যশোরে পুলিশের জঙ্গিবিরোধী অভিযান ‘অপারেশন মেল্টেড আইস’ সোমবার বিকাল ৫টা ১৫ মিনিটে শেষ হয়েছে। পুলিশের খুলনা বিভাগের এডিশনাল ডিআইজি একরামুল হাবিব বিকালে সাংবাদিকদের ব্রিফকালে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে এই অভিযান শেষ। তবে, পুলিশের অন্যান্য তদন্ত কাজ চলবে।’
রবিবার রাত থেকেই পুলিশের একাধিক টিম যশোর শহরের ঘোপ নওয়াপাড়া রোড জামে মসজিদের পাশে একটি চারতলা বাড়ি কর্ডন করে রাখে। সোমবার সকাল থেকে পুলিশের একাধিক টিম বাড়ির আশপাশসহ গোটা এলাকায় অবস্থান নেয়।
চারতলা বাড়িটির দ্বিতীয়তলার পশ্চিমপাশের ফ্লাটে থাকতেন জঙ্গি মারজানের বোন এবং হাদিসুর রহমান সাগর ওরফে মশিয়ার রহমানের স্ত্রী খাদিজা আক্তার এবং তার দু’ মেয়ে সুমাইয়া (৫), সুরাইয়া(৩)ও ছেলে রাজু (২)।
সকাল ১০টার দিকে ওই বাড়ির পাশের গলিতে প্রবেশ করে যশোর গোযেন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি টিম। এরপর সেখানে আসেন যশোরের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান। কিছু সময় পর সোয়াটের একটি টিম সাদা মিনিবাসযোগে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
সোয়া ১১টা থেকে এসপি আনিসুর রহমান হ্যান্ড মাইকে খাদিজাকে আত্মসমর্পণ অথবা তার মোবাইলফোনসেট অন করার আহ্বান জানান। তিনি তার সঙ্গে কথা বলতে চান এবং তাকে সহযোগিতারও আশ্বাস দেন। কিন্তু খাদিজারা পক্ষ থেকে কোনও জবাব আসেনি।
দুপুর আড়াইটার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছান পুলিশের এডিশনাল ডিআইজি (খুলনা) ইকরামুল হাবিব। এরমধ্যে পুলিশ, বাড়ির মালিক ও খাদিজার সঙ্গে আলোচনা হয়। খাদিজা তার ভাড়া বাসার বারান্দায় এবং অন্যরা পাশের বাসার জানালায় দাঁড়িয়ে আলাপ করেন। সেখান থেকে খাদিজা জানান, তার বাবা-মা এলে তিনি আত্মসমর্পণ করবেন।
৩টা ৫ মিনিটে খাদিজার বাবা নিজাম উদ্দিন ও তার মা ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিল দুই মেয়ে ও এক ছেলে।
আত্মসমর্পণের পর বিকাল সাড়ে চারটার দিকে খাদিজার বাসা থেকে প্রথমে একটি বোমা বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। এরপর দ্বিতীয় বোমা বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায় ৪ টা ৪৩ মিনিটে এবং সর্বশেষ বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় ৫টা ৩ মিনিটে।
সাংবাদিকদের ব্রিফকালে এডিশনাল ডিআইজি(খুলনা) ইকরামুল হাবিব বলেন, ‘অপারেশন মেল্টেড আইস প্রাথমিকভাবে শেষ হয়েছে। তবে, পুলিশের তদন্ত কাজ চলবে।’ তিনি জানান, পুলিশের ডিসপোজাল টিম খাদিজার ঘর থেকে তিনটি সুইডাল ভেস্ট এবং কয়েকটি ম্যাপ উদ্ধার করে। পুলিশ সুইডাল ভেস্ট তিনটি নিষ্ক্রিয় করেছে। ম্যাপগুলো কিসের তা তদন্ত ছাড়া বলা যাচ্ছে না।
তিনি জানান, গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে এই অভিযান চালানো হয়।
খাদিজার স্বামী হাদিসুর রহমান গ্রেফতার কি না এমন প্রশ্নের না সূচক জবাব দেন তিনি।
গ্রেফতার খাদিজা ও তার তিন শিশু সন্তান কোথায়- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তারা পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, সোমবার দুপুর সোয়া দুইটার দিকে ওই ভবনের দ্বিতীয় তলার মালিক ইসমত আরা বাবলীর স্বামী হায়দার আলী সাংবাদিকদের বলেন, ‘খাদিজা তার বাসার বারান্দায় এসেছিলেন। সেখানে অবস্থানরত পুলিশ এবং আমার সঙ্গে তার কথা হয়েছে। খাদিজা জানিয়েছে, তার বাবা-মা আসলে তিনি ভবন থেকে বের হয়ে আসবেন।’
এরপর খাদিজার বাবা-মাকে খবর দেওয়া হলে পৌনে তিনটার দিকে তারা ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছান। পরে তাদের নিয়ে ওই ভবনের কাছে গেলে খাদিজা তার দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে বের হয়ে আসে। এরপর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে নিয়ে যায়। তবে তাদের কোথায় নেওয়া হয়েছে তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
এর আগে সকাল ১১টা ২৫ মিনিটে যশোর পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘পাঁচটি পরিবারকে নিরাপদে নামিয়ে এনেছি। সেখানে জঙ্গি মারজানের ছোট বোন খাদিজা রয়েছে। আমরা তাকে নেমে আসার আহ্বান জানিয়েছি। তার মোবাইল ফোন অন করতে বলেছি।’
১১টা ১৫ মিনিটে হ্যান্ড মাইকে পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান খাদিজাকে আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আপনি নেমে আসুন। আপনার সন্তানদের কথা চিন্তা করুন। আমরা আপনাকে সাহায্য করবো।’
উল্লেখ্য, রবিবার রাত ১০টায় যশোরের ঘোপ নওয়াপাড়া রোডে জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে একটি চারতলা বাড়ি ঘিরে রাখে পুলিশ। ওই বাড়িটির মালিক যশোর জিলা স্কুলের শিক্ষক হায়দার আলীর শ্বশুর। হায়দার আলী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার স্ত্রী ইসমত আরা বাবলী। তারা তিন বোন। পৈত্রিক সূত্রে ওই ভবনের একটি করে ফ্লোর পেয়েছেন তারা। আমার স্ত্রী ওই বাড়ির দ্বিতীয় তলায় দুটি ফ্ল্যাট পেয়েছেন। আর ভবনের নিচ তলা ফাঁকা আছে। আমাদের ফ্ল্যাটগুলোতে দুটি পরিবার ভাড়া থাকে। আমি পাশে আরেকটি বাড়িতে ভাড়া থাকি। রবিবার ভোর চারটার দিকে আমি এক আত্মীয়ের মাধ্যমে জানতে পারি রবিবার রাত ১০টা থেকে বাড়িটি ঘিরে রেখেছে পুলিশ। খবর পেয়ে চলে আসি। কিন্তু আমাকে বাড়িতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ধারণা করছি বাসার পশ্চিম পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া মশিয়ার রহমান ও তার পরিবারকে সন্দেহ করা হচ্ছে। মশিয়ার রহমানের বাড়ি কুষ্টিয়ায়। তিনি একটি হারবাল কোম্পানিতে চাকরি করেন। তিন সন্তান ও স্ত্রী নিয়ে বাসা ভাড়া করে গত একবছর ধরে এ বাসায় থাকেন মশিয়ার রহমান।’
আরও পড়তে পারেন:
আত্মসমর্পণ করলো জঙ্গি মারজানের বোন খাদিজা








