দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বন্ধ ও অর্ধচালু শিল্পপ্রতিষ্ঠান। রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ সুদের ঋণ, ডলার সংকট, জ্বালানি ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা এবং কার্যকর মূলধনের ঘাটতির কারণে গত কয়েক বছরে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। আবার অনেক কারখানা ও সেবা প্রতিষ্ঠান অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি এবং বাজার থাকলেও পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন বা সেবা দিতে পারছে না।
এই বাস্তবতায় শিল্প খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের বন্ধ, অর্ধচালু এবং উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মূলধনের অভাবে সংকটে থাকা শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিতে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ‘বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত সহায়ক প্রাক-অর্থায়ন স্কিম’ চালু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন শিল্প স্থাপনের চেয়ে বন্ধ শিল্পকে পুনরায় চালু করা অনেক দ্রুত এবং কম ব্যয়বহুল। ফলে এই উদ্যোগ সফল হলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে, অপরদিকে রফতানি আয় ও শিল্প উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
কেন এই উদ্যোগ?
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশে এমন অনেক বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে যেগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে অথবা আংশিক চালু রয়েছে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, দক্ষ জনবল ও বাজার থাকা সত্ত্বেও কাঁচামাল কেনা, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ কিংবা দৈনন্দিন উৎপাদন ব্যয় মেটানোর মতো পর্যাপ্ত কার্যকর মূলধন না থাকায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
ফলে বিপুল উৎপাদন সক্ষমতা অলস পড়ে রয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান, রফতানি, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে।
বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, এসব প্রতিষ্ঠানের মূল সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নয়; বরং স্বল্পমেয়াদি কার্যকর মূলধনের সংকট। প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পেলে এসব প্রতিষ্ঠান দ্রুত উৎপাদনে ফিরতে পারবে। সেই লক্ষ্যেই ২০ হাজার কোটি টাকার এই বিশেষ স্কিম চালু করা হয়েছে।
কীভাবে পরিচালিত হবে তহবিল?
স্কিমের মোট আকার ২০ হাজার কোটি টাকা। দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য ব্যবহার করে এই তহবিল গঠন করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোকে ৪ শতাংশ সুদে অর্থ দেবে। ব্যাংকগুলো সেই অর্থ গ্রাহকদের কাছে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে পারবে।
বর্তমানে শিল্পঋণের সুদের হার অনেক ক্ষেত্রেই দ্বিগুণ অঙ্কে পৌঁছে গেছে। সে তুলনায় ৭ শতাংশ সুদে অর্থায়ন শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য উল্লেখযোগ্য স্বস্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।
স্কিমটি তিন বছরের জন্য চালু থাকবে এবং এটি একটি রিভলভিং ফান্ড হিসেবে পরিচালিত হবে। অর্থাৎ ঋণ ফেরত আসার সঙ্গে সঙ্গে সেই অর্থ পুনরায় অন্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিতরণ করা যাবে।
কারা পাবে সুবিধা?
জাতীয় শিল্পনীতি অনুযায়ী বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো এই সুবিধার আওতায় আসবে।
এর মধ্যে রয়েছে সম্পূর্ণ বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আংশিকভাবে চালু শিল্পপ্রতিষ্ঠান, উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে না পারা প্রতিষ্ঠান, বন্ধ বা অর্ধচালু সেবা প্রতিষ্ঠান, অধিগ্রহণ (টেকওভার) বা লিজের মাধ্যমে পুনরায় চালু হওয়া প্রতিষ্ঠান।
তবে রফতানিমুখী শিল্প, আমদানি বিকল্প শিল্প এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সক্ষম প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
ঋণ পাওয়ার আগে হবে কঠোর যাচাই
স্কিমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কঠোর যাচাই-বাছাই। বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশ দিয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে বিস্তারিতভাবে মূল্যায়ন করতে হবে— কেন প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়েছে; কেন পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না; কী পরিমাণ কার্যকর মূলধন প্রয়োজন; অর্থায়ন পেলে কতটা উৎপাদন বাড়বে; প্রতিষ্ঠানটির ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা কেমন। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান বা পরামর্শক নিয়োগ করেও এই মূল্যায়ন করা যাবে।
এর মাধ্যমে প্রকৃত উৎপাদন সক্ষম প্রতিষ্ঠান এবং শুধুমাত্র ঋণ নেওয়ার উদ্দেশ্যে আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
খেলাপিদের জন্য নয়
কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, যেসব ঋণগ্রহীতা সিআইবিতে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত, তারা এই স্কিমের আওতায় সুবিধা পাবে না।
এছাড়া অর্থ পাচার, জালিয়াতি, তহবিল আত্মসাৎ, ঋণের অর্থ অপব্যবহার কিংবা আর্থিক অনিয়মে জড়িত প্রতিষ্ঠানও এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে।
এর মাধ্যমে অতীতের বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অপব্যবহার রোধের চেষ্টা করা হয়েছে।
কোথায় ব্যবহার করা যাবে ঋণের অর্থ?
স্কিমের আওতায় পাওয়া অর্থ শুধুমাত্র কার্যকর মূলধন হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। এর মধ্যে রয়েছে— শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা; বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য ইউটিলিটি বিল; কাঁচামাল ক্রয়; উৎপাদন ব্যয়; রফতানি আদেশ বাস্তবায়ন; সেবা কার্যক্রম পরিচালনা।
তবে এই অর্থ ব্যবহার করে পুরোনো ঋণ পরিশোধ বা অন্য কোনও ঋণের সমন্বয় করা যাবে না।
শ্রমিকদের জন্য বড় স্বস্তি
এই স্কিমের সবচেয়ে ইতিবাচক দিকগুলোর একটি হলো শ্রমিকদের সুরক্ষা।
ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ চার মাসের বেতন-ভাতা প্রদানের জন্য অর্থ ব্যবহার করতে পারবে। তবে সেই অর্থ সরাসরি শ্রমিকদের ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে পাঠাতে হবে।
নগদে অর্থ উত্তোলন বা বিতরণের সুযোগ রাখা হয়নি।
ফলে শ্রমিকদের প্রাপ্য অর্থ সরাসরি তাদের হাতে পৌঁছাবে এবং অর্থ অপব্যবহারের ঝুঁকি কমবে।
সর্বোচ্চ কত ঋণ পাওয়া যাবে?
স্কিমের আওতায় কোনও একক প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ী গ্রুপ সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত সুবিধা নিতে পারবে।
ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ এক বছর। তবে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম সন্তোষজনক হলে এবং তহবিলে অর্থ উপলব্ধ থাকলে ঋণ নবায়নের সুযোগ থাকবে।
এতে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর পাশাপাশি মাঝারি আকারের শিল্পপ্রতিষ্ঠানও সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে দেশের অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রথমত, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আবার উৎপাদনে ফিরতে পারবে।
দ্বিতীয়ত, হাজার হাজার শ্রমিক তাদের চাকরি ফিরে পেতে পারেন এবং নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।
তৃতীয়ত, রফতানিমুখী শিল্প উৎপাদন বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি পাবে, যা বর্তমান ডলার সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
চতুর্থত, ব্যাংক খাতের অনেক সমস্যাগ্রস্ত ঋণ পুনরায় সচল ব্যবসায় রূপ নিতে পারে, যা খেলাপি ঋণের চাপ কমাতে সহায়তা করবে।
পঞ্চমত, নতুন বিনিয়োগের জন্য ইতিবাচক বার্তা যাবে এবং শিল্প খাতে আস্থা ফিরে আসবে।
চ্যালেঞ্জ কোথায়?
তবে শুধু অর্থ দিলেই সব প্রতিষ্ঠান ঘুরে দাঁড়াবে— এমন নিশ্চয়তা নেই।
অনেক প্রতিষ্ঠানের সমস্যা কেবল অর্থের সংকট নয়। দুর্বল ব্যবস্থাপনা, বাজার হারানো, প্রযুক্তিগত পিছিয়ে পড়া, করপোরেট সুশাসনের অভাব এবং উদ্যোক্তার অদক্ষতাও অনেক ক্ষেত্রে বড় কারণ।
ফলে প্রকৃত অর্থে কোন প্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনের যোগ্য, তা নির্ধারণ করাই হবে এই স্কিমের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত তদারকি করতে হবে, যাতে ঋণের অর্থ নির্ধারিত খাতেই ব্যবহৃত হয় এবং নতুন করে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি তৈরি না হয়।
আশার আলো দেখছে শিল্প খাত
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিল্প খাতের জন্য ঘোষিত সবচেয়ে বড় সহায়ক কর্মসূচিগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় নতুন শিল্প স্থাপনের চেয়ে বিদ্যমান শিল্পকে সচল করা অধিক কার্যকর ও দ্রুত ফলদায়ক।
সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে এই ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল শুধু কয়েকটি কারখানা নয়, দেশের শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং রফতানি খাতেও নতুন গতি আনতে পারে।
অনেকদিন ধরে বন্ধ থাকা কারখানার চিমনি থেকে আবার ধোঁয়া উঠতে পারে, উৎপাদন লাইনে ফিরতে পারেন হাজার হাজার শ্রমিক, আর অর্থনীতিতে ফিরে আসতে পারে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ তাই কেবল একটি ঋণ কর্মসূচি নয়, বরং স্থবির শিল্প খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি বড় অর্থনৈতিক পরীক্ষাও বটে।









