খাদ্য বিভাগের পক্ষ থেকে খোলা বাজারে (ওএমএস) আতপ চাল বিক্রির কর্মসূচিতে সাড়া মিলছে না ক্রেতাদের। ডিলাররা সারাদিন এই চাল নিয়ে বসে থাকলেও বলতে গেলে ক্রেতাশূন্য থাকছে দোকানগুলো। তারপরও দিন শেষে বরাদ্দের চাল বিক্রি শেষ বলে দেখানো হচ্ছে খাতাপত্রে। স্থানীয়রা তাই প্রশ্ন তুলেছেন, ক্রেতাদের কাছে বিক্রি না হওয়া সত্ত্বেও ডিলারদের প্রতিদিনের বরাদ্দের চাল যাচ্ছে কোথায়?
গত ১৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয় দেশব্যাপী খোলাবাজারে চাল বিক্রির কর্মসূচি। এর আওতায় ময়মনসিংহ পৌর এলাকার বাঘমারা, ঢোলাদিয়া, চরপাড়া, মাসকান্দা গণশার মোড়, সারদা ঘোষ রোড, ভাটিকাশর, কৃষ্টপুর আদর্শ কলোনি, কলেজ রোড, সানকিপাড়া ও কেওয়াটখালিসহ ১২টি পয়েন্টে ওএমএস ডিলারের মাধ্যমে শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত এই চাল বিক্রি করা হচ্ছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে।
স্থানীয়রা বলছেন, ময়মনসিংহে সাধারণত সেদ্ধ চাল খেয়ে থাকেন সবাই। ওএমএসের আওতায় আতপ চাল বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে বলেই এই চাল কিনতে ক্রেতাদের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। তাছাড়া স্থানীয় বাজারে আতপ চালের দামও ওএমএসের আতপ চালের চেয়ে তেমন একটা বেশি নয়। সে কারণেই ওএমএস থেকে চাল কিনতে ক্রেতাদের তেমন ভিড়বাট্টা নেই দোকানগুলোতে।
রবিবার দুপুর ১টার দিকে শহরের নতুন বাজার মোড়ের ওএমএস ডিলার বিবেক এন্টারপ্রাইজে গিয়ে কোনও ক্রেতার দেখা পাওয়া যায়নি। এক ঘণ্টারও বেশি সময় সেখানে অবস্থান করলেও এসময় কোনও ক্রেতাই আসেননি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি কমল চন্দ্র সিংহের মালিকানাধীন ওই দোকানে। পরে দুপুর ২টার দিকে দোকানের রেজিস্ট্রার খাতায় দেখা যায়, ওই সময় পর্যন্ত ৯৭ জন ৫ কেজি করে চাল কিনেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমল চন্দ্র সিংহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চলমান কর্মসূচিতে শুক্রবার ও ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ৮শ ৫০ কেজি চাল। সকালের দিকে কিছুটা ভিড় বেশি থাকে। দুপুরের দিকে ভিড় অনেকটাই কমে যায়। বিকাল ৫টার মধ্যে সব চাল বিক্রি হয়ে যায়।’
তবে পাশের পান দোকানদার আব্দুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সারাদিনে ৩০ থেকে ৪০ জন চাল কেনার জন্য আসেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আতপ চালের কারণে ক্রেতাদের কাছে এর তেমন একটা চাহিদা নাই। আর ক্রেতা না আসলেও রেজিস্ট্রার খাতায় দোকানদারের লোকজন নিজেরাই নাম-ঠিকানা লিখে সই করে রাখে।’
কমল চন্দ্র সিংহ বলেন, ‘প্রতিদিন ১৭০ জনের নামের বিপরীতে চাল বিক্রি দেখানোর নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু অনেকেই সই না করেই চাল নিয়ে যায়। তাই নিজেদেরই সই ও টিপসই দিয়ে দিতে হয়।’
রেজিস্ট্রার খাতার নাম-ঠিকানা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন স্থানীয় আরও অনেকেই। প্রত্যক্ষদর্শী কয়েজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডিলারের দোকানে ক্রেতা আসছে খুবই কম। তাই প্রতিদিনের বরাদ্দের চালের বেশিরভাগই বিক্রি হচ্ছে না। তাদের প্রশ্ন, তাহলে এই চাল যাচ্ছে কোথায়?
একই চিত্র দেখা গেছে শহরের ৫/বি সাহেব কোয়ার্টার, কাচিঝুলি মোড়ের ওএমএস ডিলার মেসার্স রিদ কনস্ট্রাকশন ও শহরের ট্রাংকপট্টি বড় মসজিদ সংলগ্ন ওএমএস ডিলার আরিফ উল্লাহ খান বাপ্পীর মালিকানাধীন বাপ্পী এন্টারপ্রাইজেও। রবিবার বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত রিদ কনস্ট্রাকশন স্টোরে ১৪০ জন ও বাপ্পী এন্টারপ্রাইজে ১৭০ জনের নামে ৫ কেজি হারে চাল বিক্রি দেখানো হয়েছে।
চাল নিতে আসা থানা ঘাট বস্তির রাবেয়া জানান, আতপ চাল হওয়ায় ওএমএসের দোকানে ভিড় নেই। পিঠা বানানোর জন্য কেউ কেউ এই চাল নিচ্ছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাচিঝুলি এলাকার একজন ক্রেতা বলেন, ‘কেউ তো চাল তেমন কিনছে না। তাই ডিলারদের অনেকেই ভুয়া নাম-ঠিকানা রেজিস্ট্রারে লিখে চাল বিক্রি হয়েছে বলে দেখাচ্ছে।’ খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারাও বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করে থাকছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এস এম সাইফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওএমএস দোকানের ডিলারদের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রেখেই খাদ্য কর্মকর্তারা প্রতিদিনের বরাদ্দ বিলিবণ্টন মনিটরিং করছেন। এরই মধ্যে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ায় দুই ডিলারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।’ এরপরও কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।








