খাদ্য অধিদফতর থেকে লাইসেন্স নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন কুড়িগ্রামের চাল ব্যবসায়ীরা। তবে তাদের দাবি, লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করায় খরচ বেড়ে যাবে। আর এর প্রভাব পড়বে চালের বাজারে। তবে লাইসেন্স বাধ্যতামূলক না করে যদি আমদানিকারক ও বড় বড় মজুতদারদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়, তবে চালের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
জেলা শহরের পৌর চাল বাজারের মাতৃভান্ডার চাল আড়তের ব্যবসায়ী বাবলা ঘোষ জানান, লাইসেন্স করে চালের মূল্য নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এ অঞ্চলে চালের দাম মূলত নির্ভর করে ভারতীয় চাল প্রবেশ করা না করার ওপর। ভারতীয় চাল আমদানি বেশি হলে বাজারে চালের দাম এমনিতেই কমে যায়।
বাবলা ঘোষের দাবি, ‘হিলি বন্দরের চাল আমদানিকারকরা ইচ্ছা করেই চাল আমদানিতে দেরি করেন। ওই বন্দরের ওপারে শত শত ট্রাক আটকিয়ে রাখা হয় কৃত্রিম সংকট তৈরির জন্য। তারা কত মূল্যে ভারত থেকে চাল আমদানি করছেন, তা সরকারও জানে। মূলত আমদানিকারকদের ওপর নজরদারি বাড়ালে চাল সংকট এবং চালের মূল্য দু’টোই কমে আসবে।’
একই চাল বাজারের ব্যবসায়ী মাহফুজার রহমান জানান, লাইসেন্স করতে আমাদের কোনও আপত্তি নেই, আমরা লাইসেন্স নিয়েই ব্যবসা করছি। কিন্তু লাইসেন্স নয়, চালের দাম কমা বা বাড়া নির্ভর করছে ভারতীয় চাল ঢোকা আর না ঢোকার ওপর।
আতাউর রহমান নামে অন্য এক চাল ব্যবসায়ী দাবি করেন, মহাসড়কে মালবাহী ট্রাকে মামলার ভয় দেখিয়ে পুলিশের অবাধ চাঁদাবাজি পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে চালের দাম আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। চালের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হলে মহাসড়কে পুলিশের চাঁদাবাজিও বন্ধ করতে হবে।
অন্যদিকে, খাদ্য অধিদফতর থেকে লাইসেন্স গ্রহণের নির্দেশনা মানতে কোনও আপত্তি নেই জানিয়ে বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, আড়ত থেকে তারা যে দামে চাল কেনেন, তার চেয়ে এক থেকে দেড় টাকা লাভ করেন কেজি প্রতি। লাইসেন্স করলে সেই লাভের পরিমাণ কমবে, তবে চালের দাম কমবে না।
কুড়িগ্রাম পৌর বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী মেসার্স এমি স্টোরের স্বত্বাধিকারী আফজাল হোসেন বলেন, ‘আমরা কেজিতে এক টাকার বেশি লাভ করে চাল বিক্রি করি না। সেজন্য যদি লাইসেন্স করতে হয় তাতে আমাদের আপত্তি নেই। তবে এতে আমাদের খরচ আরও বেড়ে যাবে।’
একই বাজারের মেসার্স এনি স্টোরের স্বত্বাধিকারী আব্দুল হালিম বলেন, ‘আমি এখনও এ ধরনের নির্দেশনার কথা শুনিনি।’ তবে লাইসেন্স করতে আপত্তি নেই জানিয়ে এই খুচরা ব্যবসায়ী বলেন, ‘সঠিক নজরদারি না থাকলে অনেকে ভোগান্তির শিকার হতে পারেন।’
মমিনুল ইসলাম নামে অন্য এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘লাইসেন্স করতে আপত্তি নেই। তবে চালের দাম কমানোর জন্য লাইসেন্স নয়, চালের আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি গুদামে চালের মজুদ বাড়াতে হবে। এতে অসাধু ব্যবসায়ীরা চালের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজার অস্থিতিশীল করার সুযোগ পাবে না।’
কুড়িগ্রাম সরকারি হাটবাজার ও পৌর চাল বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মেসার্স হযরত রাইচ এজেন্সির স্বত্বাধিকারী মো. হযরত আলী জানান, আমরা সমিতির পক্ষ থেকে সব ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ জানাবো। লাইসেন্স করতে আমাদের কোনও আপত্তি নেই, তবে চালের মূল্য নিয়ন্ত্রণে কোনও প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয় না।
তবে ব্যবসায়ীদের দাবির সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো.মহিবুল হক জানান, মূলত রিটার্ন নেওয়ার জন্যই খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদেরও লাইসেন্সভুক্ত করা হবে। আমদানিকারক,পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী -এই তিন পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের কাছে রিটার্ন নিলে তখন মজুদ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এর ফলে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা সম্ভব হবে না।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মিল মালিক ছাড়া মাত্র ২৮ জন ফুড গ্রেইন লাইসেন্সধারী পাইকারি ব্যবসায়ী রয়েছেন। খুচরা পর্যায়ে কোনও ফুড গ্রেইন লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ী নেই। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ মতো আগামী ১০ অক্টোবরের মধ্যে সব পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের কাছে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা পৌঁছানো হবে। এজন্য উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ করা হবে।
উল্লেখ্য, চালের দাম সহনীয় করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে গত ২ অক্টোবর খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম চালের আমদানিকারক, মজুতদার, আড়তদার এবং পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের খাদ্য অধিদফতর থেকে আগামী ৩০ অক্টোবরের মধ্যে লাইসেন্স নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া ১৫ দিন পর পর ব্যবসায়ীদের গুদামে মজুত করা চাল ও গমের হিসাব স্থানীয় খাদ্য দফতরকে অবহিত করারও নির্দেশ দেন মন্ত্রী।








