ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৪৮টি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ৫৩ হাজার ৩৪২টি, ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ৫ হাজার ৬৪৩ হেক্টর, ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ৫২৫ টি, আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ৬ হাজার ৯০৮টি ও বন্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯৯টি।
কুলাউড়া ভুকশিমইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মানুষের বাড়িঘর থেকে বন্যার পানি নামা শুরু করেছিল। গত কয়েকদিনের থেমে থেমে বৃষ্টি ও শুক্রবার রাত থেকে টানা বৃষ্টির কারণে আবারও হাওরে পানি বাড়তে শুরু করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বানভাসী মানুষ বোরো ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। ওএমএস চালুর পর কিছু মানুষ কম দরে চাল কেনার সুযোগ পেয়েছিলেন। পরে তা-ও বন্ধ হয়ে যায়। এখন কোরবানির ঈদে ভিজিএফ বন্ধ থাকবে। মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়ে গেছে।’
এএইচ/








